১১১ বছরের সাধনা ঔষধালয়ের এখন টিকে থাকার লড়াই

১১১ বছরের সাধনা ঔষধালয়ের এখন টিকে থাকার লড়াই
Advertisement
Advertisement

পুরান ঢাকার গেন্ডারিয়ার দীননাথ সেন রোডের পুরোনো একটি ভবনের সামনে দাঁড়ালে প্রথমেই চোখে পড়ে সময়ের ছাপ। বিবর্ণ দেয়াল, পুরোনো লোহার গেট, নিস্তব্ধ আঙিনা সবকিছু যেন অতীতের এক দীর্ঘ ইতিহাসের সাক্ষী।

বাইরে থেকে বোঝার উপায় নেই, এই ভবনেই একসময় গড়ে উঠেছিল বাংলার আয়ুর্বেদিক চিকিৎসার অন্যতম বৃহৎ কেন্দ্র। যার ওষুধের খ্যাতি ভারত ছাড়িয়ে ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা, মধ্যপ্রাচ্য ও চীন পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছিল। এই প্রতিষ্ঠানের নাম সাধনা ঔষধালয়।

বর্তমানে বিশ্বজুড়ে ভেষজ ও আয়ুর্বেদিক ওষুধের বাজার দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থাগুলোর হিসাব অনুযায়ী, এই শিল্পের বাজারমূল্য ইতোমধ্যে ১০ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করেছে। ভারতীয় কোম্পানিগুলো বিশ্ববাজারে নিজেদের শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে। অথচ এই অঞ্চলে আয়ুর্বেদিক ওষুধকে শিল্পোৎপাদনের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাজারে পরিচিত করার পথিকৃৎ ছিল পুরান ঢাকার এই সাধনা ঔষধালয়। একসময় যার নাম উচ্চারিত হতো গর্বের সঙ্গে, ১১১ বছরের প্রতিষ্ঠানটি এখন টিকে থাকার লড়াই করছে।

সাধনা কেবল একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের গল্প নয়। এটি একজন শিক্ষাবিদ, গবেষক ও দেশপ্রেমিক মানুষের স্বপ্নের ইতিহাস। দেশীয় জ্ঞানকে বিজ্ঞানভিত্তিক শিল্পে রূপ দেওয়ার ইতিহাস।

এর প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ যোগেশচন্দ্র ঘোষ। তিনি ছিলেন একাধারে রসায়নবিদ, শিক্ষাবিদ, আয়ুর্বেদ শাস্ত্রবিশারদ ও গবেষক।
১৮৮৭ সালে শরীয়তপুরের গোসাইরহাট উপজেলার জলছত্র গ্রামে তার জন্ম। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯০৮ সালে রসায়নশাস্ত্রে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পর শিক্ষকতা পেশায় যোগ দেন। ৩৬ বছর অধ্যাপনা শেষে ১৯৪৭ সালে অধ্যক্ষ হয়ে অবসরে চলে যান। কিন্তু গবেষণা ও আয়ুর্বেদ চর্চা থেকে সরে যাননি।

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত যোগেশচন্দ্রর জীবনে গভীর প্রভাব ফেলেন আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়। প্রফুল্লচন্দ্র বিশ্বাস করতেন, দেশের গাছপালা, ভেষজ সম্পদ ও বৈজ্ঞানিক জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে দেশীয় ওষুধ শিল্প গড়ে তোলা সম্ভব। যোগেশচন্দ্রও উপলব্ধি করেন, আয়ুর্বেদ কেবল প্রাচীন চিকিৎসা পদ্ধতি নয়; আধুনিক গবেষণা ও প্রযুক্তির সহায়তায় এটিকে আন্তর্জাতিক মানের শিল্পে পরিণত করা সম্ভব।

সাধনার শুরু

১৯১৪ সালে গেন্ডারিয়ার দীননাথ সেন রোডে যোগেশচন্দ্র ঘোষের ছোট্ট একটি আয়ুর্বেদিক গবেষণাগার থেকে যাত্রা শুরু সাধনা। মানুষের আস্থাও দ্রুত বাড়তে থাকে। অল্প সময়ের মধ্যেই ছোট গবেষণাগারটি পূর্ণাঙ্গ কারখানায় রূপ নেয়।
১৯১৭ সালে বিদ্যুৎচালিত যন্ত্রপাতির সাহায্যে বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হয়। তখন এর প্রতিটি শাখায় রোগীদের জন্য অভিজ্ঞ বৈদ্য বা কবিরাজের ব্যবস্থা ছিল। রোগ নির্ণয়, পরামর্শ এবং চিকিৎসাসেবাকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া হতো।

ধীরে ধীরে সাধনার গবেষণাগারে তৈরি হতে থাকে চ্যবনপ্রাশ, দশন চূর্ণ, মৃত সঞ্জীবনী, সর্বজ্বর বটি, সারিবাদি সালসা, শ্রী গোপাল তেলসহ শত শত ভেষজ ওষুধ। কার্যকারিতা ও তুলনামূলক কম দামের কারণে এগুলোর চাহিদা ছড়িয়ে পড়ে অবিভক্ত ভারতজুড়ে।

