হরমুজ প্রণালিকে যুক্তরাষ্ট্রের ‘ভূখণ্ড’ ঘোষণা করতে চান ট্রাম্প

হরমুজ প্রণালিকে যুক্তরাষ্ট্রের  ‘ভূখণ্ড’ ঘোষণা করতে চান ট্রাম্প
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া
Advertisement
Advertisement

ইরানের সঙ্গে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যেই হরমুজ প্রণালিকে ‘যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ড’ হিসেবে ঘোষণা করার হুমকি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। প্রণালিতে ইরানের একচ্ছত্র আধিপত্যের বিরোধিতা করে ফের বাধাহীন জাহাজ চলাচল নিশ্চিত করতে শিগগিরই প্রণালিটি যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ড হবে বলে হুঁশিয়ার করেন তিনি।

আল জাজিরার খবরে বলা হয়, স্থানীয় সময় শুক্রবার নিউইয়র্কে এক ভাষণে ট্রাম্প বলেন, বৈশ্বিক তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস ও সারের সরবরাহের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত এই নৌপথের ওপর শিগগিরই ওয়াশিংটনের দাবি প্রতিষ্ঠা করা হবে।

হাসতে হাসতে ট্রাম্প বলেন, ‘ইরানকে পরাজিত করার কাজ শেষ করার পরও তারা এখন খুবই বাজেভাবে পরাজিত হচ্ছে- খুব শিগগিরই আমি হরমুজ প্রণালিকে যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ড হিসেবে ঘোষণা করব।’

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে হামলা শুরু করার পর থেকে ইরানের সঙ্গে তাদের যুদ্ধ চলছে।

এর জবাবে ইরান হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচল সীমিত করে দেয়। যুদ্ধের আগে বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ এই নৌপথ দিয়ে পরিবাহিত হতো। যুদ্ধ শুরুর আগে প্রণালিটি বেসামরিক নৌ চলাচলের জন্য অবাধ পথ ছিল। তবে এরপর থেকে এর নিয়ন্ত্রণ ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার যুদ্ধবিরতি আলোচনার অন্যতম প্রধান বিরোধের বিষয়ে পরিণত হয়েছে।

সাম্প্রতিক মাসগুলোতে প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আবারও লড়াই শুরু হয়েছে। জুন মাসে সামরিক অভিযান বন্ধের লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি সমঝোতা স্মারকে সই করেছিল। এর একটি ধারায় বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে ইরানকে ‘সর্বোচ্চ চেষ্টা’ করতে বলা হয়েছিল।

পরবর্তী সময়ে উভয় পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে ওই সমঝোতা স্মারক লঙ্ঘনের অভিযোগ তোলে এবং মাসের শেষ নাগাদ আবারও লড়াই শুরু হয়।

এরপর থেকে ওয়াশিংটন ও তেহরান অস্বস্তিকর এক আলোচনাপ্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে। এতে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে সংঘাতের তীব্রতা কিছুটা কমলেও কোনো পক্ষই সন্তুষ্ট হয়নি এবং সংঘাতেরও কোনো চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়নি।

ইরান হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজকে লক্ষ্য করে হামলা অব্যাহত রেখেছে। তেহরানের দাবি, নৌপথটির একটি অংশ তাদের আঞ্চলিক জলসীমার মধ্যে পড়ে এবং তাই সেটি তাদের নিয়ন্ত্রণেই থাকবে।

বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রও প্রণালিতে নিজেদের অবরোধ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেছে। চলতি সপ্তাহে মার্কিন বাহিনী একটি পণ্যবাহী জাহাজে গুলি চালায়। তাদের অভিযোগ ছিল, জাহাজটি ইরানের বন্দরে পৌঁছানোর চেষ্টা করছিল।

আরও পড়ুন

শুক্রবার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তাদের এক সমাবেশে দেওয়া বক্তব্যে ট্রাম্প এই অবরোধকে ভেদ করা ‘অসম্ভব’ বলে দাবি করেন। একই সঙ্গে তিনি এটিকে ওই নৌপথের ওপর নির্ভরশীল দেশগুলোর জন্য যুক্তরাষ্ট্রের একটি সেবা হিসেবেও তুলে ধরেন।

ট্রাম্প বলেন, ‘আপনাদের শুধু মনে রাখতে হবে, আমরা যা করছি তা বিশ্বের জন্য একটি মহান সেবা। শুধু নিজেদের জন্য নয়, পুরো বিশ্বের জন্য। এই অবরোধ থামানো সম্ভব নয়। এটি ইস্পাতের দেয়াল।’

