ঠিক বিশ বছর আগের এই দিনে রোজারিও থেকে আসা এক ১৮ বছরের কিশোর ১৯ নম্বর জার্সি গায়ে জড়িয়ে জার্মানির ২০০৬ বিশ্বকাপে সার্বিয়া ও মন্টিনিগ্রোর বিরুদ্ধে গোল করে বিশ্বমঞ্চে নিজের আগমন বার্তা ঘোষণা করেছিলেন। তখন খুব কম মানুষই কল্পনা করতে পেরেছিলেন যে এরপর কী ইতিহাস রচিত হতে যাচ্ছে।
বাংলাদেশ সময় বুধবার কানসাস সিটি স্টেডিয়ামে প্রায় ৭০ হাজার দর্শকের সামনে লিওনেল মেসি সেই অভিষেকের ঠিক ২০ বছর পূর্তির দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখলেন নিজের ক্যারিয়ারের প্রথম বিশ্বকাপ হ্যাটট্রিক দিয়ে। এর মাধ্যমে তিনি বিশ্বকাপ ইতিহাসে সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা হিসেবে মিরোস্লাভ ক্লোসার রেকর্ড স্পর্শ করলেন এবং বিশ্বজুড়ে ফুটবলপ্রেমীদের মনে করিয়ে দিলেন, ৩৮ বছর বয়সেও তিনি কতটা অনন্য এবং অবিশ্বাস্যভাবে অধরা।
আর্জেন্টিনা তাদের ‘জে’ গ্রুপের উদ্বোধনী ম্যাচে আলজেরিয়াকে ৩-০ ব্যবধানে পরাজিত করেছে, আর ম্যাচের স্কোরলাইন একটি গল্প বললেও পুরো সন্ধ্যাটি ছিল কেবলই একজন মানুষের।
ম্যাচের চতুর্থ মিনিটে অফসাইডের কারণে মেসির একটি গোল বাতিল হয়ে যায়। একদম সূক্ষ্ম ব্যবধানের সেই সিদ্ধান্তটি তার গতি সচল রাখায় বিন্দুমাত্র বাধা হতে পারেনি। এর ঠিক তেরো মিনিট পর রদ্রিগো ডি পলের একটি নিখুঁত পাস নিয়ন্ত্রণে নিয়ে তিনি আলজেরিয়ার রক্ষণব্যূহ চিরে ভেতরে ঢোকেন এবং ডি-বক্সের বাইরে থেকে দূরপাল্লার এক জোরালো শটে বল জালের ওপরের ডান কোণায় পাঠান। এটি ছিল বিশ্বকাপে তার ১৪তম গোল, যা তাকে কিলিয়ান এমবাপ্পের সমকক্ষ করে তোলে; যিনি ঠিক একই সন্ধ্যার আগের ম্যাচে সেনেগালের বিরুদ্ধে ফ্রান্সের হয়ে জোড়া গোল করেছিলেন।
৬০তম মিনিটে আসে তার দ্বিতীয় গোলটি। ফরাসি কিংবদন্তি জিনেদিন জিদান গ্যালারিতে বসে খেলা দেখছিলেন, আর মাঠের গোলপোস্টে থাকা তার ছেলে তথা আলজেরিয়ার গোলরক্ষক লুকা জিদান কেবল অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টারের নেওয়া এক নিচু শট কোনোমতে প্রতিহত করতে পেরেছিলেন। সেখানে মেসি সবচেয়ে দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেখান এবং ডান পায়ের টোকায় বল জালে জড়ান। ৭৬তম মিনিটে করা তার তৃতীয় গোলটি ছিল একদম চিরচেনা ‘মেসি ক্লাসিক’, যেখানে বদলি খেলোয়াড় নিকো গঞ্জালেসের সাথে ওয়ান-টু পাসের নিখুঁত আদান-প্রদান করে ডি-বক্সের প্রান্ত থেকে স্বভাবসুলভ বাঁকানো শটে বল জালের নিচের বাম কোণায় পাঠান।
এই হ্যাটট্রিক তাকে বিশ্বকাপের ১৬ গোলের মাইলফলকে নিয়ে যায়, যা ক্লোসার দীর্ঘদিনের রেকর্ডের সমান। মাত্র এক রাতেই তিনি সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতার তালিকায় পৌঁছানোর পথে গের্ড মুলার, ব্রাজিলের রোনালদো এবং এমবাপ্পেকে ছাড়িয়ে যান। এই টুর্নামেন্টে আর মাত্র একটি গোল করলেই এই একক রেকর্ডটি সম্পূর্ণ তার নিজের হয়ে যাবে।
