আর কয়েকদিন পরেই ঈদুল আজহা। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মুসলমানরা কি এবার ঈদের জন্য গরু জবাই করতে পারবেন? এনিয়ে দেখা দিয়েছে প্রবল আশঙ্কা। এর কারণ: প্রথমবারের মতো এই রাজ্যে ক্ষমতায় এসেছে কট্টর হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক দল ভারতীয় জনতা পার্টি-বিজেপি।
এর আগে অনেক রাজ্যে ক্ষমতায় গিয়েই গরু জবাইয়ের বিধিনিষেধ কঠোর করেছে এই দল। এবার পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী প্রচারে ক্ষমতায় গেলে গরু জবাই নিষিদ্ধ করার প্রচ্ছন্ন হুমকি দিয়েছিলেন এই দলের কোনো কোনো নেতা। ফলে বিজেপি ক্ষমতায় আসায় গরু জবাই ও মাংস বেচাকেনা নিয়ে শুরু হয়েছে জল্পনা-কল্পনা।
পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের ২০১১ সালের সরকারি শুমারি অনুসারে মুসলমানের সংখ্যা ২৭ শতাংশ। সেখানকার বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ১৫ বছর পর বর্তমানে এই সংখ্যা ২৮ থেকে ২৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া আদিবাসীদের একটি বড় অংশ এবং অন্যান্য সম্প্রদায়ের মানুষের খাদ্যতালিকাতেও আছে গরুর মাংসের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি।
বিজেপি নেতৃত্বের পক্ষ থেকে আগে থেকেই গরু জবাই নিয়ে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। দলটির কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতারা বারবার দাবি করে আসছেন, উত্তরপ্রদেশ বা হরিয়ানার মতো পশ্চিমবঙ্গেও গোহত্যা নিষিদ্ধ করা এবং অবৈধ কসাইখানাগুলো বন্ধ করা তাদের অন্যতম প্রধান এজেন্ডা। বিশেষ করে আসামের মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত বিশ্ব শর্মা পশ্চিমবঙ্গের কোচবিহারে নির্বাচনী প্রচারে এসে বলেছেন, বিজেপি ক্ষমতায় এলে রাজ্যে গরু জবাই ও গরুর মাংস বিক্রি সম্পূর্ণ বন্ধ করা হবে।
বিজেপির সাবেক রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষের মতো নেতাও বিভিন্ন সময় গরু জবাইকে ‘মহাপাপ’ হিসেবে চিহ্নিত করে এর বিরুদ্ধে কড়া আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলেছেন। আর বিভিন্ন ধর্মীয় জনসভায় ‘গো-মাতা’ রক্ষা এবং সনাতন সংস্কৃতির দোহাই দিয়ে পরোক্ষভাবে গরু জবাইয়ের বিরোধিতা করেছেন মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার দৌড়ে সবচেয়ে এগিয়ে থাকা শুভেন্দু অধিকারী।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরণের বক্তব্য ছিল মূলত হিন্দু ভোটকে সংহত করার একটি কৌশল। তবে দলটির আদর্শিক অবস্থান থেকে এটি তাদের কেন্দ্রীয় কর্মসূচিও হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
অতীতে রাজ্য সরকারের নির্বাচনে ক্ষমতায় গিয়েই উত্তর প্রদেশ, হরিয়ানা, মহারাষ্ট্র, কর্নাটক ও আসামের মতো রাজ্যে গরু জবাই নিয়ে আইন আগের চেয়ে কঠোর করেছে বিজেপি। এসব রাজ্যে গরুর মাংস বহনের অপরাধে মানুষকে পিটিয়ে মারার ঘটনাও ঘটেছে।
ভারতে গরু জবাই নিয়ে আইন করা রাজ্য সরকারের দায়িত্ব। এ নিয়ে রাজ্যভেদে আইনও ভিন্ন ভিন্ন। কোনো কোনো রাজ্যে গরু জবাই ও গরুর মাংস বেচাকেনা যেমন পুরোপুরি নিষিদ্ধ, তেমনি আবার কোনো কোনো রাজ্যে শুধু গাভী জবাই নিষিদ্ধ। আবার কোনো কোনো রাজ্যে ষাঁড় ও বলদ জবাই করো গেলেও এজন্য সরকারের প্রাণিসম্পদ বিভাগ থেকে ‘জবাই যোগ্যতা’র সার্টিফিকেট নিতে হয়। উল্লেখযোগ্য মুসলিম জনসংখ্যার আসামে নির্দিষ্ট এলাকায় গরু জবাই করা গেলেও হোটেল-রেস্তোরাঁ বা প্রকাশ্যে পরিবেশন নিষিদ্ধ। অন্যদিকে অরুনাচল, মেঘালয়, মিজোরাম, মনিপুর, নাগাল্যান্ডের মত রাজ্যে গরু নিয়ে কোনো বিধিনিষেধই নেই।
পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় এসে গরু জবাই নিষিদ্ধ করতে চাইলেও এর জটিলতা কম নয়। উচ্চ মুসলিম জনসংখ্যা অধ্যুষিত এ রাজ্যে এটি বাস্তবায়ন করা সামাজিক অস্থিরতার কারণ হতে পারে।
অর্থনৈতিক দিক থেকে বিবেচনা করলে দেখা যায়, গরুর মাংসের ব্যবসা এবং চামড়া শিল্পের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান জড়িত। বিশেষ করে প্রতি বছর প্রতিবেশি বাংলাদেশ থেকে ভারত ভ্রমণ করে প্রায় ২০ লাখ মানুষ, যাদের ৮০ ভাগই মুসলিম। এই পর্যটকদের একটি বড় অংশ খাবারের বৈচিত্র্য এবং সহজলভ্যতার জন্য পশ্চিমবঙ্গের রেস্তোরাঁগুলোর ওপর নির্ভরশীল। যদি গরুর মাংস নিষিদ্ধ করা হয়, তবে পর্যটন শিল্পে তার নেতিবাচক প্রভাব পড়ার যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে, যা পরোক্ষভাবে রাজ্যের রাজস্বে টান ফেলতে পারে।
এমন পরিস্থিতিতে রাজ্যের মুসলিম জনগোষ্ঠীর খাদ্যাভ্যাস, বড় সংখ্যক পর্যটকের খাদ্যরুচি এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা নতুন সরকারের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। সামাজিক ভারসাম্য রক্ষা করে গরু জবাই নিষিদ্ধ করার মতো কঠোর সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা কতটা সম্ভব হবে, তা নিয়ে জনমনে আশঙ্কার পাশপাশি সংশয়ও তৈরি হয়েছে।


