দেশের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোতে বর্তমানে এক অস্থির ও অনিশ্চিত পরিস্থিতি বিরাজ করছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অধিকাংশ স্থানীয় প্রতিনিধি আত্মগোপনে চলে যাওয়ায় শূন্যতা তৈরি হয়। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে অন্তর্বর্তী সরকার ১২টি সিটি করপোরেশন, ৩৩০টি পৌরসভা, ৪৯৭টি উপজেলা এবং ৬৪টি জেলা পরিষদ থেকে প্রতিনিধিদের অপসারণ করে।
বর্তমানে ইউনিয়ন পরিষদ বাদে প্রায় স্থানীয় সরকারের সব স্তরেই জনপ্রতিনিধির পরিবর্তে ‘প্রশাসক’ দিয়ে কার্যক্রম চালানো হচ্ছে, যা নাগরিক সেবায় মারাত্মক বিঘ্ন ঘটাচ্ছে।
তবে সম্প্রতি এসব স্থানীয় সরকার সংস্থায় প্রশাসক হিসেবে বিএনপি’র দলীয় ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়া শুরু হয়েছে। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনসহ ইতোমধ্যে ৪২টি জেলা পরিষদের প্রশাসক হিসেবে দলীয় নেতাদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। উপজেলাগুলোতেও একই ধরনের পরিকল্পনার কথা শোনা যাচ্ছে।
সরকারের পক্ষ থেকে এই পদক্ষেপকে জনসেবা সচল রাখার উপায় হিসেবে দাবি করা হলেও, বিরোধী রাজনৈতিক দল এবং বিশেষজ্ঞরা একে নির্বাচন বিলম্বিত করার এবং প্রতিষ্ঠানগুলো দখলের কৌশল হিসেবে দেখছেন।
স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর প্রশাসক নিয়োগের পক্ষে যুক্তি দিয়ে বলেছেন, সরকারি কর্মকর্তাদের পরিবর্তে রাজনৈতিক ব্যক্তিদের নিয়োগ দিলে জনসেবা আরও নিশ্চিত হবে। উল্লেখ্য, গত ১৮ ফেব্রুয়ারি সরকার গঠনের পর তিনি দ্রুত স্থানীয় সরকার নির্বাচন দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।
তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে জামায়াতে ইসলামীসহ অন্যান্য দলগুলো প্রশাসক নিয়োগের কড়া সমালোচনা করছে। জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আজাদ বলেছেন, এই নিয়োগগুলো মূলত প্রতিষ্ঠান ‘দখল’ করার নামান্তর, যা ভবিষ্যতে নির্বাচনকে প্রভাবিত করতে পারে। তিনি অতীতের মতো গ্রহণযোগ্য নির্বাচন ছাড়াই প্রতিষ্ঠান নিয়ন্ত্রণের চেষ্টার পুনরাবৃত্তি নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
একই সুরে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন এনসিপির যুগ্ম প্রধান সমন্বয়কারী আরিফুর রহমান তুহিন। তিনি মনে করেন, সরকার নির্বাচনের পথে না হেঁটে ভিন্ন পথে হাঁটছে। তার মতে, ‘নতুন বাংলাদেশে’ নির্বাচনের বিকল্প হিসেবে প্রশাসক নিয়োগ করে স্থানীয় নির্বাচন পিছিয়ে দেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের যুগ্ম মহাসচিব গাজী আতাউর রহমান একে ‘ফ্যাসিবাদী প্রবণতা’ হিসেবে উল্লেখ করে দলীয় অনুগতদের বসানোর পরিবর্তে দ্রুত নির্বাচনের দাবি জানিয়েছেন।
ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট-আইপিডি সতর্ক করে দিয়ে জানিয়েছে, প্রশাসক দিয়ে স্থানীয় সরকার পরিচালনা করলে এই ব্যবস্থা আরও দুর্বল হয়ে পড়বে। এর ফলে স্থানীয় পর্যায়ে চাঁদাবাজি ও ক্ষমতার অপব্যবহার বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
সংস্থাটির মতে, নির্বাচিত প্রতিনিধি ছাড়া শুধু প্রশাসক দিয়ে কার্যকর নাগরিক সেবা দেওয়া অসম্ভব। একমাত্র দ্রুত নির্বাচনই জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে এবং জনগণের ভোগান্তি কমাতে পারে।
নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ও সংস্কার কমিশনের সদস্য আব্দুল আলীম মনে করেন, আইনত প্রশাসক নিয়োগ বৈধ হলেও তারা কখনোই নির্বাচিত প্রতিনিধিদের বিকল্প হতে পারেন না। তিনি বলেন, নির্বাচিত প্রতিনিধিরা জনগণের স্পন্দন বোঝেন এবং তাদের কাছে দায়বদ্ধ থাকেন।
তিনি অনতিবিলম্বে সকল স্তরে নির্বাচনের দাবি জানান। একইসঙ্গে তিনি উল্লেখ করেন, বর্তমান আইনে নির্বাচন কমিশন (ইসি) নিজে থেকে স্থানীয় নির্বাচন শুরু করতে পারে না। তবে ইসিকে এই ক্ষমতা দেওয়ার প্রস্তাব করেছে সংস্কার কমিশন।
নির্বাচন কমিশনের ভেতরেও এই পরিস্থিতি নিয়ে মতভেদ রয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ইসি কর্মকর্তা জানান, সীমানা নির্ধারণের মতো বিষয়গুলো সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকায় অনেক সময় নির্বাচন বিলম্বিত হয়। বর্তমান দলীয় প্রশাসক নিয়োগ ইসির মধ্যে নির্বাচন আরও পিছিয়ে যাওয়ার উদ্বেগ বাড়িয়ে দিয়েছে।
নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাসুদ জানান, প্রয়োজনীয় পরিবেশ তৈরি হলে ইসি যেকোনো সময় নির্বাচন করতে প্রস্তুত। তিনি আশ্বস্ত করে বলেন, প্রশাসক নিয়োগের অর্থ এই নয় যে নির্বাচন হবে না।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, বিএনপি সরকার এখনই স্থানীয় নির্বাচন আয়োজনের কথা ভাবছে না। তাদের মনোযোগ এখন নীতি বাস্তবায়ন এবং প্রশাসনিক পুনর্গঠনের দিকে। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের জন্য দলটির প্রার্থী নির্বাচন ও সাংগঠনিক প্রস্তুতিও এখনো অসম্পূর্ণ।
প্রশাসক হিসেবে দায়িত্বরত এক বিএনপি নেতা জানান, ভোটার তালিকা হালনাগাদ এবং সীমানা চূড়ান্ত করতেই বেশ সময় প্রয়োজন। তবে একজন সংসদ সদস্য ও প্রতিমন্ত্রী দাবি করেন, সরকার দ্রুত নির্বাচনের পক্ষেই আছে। তিনি জানান, ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা এবং উপজেলা নির্বাচনকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। পরবর্তী ধাপে সিটি কর্পোরেশন ও জেলা পরিষদ নির্বাচন হবে।
আইন অনুযায়ী, সিটি কর্পোরেশনের মেয়াদ শেষ হওয়ার ১৮০ দিন আগে নির্বাচন করার বিধান রয়েছে। ইসির তথ্যমতে, ঢাকা দক্ষিণ ও উত্তর সিটির নির্বাচনের সময়সীমা ২০২৫ সালের জুনে এবং চট্টগ্রামের সময়সীমা ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে শেষ হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় ১ ফেব্রুয়ারি এই তিন সিটিতে নির্বাচন আয়োজনের জন্য ইসিকে অনুরোধ করেছিল।
তবে নির্বাচন কমিশনার আনোয়ারুল ইসলাম সরকার জানান, বর্তমান সরকারের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে নতুন কোনো যোগাযোগ করা হয়নি।
সর্বশেষ ২০২১ সালে ইউনিয়ন পরিষদ, ২০২০-২১ সালে পৌরসভা এবং ২০২২ সালে জেলা পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। বর্তমানে প্রায় সকল প্রতিষ্ঠানের মেয়াদ শেষ হওয়ায় এবং নির্বাচিত প্রতিনিধি না থাকায় প্রশাসক প্রথাই স্থানীয় সরকারের প্রধান ভরসা হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা ক্ষমতাসীন ছাড়া অন্যান্য রাজনৈতিক দলের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি করেছে।


