সুদানের আবেই এলাকায় গত ১৩ ডিসেম্বর জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনীর ঘাঁটিতে সন্ত্রাসীদের ড্রোন হামলায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ছয়জন সদস্য নিহত হন।
শনিবার এমিরেটস এয়ারলাইন্সের একটি বিমানে করে নিহতদের মরদেহ দেশে পৌঁছায়। রোববার ঢাকা সেনানিবাসের কেন্দ্রীয় মসজিদে তাদের নামাজে জানাজা হয়।
পরে রোববার নিহত তিন সেনা সদস্যের মরদেহ নিজ নিজ এলাকায় পাঠানো হয়। সেখানে মরদেহ দাফন করা হয়েছে। বিস্তারিত প্রতিনিধিদের পাঠানো প্রতিবেদনে-

বাবার কবরের পাশে নিহত শহীদ মাসুদ রানার দাফন
রোববার বিকাল ৪টার দিকে নাটোরের লালপুর উপজেলার বোয়ালিয়াপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নিহত শহীদ কর্পোরাল মাসুদ রানার জানাজা নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। পরে পারিবারিক কবরস্থানে বাবার কবরের পাশে মরদেহ দাফন করা হয়েছে।
এর আগে, মাসুদ রানাকে গার্ড অব অনার দেয় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ১১ পদাতিক ডিভিশনের একটি দল।
শহীদ মাসুদ রানা লালপুর উপজেলার বোয়ালিয়াপাড়া গ্রামের মৃত সাহার উদ্দিনের বড় ছেলে।
জানা গেছে, রোববার বেলা ১১টার দিকে মাসুদ রানার মরদেহ বহনকারী সেনাবাহিনীর হেলিকপ্টারটি তার গ্রামের বাড়ি সংলগ্ন করিমপুর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে অবতরণ করে। সেখান থেকে সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে কফিন বাড়িতে আনা হয়।
নিহতের পরিবার জানায়, তিন ভাইয়ের মধ্যে মাসুদ রানা ছিলেন সবার বড়। ২০০৬ সালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে যোগ দেন তিনি। তার মেজো ভাই মনিরুল ইসলাম এবং ছোট ভাই রনি আলমও বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে আছেন। সর্বশেষ শান্তিরক্ষা মিশনে যাওয়ার আগে মাসুদ রানা যশোর ক্যান্টনমেন্টে কর্মরত ছিলেন।

সামরিক মর্যাদায় চিরনিদ্রায় শায়িত বীর সেনা শামীম রেজা
রোববার বিকাল সাড়ে ৩টার দিকে রাজবাড়ীর কালুখালী উপজেলার মৃগী ইউনিয়নের হোগলাডাঙ্গি গ্রামে পারিবারিক কবরস্থানে যথাযথ সামরিক মর্যাদায় নিহত সেনা সদস্য শহীদ শামীম রেজার দাফন সম্পন্ন হয়েছে।
একই দিন দুপুর পৌনে ২টার দিকে শহীদ শামীমের মরদেহবাহী হেলিকপ্টারটি কালুখালী মিনি স্টেডিয়ামে অবতরণ করে। সেখানে থেকে সেনাবাহিনীর একটি দল মরদেহটি লাশবাহী ফ্রিজিং ভ্যানে করে মৃগী ইউনিয়নের হোগলাডাঙ্গি গ্রামে তার নিজ বাড়িতে নিয়ে যায়।
সেখানে স্বজন ও এলাকাবাসীর দেখার জন্য প্রায় আধাঘন্টা মরদেহটি রাখা হয়। এরপর বাড়ির কাছে পারিবারিক কবরস্থানে নিয়ে জানাজা নামাজ শেষে যথাযথ সামরিক মর্যাদায় মরদেহ দাফন করা হয়।
শামীমের বাবা আলম ফকির জানান, তিনি কৃষিকাজ করে শামীমকে লেখাপড়া শিখিয়েছেন। ২০১৮ সালের ১৪ জানুয়ারি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে যোগ দেন শামীম। গত ৭ নভেম্বর তিনি জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে সুদানে যান।
‘সবশেষ ১২ ডিসেম্বর আমার ছেলের সঙ্গে আমার মোবাইলে ভিডিও কলে কথা হয়। ওই সময় ছেলে জানায়, সে সুস্থ আছে। বলল, আব্বু আমি ডিউটিতে যাবো দোয়া করো। কিন্তু ডিউটিতে গিয়ে আর ফিরল না আমার ছেলেটা। পরদিন ১৩ ডিসেম্বর রাত ১২টার দিকে আমরা খবর পাই আমার ছেলে আর নেই’ বলে কান্নায় ভেঙে পড়েন নিহত শামীমের বাবা।
তিনি বলেন, ‘আমার ছেলে দেড় বছর আগে কুষ্টিয়ার খোকসায় বিয়ে করেছে। শামীমের স্বপ্ন ছিল ছোট ভাইবোনদের ভবিষ্যৎ গড়ে দিবে। সে আমার মেজ ছেলেকে সৌদি আরব পাঠিয়েছে। ছোট ছেলেকে সিঙ্গাপুর পাঠানোর জন্য পাসপোর্ট করেছে। মিশন থেকে ফেরার সময় একমাত্র বোনের জন্য সোনার গহনা নিয়ে আসতে চেয়েছিল। কিন্তু সব স্বপ্নই এক নিমিষে শেষ হয়ে গেল। সবাই আমার ছেলের জন্য দোয়া করবেন, আল্লাহ যেনো আমার ছেলেকে “জান্নাতুল ফেরদাউস” নসীব করেন।’

ছেলের শোকে বার বার জ্ঞান হারান নিহত সবুজ মিয়ার মা
সুদানে শান্তিরক্ষী মিশনে নিহত সেনা সদস্য সবুজ মিয়াকে গার্ড অফ অনার ও রাষ্ট্রীয় সম্মাননা শেষে বাবার কবরের পাশে মরদেহ সমাহিত করা হয়েছে।
রোববার বিকাল ৪টার দিকে গাইবান্ধার পলাশবাড়ী উপজেলার মহদীপুর ইউনিয়নের আমলাগাছি (ছোট ভবনপুর) গ্রামে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়।
একই দিন সবুজ মিয়ার মরদেহ সেনাবাহিনীর নিজস্ব একটি হেলিকপ্টারে করে গাইবান্ধা তুলশীঘাট হিলিপ্যাডে অবতরণ করেন। পরে একটি অ্যাম্বুলেন্সে করে তার গ্রামের বাড়ি পলাশবাড়ী উপজেলার মহদিপুর ইউনিয়নের আমলাগাছি (ছোট ভবনপুর) পৌঁছায়।
সরেজমিনে দেখা যায়, সবুজ মিয়ার বাড়িতে উপস্থিত রয়েছেন অসংখ্য মানুষ। তার মা ছকিনা বেগম ছেলের মৃত্যুতে বার বার জ্ঞান হারিয়ে ফেলছেন। পাড়া-প্রতিবেশী, আত্মীয়-স্বজন তাকে সান্ত্বনা দিচ্ছেন।
স্বামী হারানোর শোকে বিলাপ করতে দেখা যায় সবুজের স্ত্রী নূপুর আক্তারকে। তিনি বলেন, ‘এক বছর আট মাস আগে বিয়ে হয়েছে। এখন আমার সব শেষ হয়ে গেল।’