২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে রিপাবলিকান প্রার্থীদের পক্ষে সমর্থন জানাতে ট্রাম্প নিউইয়র্কে যান। এই নির্বাচন তাঁর প্রশাসনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ কংগ্রেসে রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা এর ওপর নির্ভর করছে।

সমাবেশে ট্রাম্প আবারও ইরানের বিরুদ্ধে বিজয়ের দাবি করেন, যদিও যুদ্ধ এখনো চলছে এবং এর কোনো স্পষ্ট সমাপ্তি দেখা যাচ্ছে না।

যুক্তরাষ্ট্রে এই সংঘাত জনপ্রিয় নয়। জুলাইয়ের শেষ দিকে কুইনিপিয়াক বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালিত এক জনমত জরিপে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের ৬০ শতাংশ ভোটার ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন সামরিক অভিযানের বিরোধিতা করেন।

সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনগুলোতে আরও বলা হয়েছে, অস্ত্র ও গোলাবারুদের মজুদের ওপর চাপ তৈরি হওয়ায় সামরিকভাবে আরও বড় পরিসরে সংঘাতে জড়ানোর ক্ষেত্রে ওয়াশিংটনের বিকল্প সীমিত হয়ে আসতে পারে।

ট্রাম্পের সর্বশেষ মন্তব্য তেহরানের সঙ্গে উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। ইরানের আইন ও আন্তর্জাতিকবিষয়ক উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গারিবাবাদি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এর তীব্র জবাব দিয়েছেন।

গারিবাবাদি লিখেছেন, ‘ট্রাম্প বলেছেন, ইরানের পরাজয়ের পর তিনি খুব শিগগিরই হরমুজ প্রণালিকে আমেরিকার ভূখণ্ড হিসেবে ঘোষণা করবেন।’

তিনি আরও লিখেছেন, ‘হরমুজ প্রণালিকে একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বার্তা দিয়ে দখল করা যায় না, একটি বিমানবাহী রণতরী দিয়েও নয়, কোনো ডিক্রি জারি করেও নয়, কিংবা নির্বাচনী বক্তৃতার মাধ্যমেও নয়। ইরান হুমকিতে ভয় পায় না, শক্তি প্রদর্শনেও ভীত হয় না।’

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র—উভয় পক্ষই প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের ক্ষেত্রে শুল্ক আরোপের সম্ভাবনার কথা বলেছে। গত মাসে ট্রাম্প প্রস্তাব দিয়েছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র এই নৌপথের ‘অভিভাবক’ হতে পারে এবং এর মধ্য দিয়ে যাওয়া পণ্যের ওপর ২০ শতাংশ ফি আরোপ করতে পারে।

তবে আইন বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, এ ধরনের শুল্ক আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করবে। আন্তর্জাতিক আইন সাধারণভাবে বাণিজ্যিক জাহাজের অবাধ চলাচলের অধিকার সুরক্ষিত রাখে।

ট্রাম্পের এই মন্তব্য যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ড সম্প্রসারণ নিয়ে তার আগের প্রস্তাবগুলোর ধারাবাহিকতায় এসেছে। ২০২৫ সালে দ্বিতীয়বার প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেওয়ার ভাষণে তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে ‘একটি ক্রমবর্ধমান জাতি’ হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন।

এরপর থেকে তিনি কানাডা এবং ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত ভূখণ্ড গ্রিনল্যান্ডসহ বিভিন্ন অঞ্চলকে তাদের সার্বভৌমত্ব ছেড়ে দেওয়ার জন্য চাপ দিয়ে আসছেন।

শুক্রবার এর আগে ট্রাম্প ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, তিনি ইরানকে দুর্বল ও বিচ্ছিন্ন করতে অর্থনৈতিক চাপ ব্যবহার করবেন। ইরান কয়েক দশক ধরেই যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর নিষেধাজ্ঞার আওতায় রয়েছে।

অন্যদিকে, আলাদা এক সাক্ষাৎকারে নিউজম্যাক্সকে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট বলেন, ইরানের অর্থনীতিকে আরও দুর্বল করার লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র আগামী কয়েক দিনের মধ্যে অতিরিক্ত অর্থনৈতিক পদক্ষেপ ঘোষণা করতে পারে।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad