দক্ষিণ এশিয়ার প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে দলিতরা বৈষম্যের শিকার। বিশেষ করে নারীরা মানবেতর জীবনযাপন করছেন। তাদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান ও সামাজিক নিরাপত্তায় বৈষম্য বহুমাত্রিক। এর মধ্যে সবচেয়ে উদ্বেগজনক হলো বাল্যবিবাহের প্রবণতা।
গবেষণায় দেখা গেছে, ৭৬ শতাংশ দলিত কন্যাশিশুর ১৮ বছরে পৌঁছানোর আগেই বিয়ে হয়ে যায়।
রোববার রাজধানীর উইম্যানস ভলান্টারি অ্যাসোসিয়েশনে (ডাব্লিউভিএ) অনুষ্ঠিত হয় ‘সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে দলিত নারী ও কিশোরীদের অধিকার সুরক্ষা ও মৌলিক পরিষেবায় অভিগম্যতা বৃদ্ধি’ প্রতিপাদ্য নিয়ে দলিত নারী সম্মিলনী-২০২৫।
নাগরিক উদ্যোগের সহায়তায় আয়োজিত এ সম্মেলনে দেশের ৪১টি দলিত কলোনি থেকে আগত নারী ও কিশোরীরা অংশগ্রহণ করেন।
এ সময় স্মরণ করা হয় দলিত অধিকার আন্দোলনের ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব বি আর আম্বেদকর, যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল, বাংলাদেশের নেতা বিজি মূর্তিসহ প্রজন্মের পর প্রজন্ম যারা দলিত জনগোষ্ঠীর মুক্তির আন্দোলনে অবদান রেখেছেন।

বক্তারা বলেন, দলিত শিশুদের মধ্যে যারা স্কুলে যায়, তাদের অনেকেই শিক্ষক ও সহপাঠীদের বৈষম্যমূলক আচরণের শিকার হয়। এই অভিজ্ঞতা তাদের পড়াশোনার আগ্রহ কমিয়ে দেয়, অনেক ক্ষেত্রে তারা স্কুল ছাড়তে বাধ্য হয়। পাশাপাশি দলিত শিশুদের একটি বড় অংশ মাতৃভাষা হিসেবে বাংলা ব্যবহার করে না; তাদের মধ্যে তেলেগু, হিন্দি, ভোজপুরি ও নাগরী ভাষী রয়েছে। নিজেদের ভাষায় শিক্ষার সুযোগ না থাকায় তারা শিক্ষায় আরও পিছিয়ে যায়।
তারা আরও জানান, পিতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা দলিত নারীদের উচ্চশিক্ষা ও স্বাবলম্বিতা অর্জনের সুযোগ সীমিত করে রেখেছে। যৌন হয়রানি, সাইবার অপরাধ ও সামাজিক নিরাপত্তাহীনতার কারণে অভিভাবকেরা মেয়েদের স্কুলে পাঠাতে ভয় পান। ফলে শিক্ষার পাশাপাশি সামাজিক অন্তর্ভুক্তিতেও দলিত নারীরা পিছিয়ে থাকেন।
তাদের মতে, দলিত নারীরা শ্রেণি, বর্ণ ও লিঙ্গের কারণে ত্রিমাত্রিক বৈষম্যের শিকার। তারা পরিবারের পুরুষ সদস্যদের আয়ের ওপর নির্ভরশীল, অন্যত্র কাজ করতে গেলে সামাজিক বা পারিবারিক অনুমতি না পাওয়ায় আর্থিক স্বাবলম্বিতা অর্জন করতে পারেন না।

২০১১ সালে নাগরিক উদ্যোগের সহায়তায় যাত্রা শুরু করা দলিত নারী ফোরাম স্থানীয়ভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। তাদের ধারাবাহিক প্রচেষ্টায় দলিত নারীদের অধিকার আদায়ের আন্দোলন আরও বেগবান হয়েছে।
মানবাধিকার কর্মী, নারী উন্নয়নকর্মী ও গবেষকরা সম্মেলনে বলেন, দলিত নারীদের প্রতি বৈষম্য দূর করা ছাড়া টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। তারা সরকারের কাছে বিশেষ বাজেট বরাদ্দ, শিক্ষায় বৃত্তি, স্বাস্থ্যসেবায় বিশেষ কর্মসূচি, কর্মসংস্থানের সুযোগ ও নিরাপত্তা নিশ্চয়তা দাবি করেন।
তারা আরও জানান, বৈষম্যের শিকল ভাঙতে শুধু সরকারি উদ্যোগ নয়, সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধিও জরুরি। সাধারণ জনগণের মানসিকতা পরিবর্তন না হলে দলিত নারীরা মূলধারার সমাজে অন্তর্ভুক্ত হতে পারবেন না।
সম্মেলনে মানবাধিকার সংগঠন, নারী উন্নয়নকর্মী ও নীতিনির্ধারকেরা দলিত নারীদের জন্য বিশেষ বাজেট বরাদ্দ, শিক্ষায় বৃত্তি এবং স্বাস্থ্যসেবায় পৃথক কর্মসূচির দাবি জানান।