রেকর্ডের মিছিল অবশ্য এখানেই শেষ নয়। কেবল মাঠে নামার মাধ্যমে মেসি ইতিহাসের প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে ছয়টি বিশ্বকাপ মূল পর্বে খেলার অনন্য কীর্তি গড়েন, যে রেকর্ডটি ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোও স্পর্শ করতে যাচ্ছেন যখন পর্তুগাল তাদের প্রথম ম্যাচ খেলবে। আর্জেন্টিনার হয়ে এটি ছিল মেসির ২০০তম আন্তর্জাতিক ম্যাচ, যার ফলে রোনালদো এবং কুয়েতের বাদের আল-মুতাওয়ার পর মাত্র তৃতীয় পুরুষ খেলোয়াড় হিসেবে তিনি এই মাইলফলকে পৌঁছালেন। বিশ্বকাপে তার ২৪টি গোলে অবদান (১৬টি গোল এবং ৮টি অ্যাসিস্ট) তার নিজেরই সর্বকালের রেকর্ডকে আরও বাড়িয়ে দিল, যা তাকে পেলের চেয়ে চার ধাপ এগিয়ে রেখেছে।
এ ছাড়া, তিনি প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে বিশ্বকাপের মঞ্চে ১১টি ভিন্ন দেশের বিরুদ্ধে গোল করার কীর্তি গড়লেন এবং রোনালদোর পর মাত্র দ্বিতীয় খেলোয়াড় হিসেবে পাঁচটি ভিন্ন বিশ্বকাপে গোল করার নজির স্থাপন করলেন। ৩৮ বছর ৩৫৭ দিন বয়সে হ্যাটট্রিক করে তিনি এখন বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ হ্যাটট্রিককারী খেলোয়াড়, যা তিনি ২০১৮ সালে স্পেনের বিরুদ্ধে করা রোনালদোর রেকর্ড ভেঙে নিজের করে নিলেন। একই সঙ্গে তিনি এখন বিশ্বকাপে গোল করা সবচেয়ে তরুণ এবং সবচেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ আর্জেন্টাইন খেলোয়াড়–প্রথমটি তিনি অর্জন করেছিলেন ২০০৬ সালে, আর পরেরটি নিজের করে নিলেন ঠিক দুই দশক পর একই তারিখে।
অবশ্য রাতটি সম্পূর্ণ বিতর্কহীন ছিল না। প্রথম ও দ্বিতীয় গোলের মধ্যবর্তী সময়ে মেসি আলজেরিয়ার অধিনায়ক ঈসা মান্দির পায়ের ডিম্বাকৃতি পেশি ও অ্যাকিলিস টেন্ডনে বুটের স্টাড উঁচিয়ে আঘাত করেন। রেফারি সাইমন মার্সিনিয়াক কেবল একটি ফ্রি-কিকের নির্দেশ দেন, ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি কোনো হস্তক্ষেপ করেনি এবং মেসি মাঠে থেকে হ্যাটট্রিক পূর্ণ করার সুযোগ পান। এই ঘটনাটি অনলাইনে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছে, যেখানে অনেকেরই দাবি ছিল যে এটি অন্তত একটি হলুদ কার্ড পাওয়ার যোগ্য ছিল।
কিন্তু মেসি যখন পূর্ণ ছন্দে থাকেন, তখন তার ফুটবলীয় জাদু এমন সমস্ত বিতর্ককে এক নিমেষেই অর্থহীন করে তোলে। তিনি পুরো ম্যাচে ছয়টি শট নিয়েছিলেন, যা মাঠের যেকোনো খেলোয়াড়ের চেয়ে বেশি; নিরলসভাবে প্রতিপক্ষকে চাপে রেখেছেন, নিজের অর্ধে নেমে বল কেড়ে নিয়েছেন এবং সতীর্থদের জন্য দুটি নিশ্চিত সুযোগ তৈরি করেছেন। এটি কেবল সুনামের ওপর ভর করে মাঠে টিকে থাকা অলস খেলোয়াড়ের পারফরম্যান্স ছিল না; এটি ছিল একজন ফুটবলারের নিজের ফর্মের সর্বোচ্চ চূড়ায় থেকে ম্যাচ পরিচালনার দৃশ্য।
