সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতিতে জামায়াতে ইসলামীর ভোট ও সমর্থন খুবই কম। তাদের হাতে নির্বাচনের মাঠে উপযুক্ত নিজস্ব প্রার্থী ছিল না। ওদিকে আওয়ামী লীগ সমর্থকরা প্রার্থী হতে পারেননি।
এ অবস্থায় নেপথ্যে থেকে সাধারণ অথচ হেভিওয়েট আইনজীবীদের নেতৃত্বে সরকারবিরোধী একটি ঐক্যবদ্ধ প্যানেল গঠনই হতে পারত আওয়ামী ভোটব্যাংক নিজেদের ঝুলিতে টানার ক্ষেত্রে জামায়াতের সবচেয়ে কার্যকর কৌশল।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, একগুঁয়েমি ও নিজস্ব গন্ডির বাইরে চিন্তা করতে না পারার কারণে নিজের যা ছিল; তাই নিয়ে ভোটের মাঠে নেমেছে দলটি। ফলস্বরূপ জামায়াত সমর্থিত প্যানেলের ভরাডুবি ঘটেছে। অর্থাৎ প্রার্থী নির্ধারণে কার্যকর কৌশল ও সম্ভাব্য বর্জনের মুখে থাকা ভোটগুলো টানতে না পারায় ভোটের আগেই নির্বাচনে হেরেছে সবুজ প্যানেল। ফলে জাতীয় নির্বাচনে ঈর্ষণীয় ফলাফল অর্জন করতে পারলেও পেশাজীবী সংগঠনের ক্ষেত্রে তা ধরে রাখতে পারেনি।
জামায়াতের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত কিন্তু দলটির কোনো বড় পদে নেই, সুপ্রিম কোর্টের এমন একজন সিনিয়র আইনজীবী টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, নির্বাচনের ক্ষেত্রে অনেক হিসাবনিকাশ করতে হয়, ছাড় দিতে হয়। কিন্তু, জামায়াত সাধারণত নিজের বাইরে গিয়ে কোনো চিন্তা করতে পারে না। তারা প্যানেল দেওয়ার ক্ষেত্রে চিন্তা করে প্রার্থী আমার লোক কি না, দলের রুকন কি না। ফলে সাধারণ আইনজীবীদের প্যানেলে টানতে পারে না।
পর্যবেক্ষকদের মতে, সমিতির নির্বাচনে এনসিপি সমর্থিতসহ তিনটি প্যানেল প্রার্থিতা দিলেও মূলত প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়েছে বিএনপি সমর্থিত নীল ও জামায়াত সমর্থিত সবুজ প্যানেলে। এই দুটি প্যানেলের মধ্যে জামায়াতের প্যানেল ছিল ভোটের মাঠে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও প্রার্থিতার ক্ষেত্রে খুবই দুর্বল।
নীল প্যানেলের সভাপতি পদে বিজয়ী প্রার্থী এএম মাহবুব উদ্দিন খোকনের নির্বাচনী ক্যারিয়ার আছে, আইনজীবী সমিতিতে এর আগেও দুবার সভাপতি হয়েছেন। সাত বারের সম্পাদক ছিলেন। তিনি অনেক চ্যানেল মেইনটেইন করেন। তার বিপরীতে সভাপতি পদে জামায়াত আবদুল বাতেনকে দাঁড় করিয়েছে, যিনি সিনিয়র আইনজীবীই নন। তিনি আগে একবার সমিতির সিনিয়র সহসভাপতি থাকলেও সেটি সম্ভব হয়েছিল বিএনপির নেতৃত্বাধীন প্যানেলে থাকার কারণে।
নীল প্যানেল থেকে সম্পাদক পদে বিজয়ী প্রার্থী মোহাম্মদ আলীর চেয়ে সবুজ প্যানেল থেকে সম্পাদক প্রার্থী রেজাউল করিম তুলনামূলকভাবে আইনজীবীদের মধ্যে কম পরিচিত।
সূত্র জানায়, আলোচিত একজন সিনিয়র আইনজীবীর সভাপতি পদে প্রার্থী হওয়ার কথা থাকলেও জামায়াত তাকে সমর্থনের ক্ষেত্রে দলের প্রাথমিক সদস্যপদ পূরণের দাবি তোলে। কিন্তু ওই আইনজীবী জামায়াতে যোগদানে রাজি না হওয়ায় তাকে আর মনোনয়ন দেওয়া হয়নি। সিনিয়র আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনিরকে সম্পাদক পদে জামায়াত প্রার্থী করতে চাইলেও তিনি প্রস্তুতি না থাকার কারণে রাজি হননি।
