জামালপুরবাসীর দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা ছিল আন্তঃনগর জামালপুর এক্সপ্রেস। ২০২০ সালে চালুর পর আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসমৃদ্ধ ট্রেনটি এ অঞ্চলের রেল যোগাযোগে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দেয়। তবে রুট পরিবর্তন, যাত্রীবান্ধব সময়সূচির অভাব এবং কম দূরত্বের যাত্রীদের জন্য পর্যাপ্ত আসন বরাদ্দ না থাকায় কয়েক বছরের ব্যবধানে ট্রেনটি এখন যাত্রীদের কাছে দুর্ভোগের প্রতীকে পরিণত হয়েছে।
যাত্রীদের অভিযোগ, এসব সমস্যা সমাধানে দীর্ঘদিন ধরে মানববন্ধন, ট্রেন অবরোধ ও স্মারকলিপি দেওয়ার মতো কর্মসূচি পালন করা হলেও বাংলাদেশ রেলওয়ে এখনো কার্যকর কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি।
২০২০ সালের ২৬ জানুয়ারি গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঢাকা-টাঙ্গাইল-বঙ্গবন্ধু সেতু পূর্ব-সরিষাবাড়ী-জামালপুর রুটে আন্তঃনগর জামালপুর এক্সপ্রেসের উদ্বোধন করেন।
ইন্দোনেশিয়া থেকে আমদানিকৃত পিটি ইনকা কোচে পরিচালিত ট্রেনটিতে রয়েছে আধুনিক এয়ার ব্রেক ব্যবস্থা, পরিবেশবান্ধব বায়ো-টয়লেট, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন যাত্রীদের জন্য বিশেষ আসন এবং প্রশস্ত প্রবেশদ্বার। ১৩টি কোচবিশিষ্ট ট্রেনটিতে মোট ৬২০টি আসন রয়েছে। এর মধ্যে ১১০টি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত স্নিগ্ধা এবং ৫১০টি শোভন শ্রেণির।
উদ্বোধনের পর ট্রেনটি যমুনা সেতু পূর্ব হয়ে টাঙ্গাইল রুটে চলাচল করলেও যমুনা সেতু পূর্ব স্টেশনের সংস্কারকাজের কারণে ২০২৩ সালের ১৫ এপ্রিল থেকে সাময়িকভাবে রুট পরিবর্তন করা হয়। বর্তমানে ট্রেনটি ঢাকা থেকে ময়মনসিংহ, জামালপুর ও সরিষাবাড়ী হয়ে ভূঞাপুর পর্যন্ত চলাচল করছে। এই পরিবর্তনের পর থেকেই যাত্রীদের ভোগান্তি বেড়েছে।
নিয়মিত যাত্রীদের ভাষ্য, দীর্ঘ রুট ও অতিরিক্ত যাত্রাবিরতির কারণে আন্তঃনগর ট্রেনটি কার্যত লোকাল ট্রেনের রূপ নিয়েছে। ঢাকা থেকে সকাল ১০টায় ছেড়ে বিভিন্ন স্টেশনে থেমে ট্রেনটি ভূঞাপুর পৌঁছায় বিকেল ৪টা ৪৫ মিনিটে। ফেরার পথে বিকেল ৫টা ১৫ মিনিটে ভূঞাপুর ছেড়ে কমলাপুর পৌঁছাতে রাত ১১টা ৫৫ মিনিট বা তারও বেশি সময় লাগে।
নিয়মিত যাত্রী শাকিল বলেন, এই সময়সূচির কারণে পুরো কর্মদিবস ট্রেনেই কেটে যায়। রাতে ঢাকায় পৌঁছানোর ফলে নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হয় এবং অনেক যাত্রীকে কমলাপুর স্টেশনেই রাত কাটাতে হয়। অফিস-আদালতের কাজে ঢাকায় গেলে অতিরিক্ত একদিন অবস্থান করতে হওয়ায় ব্যয়ও বেড়ে যাচ্ছে।
আরেক যাত্রী আতিফ জানান, কাছাকাছি দূরত্বের স্টেশনগুলোর জন্য পর্যাপ্ত টিকিট বরাদ্দ না থাকায় অনেক যাত্রী বাধ্য হয়ে বিনা টিকিটে ভ্রমণ করছেন। এতে সরকারও উল্লেখযোগ্য রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
রুট পরিবর্তনের কারণে টাঙ্গাইলগামী যাত্রীরাও বিপাকে পড়েছেন। যাত্রী রায়হান বলেন, আগে টাঙ্গাইল হয়ে ট্রেনটি চলাচল করায় যাতায়াত সহজ ছিল। বর্তমানে টাঙ্গাইলে যাওয়ার জন্য জামালপুর থেকে আর কোনো আন্তঃনগর ট্রেন না থাকায় ভোগান্তি বেড়েছে।
রোববার সাপ্তাহিক বন্ধ ছাড়া সপ্তাহে ছয় দিন চলাচলকারী ট্রেনটি বর্তমানে কমলাপুর থেকে ভূঞাপুর পর্যন্ত বিমানবন্দর, জয়দেবপুর, গফরগাঁও, ময়মনসিংহ, পিয়ারপুর, জামালপুর, জাফরশাহী, সরিষাবাড়ী, তারাকান্দিসহ প্রায় ১৩টি স্টেশনে যাত্রাবিরতি দেয়। প্রায় ২৩৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এই রুটে ঘন ঘন যাত্রাবিরতির কারণে আন্তঃনগর ট্রেনের স্বাভাবিক গতি ও বৈশিষ্ট্য ব্যাহত হচ্ছে বলে মনে করছেন যাত্রীরা।
পূর্বের রুট পুনর্বহাল, পর্যাপ্ত আসন বরাদ্দ এবং যাত্রীবান্ধব সময়সূচির দাবিতে দীর্ঘদিন ধরে সরিষাবাড়ী ও জামালপুরের বাসিন্দারা বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে আসছেন।
‘সরিষাবাড়ী নাগরিক সমাজ’-এর সভাপতি মো. ইউসূফ আলী বলেন, পূর্বের রুটে ট্রেনটি চালু হলে যাত্রাসময় কমবে, টাঙ্গাইল ও জামালপুর অঞ্চলের যোগাযোগ ও ব্যবসা-বাণিজ্য সহজ হবে। তাই দ্রুত যাত্রীবান্ধব সময়সূচিতে পূর্বের রুটে ট্রেনটি চালুর দাবি জানান তিনি।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ রেলওয়ের ঢাকা বিভাগীয় রেলওয়ে ব্যবস্থাপক (ডিআরএম) এ বি এম কামরুজ্জামান বলেন, রুট ও সময়সূচি পরিবর্তনের বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। বর্তমানে নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক রাখতে কাজ করা হচ্ছে। জনস্বার্থ ও সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবে।