চলতি বসন্তের শুরুতে চোয়াল ভেঙে যাওয়ার কারণে একটি সুরক্ষামূলক মাস্ক পরে মাঠে নামা লুকা জিদানের বিশ্বকাপ অভিষেকের রাতটি চরম যন্ত্রণাদায়ক ছিল। প্রথম গোলটির ক্ষেত্রে তিনি আরও ভালো করতে পারতেন এবং দ্বিতীয় গোলটির ক্ষেত্রে তো তার মারাত্মক ভুল ছিল।
অন্যদিকে, দল হিসেবে আর্জেন্টানাও একটি নতুন ইতিহাস গড়েছে। এটি ছিল তৃতীয়বারের মতো ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন হিসেবে তাদের বিশ্বকাপে পথচলা এবং শিরোপাধারী হিসেবে নিজেদের উদ্বোধনী ম্যাচে হার এড়ানোর প্রথম নজির এটিই। এর আগে ১৯৮২ সালে বেলজিয়াম এবং ১৯৯০ সালে ক্যামেরুনের কাছে তারা হেরেছিল।
ম্যাচের শেষ বাঁশি বাজার পর মেসিকে তার প্রথম গোলের পর চোখের জল ফেলার কারণ জিজ্ঞেস করা হয়েছিল। তার উত্তরটি ছিল বেশ আবেগপূর্ণ। তিনি বলেন, ‘এটি সম্পূর্ণ খেলাধুলার বাইরের একটি বিষয়। আমি বেশ কিছু কঠিন ও জটিল দিন পার করেছি।’
তিনি বেশি কিছু প্রকাশ না করলেও তার চারপাশের মানুষের প্রশংসায় ছিলেন পঞ্চমুখ, ‘আমি আমাদের পুরো প্রতিনিধি দল এবং আমার সতীর্থদের কাছে কৃতজ্ঞ। আমি যেন ভালো থাকি, তা নিশ্চিত করতে তারা প্রচুর চেষ্টা করেছে।’
রেকর্ডের বিষয়ে তিনি স্বভাবসুলভভাবেই বিনয়ী ছিলেন, ‘ক্লোসা এবং যারা এই তালিকায় আছেন, তাদের পাশে শীর্ষে থাকতে পারাটা একটি সম্মানের বিষয়। দিনশেষে এগুলো কেবলই পরিসংখ্যান এবং এর চেয়ে বেশি কিছু নয়। আমি যতটুকু দেখেছি, রোনালদো অন্যতম সেরা একজন খেলোয়াড় এবং তিনি কিন্তু প্রথম স্থানে নেই।’
সবশেষে তিনি এমন একটি মন্তব্য করেন যা ফুটবলের চেয়েও গভীর কিছুর ইঙ্গিত দেয়। তিনি বলেন, ‘আমি রাফায়েল নাদালের ওপর নির্মিত সিরিজটি দেখছি এবং সেটির সঙ্গে নিজেকে খুব বেশি মেলাতে পারছি। আমার মনে হয় এই দিক থেকে আমরা খুব একই রকম; আমরা সবসময় আমাদের সর্বোচ্চটা বিলিয়ে দিতে চাই।’
ডালাসে অস্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে পরবর্তী ম্যাচ এবং ২৭ জুন জর্ডানের মুখোমুখি হতে যাওয়া আর্জেন্টিনা বেশ সুবিধাজনক অবস্থানেই রয়েছে এবং কোনো বড় ঝামেলা ছাড়াই তারা জে গ্রুপ থেকে পরবর্তী রাউন্ডে যাবে বলে আশা করা যায়। যে টুর্নামেন্টে ব্রাজিল এবং স্পেনের মতো অন্য ফেবারিটরা বেশ নড়বড়ে শুরু করেছে, সেখানে লিওনেল স্কালোনির দলকে দেখে মনে হয়েছে অপরাজিত থাকার মতোই এক দল। মেসির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা নিয়ে প্রশ্ন হয়তো উঠতেই থাকবে, তবে এমন একটি রাতের পর সেই প্রশ্নগুলোকে গুরুত্ব সহকারে নেওয়া বেশ কঠিন।
লোকে বলেছিল, এই বিশ্বকাপটি সবাইকে আবারও মনে করিয়ে দেবে যে মেসিই এখনো ফুটবলের আসল মাপকাঠি। তারা একদম ঠিক বলেছিল। এত দীর্ঘ সময় ধরে কেউ এমন অনন্য শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রাখতে পারেনি, আর হয়তো কেউ কখনো তা পারবেও না।