জামায়াতের এই প্যানেল নিয়ে নিজেদের প্রার্থীদের মধ্যেই অসন্তোষ ছিল। এমনকি সিনিয়র আইনজীবী মোহাম্মদ হোসেন লিপুকে সম্পাদক প্রার্থী করে ঐক্যবদ্ধ প্যানেল দিতেও কেন্দ্রীয় নেতাদের কাছে দাবি জানান পাঁচজন প্রার্থী। অন্যথায় নির্বাচন থেকে নিজেরা সরে দাঁড়ানোর হুমকি দেন তারা।
এর পরিপ্রেক্ষিতে সহসম্পাদক পদে এবি পার্টির সদস্য জোবায়ের আহমেদ ভূঁইয়াকে প্যানেলে অন্তর্ভুক্ত করা হলেও লিপুর ক্ষেত্রে দাবি মানা হয়নি। সবুজ প্যানেলসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এনসিপি লিপুকে সম্পাদক প্রার্থী করে জামায়াত সমর্থিতদের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ প্যানেল করতে চাইলেও সুপ্রিম কোর্টে জামায়াতের সক্রিয় দুটি সংগঠনের গুটি কয়েক নেতার কারণে তা সম্ভব হয়নি।
রেজাউল করিম সম্পাদক পদে প্রার্থী হয়েছেন। লিপু এনসিপির প্যানেল থেকে প্রার্থী হলেও পরে সরে দাঁড়ান। লিপুকে কেন্দ্র করেই জামায়াতের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ প্যানেল গঠনের উদ্যোগ পণ্ড হয়ে যায় বলে টাইমসকে নিশ্চিত করেছেন এনসিপির আইনজীবী সংগঠন ন্যাশনাল ল’ইয়ার্স অ্যালায়েন্সের মুখ্য সংগঠক শাকিল আহমাদ।
জানা গেছে, সুপ্রিম কোর্টের একজন সিনিয়র আইনজীবীর সঙ্গে জামায়াতের কেন্দ্রীয় সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বৈঠক করে লিপুর প্রার্থিতার বিষয়ে ইতিবাচক মতামত নিলেও সুপ্রিম কোর্টে কর্মরত জামায়াত সমর্থক আইনজীবীদের সংগঠনের কয়েকজন নেতার বাধার কারণে তাকে প্রার্থী করা যায়নি।
সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির নির্বাচনে ভোটের ক্ষেত্রে অনেক দিক বিবেচনা করা হয়। প্রার্থীর ব্যক্তিত্ব, ব্যক্তিগত যোগ্যতা ও মেধাও বিবেচনায় আসে। এই সমিতি অতীতে অনেক আন্দোলন-সংগ্রামের নেতৃত্ব দিয়েছে; বর্তমান বা ভবিষ্যতেও এর সুযোগ ও সম্ভাবনা রয়েছে। সমিতির সভাপতির বক্তব্যের আলাদা গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে।
এসব বিবেচনায় ক্ষমতাসীন দল ও বিরোধী দলগুলো সবসময় সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির নির্বাচনকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়। সমিতিকে নিজের কব্জায় রাখতে চায়।
আইনজীবীরা জানান, নির্বাচনে জেতার মতো কাঙ্ক্ষিত ও যোগ্যতা সম্পন্ন প্রার্থী সব সময় একটি দলের হাতে নাও থাকতে পারে। এ ক্ষেত্রে সমমনা অন্য কাউকে মনোনয়ন দিয়ে মাঠে নামানো হয়। যেমন, শেখ হাসিনার প্রথম শাসনামলে সমিতির নির্বাচনের সময় নিজের দলে ভালো প্রার্থী না থাকায় সিনিয়র আইনজীবী হাবিবুল ইসলাম ভূঁইয়াকে বিএনপি মনোনয়ন দেয়।
তিনি সুপ্রিম কোর্টের একজন বিচারপতি ছিলেন। এরশাদের মন্ত্রিসভায় আইনমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৯৯৮ সালে সুপ্রিম কোর্ট বারে তিনি সভাপতি নির্বাচিত হন।
এ ক্ষেত্রে সিনিয়র আইনজীবী মইনুল হোসেন ও খন্দকার মাহবুব হোসেনের কথাও উল্লেখযোগ্য। আইনজীবী সমিতির নির্বাচনের সময় বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত না থাকলেও দলটি সভাপতি পদে তাদের প্রার্থী করেছিল। তারা বিজয়ী হন। পরবর্তী সময়ে খন্দকার মাহবুব বিএনপিতে যোগ দিলেও মইনুল হোসেন বিএনপির রাজনীতিতে জড়াননি। জামায়াত এ রকম কোনো কৌশল নেয়নি।
জামায়াতের রাজনীতির সমর্থক, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী আশরাফ-উজ-জামান টাইমসকে বলেন, জামায়াতের নেতৃত্বে সর্বদলীয় প্যানেল করলে ভালো হতো। আওয়ামী লীগ তো জামায়াতকে ভোট দেবে না। তাদের ভোট আনার ব্যবস্থা থাকতে হবে তো।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সুপ্রিম কোর্টে জামায়াত সমর্থক আইনজীবীদের দুটি সংগঠন রয়েছে। একটি মূল জামায়াতের, জামায়াত সমর্থক আইনজীবীরা অন্য সংগঠনের সদস্য। জামায়াত সমর্থক আইনজীবীদের সংগঠন বাংলাদেশ ল’ইয়ার্স কাউন্সিলের সুপ্রিম কোর্ট শাখার সাধারণ সম্পাদক আবদুল বাতেন সমিতির নির্বাচনে সভাপতি প্রার্থী হন।
জামায়াতের সুপ্রিম কোর্ট দক্ষিণ শাখার সাধারণ সম্পাদক এ কে এম রেজাউল করিম খন্দকার সমিতির নির্বাচনে সম্পাদক পদে প্রার্থী হন। শফিকুর রহমানের নেতৃত্বে জামায়াতের সুপ্রিম কোর্ট উত্তর শাখার একটি কমিটি রয়েছে।
সূত্র জানায়, এসব কমিটির মধ্যে সমন্বয় নেই, গ্রুপিং আছে, পরস্পরের কথা শোনে না। যেমন, জামায়াতের দুটি সংগঠনের নেতারা সমিতির সভাপতি, সম্পাদক পদের প্রার্থিতা বাগিয়ে নিয়েছেন। তারা নিজেদের প্রার্থিতার গুরুত্ব জামায়াতের কেন্দ্রীয় সংগঠনকে বোঝালেও আইনজীবী সমিতিতে কার কার প্রার্থী হওয়া উচিত, এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় জামায়াতকে সঠিক তথ্য জানানো হয়নি।
আইনজীবী সমিতিতে জামায়াতের প্যানেল থেকে নির্বাচন করেছেন, এমন একজন প্রার্থী টাইমসকে জানান, এসব সংগঠনের পদলোভী নেতারা নিজেদের সিদ্ধান্ত কেন্দ্রীয় সংগঠনের নামে কর্মীদের ওপর চালিয়ে দেন। এখানে একটি সিন্ডিকেট কাজ করে। আর কেন্দ্রীয় জামায়াতের কাছে অভিযোগ করা হলে কেন্দ্রীয় সংগঠন জানায়, এটা সুপ্রিম কোর্টে কর্মরত সংগঠনের নেতাদের সিদ্ধান্ত।
সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী মুহাম্মদ বেলায়েত হোসেন টাইমসকে বলেন, জামায়াত নিজের সাংগঠনিক সিস্টেমে প্যানেল দিয়েছে। প্যানেল দেওয়ার সময় মাঠ পর্যায়ে হয়তো গবেষণা, পর্যালোচনা করা হয়নি। তাড়াহুড়া করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। প্রচারণাও ভালোভাবে চালাতে পারেনি।
জামায়াতের সুপ্রিম কোর্ট দক্ষিণ শাখার সহসভাপতি সাইফুর রহমান টাইমসকে বলেন, ‘যোগ্য প্রার্থীদের নেতৃত্বে আমরা প্যানেল দিয়েছি। সভাপতি, সম্পাদক পদে প্রার্থীরা আইনজীবী সমিতিতে এর আগে অন্য পদে নির্বাচিত হয়েছেন। আমাদের প্যানেল দুর্বল নয়।’
সিন্ডিকেটের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এ ধরনের অভিযোগ ভিত্তিহীন।’ বিএনপির সম্ভাব্য জয়ের বৈধতা দেওয়ার জন্য জামায়াত দুর্বল প্রার্থী দিয়েছে কি না, এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘আমরা বিরোধী দল, আমাদের তো প্যানেল থাকতেই হবে। আমরা কাউকে বৈধতা দিতে নির্বাচন করিনি। নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান ও আইনজীবীদের সমর্থনের ভিত্তিতে নির্বাচন করেছি।’