যোগেশচন্দ্রর লক্ষ্য কেবল ওষুধ বিক্রি করা ছিল না; তিনি প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন উপমহাদেশের ভেষজ জ্ঞান ও বৈজ্ঞানিক গবেষণার সমন্বয়ে আন্তর্জাতিক মানের ওষুধ তৈরি করা সম্ভব।

এই প্রচেষ্টার ফলও দ্রুত মিলতে থাকে। ভারতের বিভিন্ন প্রদেশ থেকে ওষুধের অর্ডার আসতে শুরু করে। বিহার, আসাম, উড়িষ্যা ও পশ্চিমবঙ্গে ব্যাপক চাহিদা তৈরি হয়। ভারতজুড়ে দেড় শতাধিক শাখা এবং দুই হাজারের বেশি পরিবেশক বা এজেন্সি গড়ে ওঠে। ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা, চীন, মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ আফ্রিকায় রপ্তানি হতে থাকে ওষুধ।

আরও পড়ুন

প্রফুল্লচন্দ্র রায় এবং নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুও সাধনা পরিদর্শন করেন।

দেশভাগের ধাক্কা

১৯৪৭ সালের দেশভাগে বড় ধাক্কা খায় সাধনা। সীমান্তে কড়াকড়ি, আমদানি শুল্ক এবং প্রশাসনিক বাধায় ঢাকা থেকে ভারতের শাখাগুলোতে ওষুধ পাঠানো কঠিন হয়ে পড়ে। আয়ুর্বেদিক ওষুধের ওপর উচ্চ শুল্ক আরোপের ফলে ব্যবসায়িক ব্যয়ও বেড়ে যায়। পরিস্থিতি মোকাবিলায় ১৯৫০ সালে কলকাতার দমদমে দ্বিতীয় কারখানা স্থাপন করা হয়।

যোগেশচন্দ্রর ছেলে নরেশচন্দ্র ঘোষের নেতৃত্বে ভারতের বাজারে কিছুটা স্থিতি ফিরলেও পূর্ব বাংলার মূল কারখানা আগের মতো আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারেনি।

তবু দেশের গেন্ডারিয়া কারখানা ছাড়েননি যোগেশচন্দ্র ঘোষ। তিনি বিশ্বাস করতেন, এই প্রতিষ্ঠান দেশের মানুষের সম্পদ এবং দেশীয় জ্ঞানের প্রতীক।

সাধনাতেই শেষ নিঃশ্বাস

১৯৭১ সালের মার্চে মুক্তিযুদ্ধের শুরু। পুরান ঢাকার বহু হিন্দু পরিবার নিরাপত্তার খোঁজে ভারতে আশ্রয় নিতে শুরু করে। একই পরামর্শ দেওয়া হয় যোগেশচন্দ্রকেও।

তখন তার বয়স ৮৪ বছর। তবে জন্মভূমির প্রতি ভালোবাসা থেকে একচুলও সরে দাঁড়াননি। পরিবারের সদস্যদের ভারতে পাঠিয়ে দিলেও বলেন, ‘মরতে হলে নিজের দেশের মাটিতেই মরব।’

১৯৭১ সালের ৩ এপ্রিল গভীর রাতে পাকিস্তানি সেনারা গেন্ডারিয়ার সাধনার প্রধান ফটক ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে। পরের দিন সকালে সেনারা যোগেশচন্দ্রকে নির্মমভাবে হত্যা করে।

নতুন যাত্রা

স্বাধীনতার পরে ধ্বংসস্তূপে দাঁড়িয়ে আবার ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে সাধনা। যোগেশচন্দ্রর ছেলে নরেশচন্দ্র দায়িত্ব নেন। চালু হয় উৎপাদন, সংস্কার করা হয় কারখানার ক্ষতিগ্রস্ত অংশ।

তবে সেখানে উৎপাদনের পরিধি এখন অনেক ছোট। আধুনিক বিপণন, ব্র্যান্ডিং এবং গবেষণায় পিছিয়ে পড়েছে সাধনা। আধুনিক ওষুধ কোম্পানির বিস্তার ও আয়ুর্বেদিক শিল্পে বড় বিনিয়োগের অভাবে ক্রমেই সীমিত হয়ে এসেছে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম।

প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক শিলা ঘোষ বর্তমানে ভারতে অবস্থান করেই প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম তদারকি করেন।
কর্মীদের ভাষ্য, অনেক মূল্যবান ভেষজ কাঁচামাল সংগ্রহ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে কয়েক গুণ।

২৬ বছর ধরে কর্মরত ভবতোষ দেব টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘কারখানায় আধুনিক যন্ত্রপাতি সংযোজন হয়েছে, উৎপাদন স্বাভাবিকভাবে চলছে, তবে আগের মতো নেই।’

তবে বেতন নিয়ে কখনোই সমস্যায় পড়তে হয়নি। প্রতি মাসের ১ তারিখে নিয়মিত বেতন দেওয়া হয়।

আরেক কর্মী চিত্তরঞ্জন বিশ্বাস জানান, কারখানায় ৭০ থেকে ৭৫ জন কর্মচারী কাজ করছেন। অতীতে বিদেশে কার্যক্রম থাকলেও বর্তমানে দেশের পাঁচটি শাখার মাধ্যমে ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad