আগের ম্যাচে বেঞ্চে বসে থাকলেও এবার শুরু থেকে মাঠে নামার সুযোগ পেয়েছিলেন ইয়োহান মানজাবি ও রুবেন ভার্গাস। কোচের সেই আস্থার প্রতিদান তারা দিলেন সোনায় সোহাগা পারফরম্যান্সে। এই দুই তারকার টানা দ্বিতীয় ম্যাচের গোলে কানাডাকে হারিয়ে গ্রুপ সেরা হয়ে বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে পা রাখল সুইজারল্যান্ড।
বুধবার ভ্যাঙ্কুভারে বি গ্রুপের শেষ রাউন্ডের এই হাইভোল্টেজ ম্যাচে ২-১ গোলে জিতেছে সুইসরা। ম্যাচের সবকটি গোল হয়েছে দ্বিতীয়ার্ধে। কানাডার হয়ে একমাত্র ব্যবধান কমানো গোলটি করেন প্রমিস ডেভিড। তবে এই হারের পরও ঘরের মাঠে প্রথমবার বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে যাওয়ার মহাকাব্য লিখেছে কানাডা।
তিন ম্যাচে দুই জয় ও এক ড্রয়ে ৭ পয়েন্ট পকেটে পুরে গ্রুপের সিংহাসন দখল করেছে সুইজারল্যান্ড। সমান ম্যাচে একটি করে জয় ও ড্রয়ে ৪ পয়েন্ট নিয়ে টেবিলের দুই নম্বরে থেকে রানার্সআপ হিসেবে পরের রাউন্ড নিশ্চিত করেছে কানাডা।
একই সময়ে গ্রুপের অন্য ম্যাচে কাতারকে ৩-১ গোলে হারিয়ে বসনিয়া ও হার্জেগোভিনাও ৪ পয়েন্ট অর্জন করেছে। তবে গোল পার্থক্যের মারপ্যাঁচে তারা টেবিলের তিনে থাকায় এখন সেরা আটটি তৃতীয় স্থানাধিকারী দলের একটি হিসেবে পরের পর্বে যাওয়ার লাইনে দাঁড়িয়ে আছে। আর মাত্র ১ পয়েন্ট নিয়ে গ্রুপ পর্ব থেকে তলানি দিয়ে বিদায় নিয়েছে কাতার।
বিগত দিনের ইতিহাস বলছে, এর আগে দুইবার বিশ্বকাপে অংশ নিয়ে নিজেদের খেলা ছয়টি ম্যাচের সবকটিতে হেরেছিল কানাডা। এবার ঘরের মাঠের আসরে যেন অন্য এক কানাডার রূপ দেখল ফুটবল বিশ্ব।
প্রথম ম্যাচে বসনিয়ার সঙ্গে ১-১ ড্রয়ে বিশ্বমঞ্চে নিজেদের প্রথম পয়েন্টের খাতা খোলে সহআয়োজক দলটি। এরপর দ্বিতীয় ম্যাচে কাতারকে ৬-০ গোলে খড়কুটোর মতো উড়িয়ে দিয়ে তুলে নেয় প্রথম ঐতিহাসিক জয়। ফলে সুইসদের কাছে শেষ ম্যাচে হারলেও জেসি মার্শের দল গ্রুপ পর্বের বৈতরণী পার হতে কোনো সমস্যায় পড়েনি।
ম্যাচের শুরু থকেই দুই দলের ফুটবলারদের মধ্যে মাঠের দখল নেওয়ার লড়াই ছিল দেখার মতো। ৫৫ শতাংশ বলের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের পায়ে রেখে গোলের জন্য ছয়টি শট নিয়েছিল সুইজারল্যান্ড, যার মধ্যে চারটি ছিল অন টার্গেট। অন্যদিকে কানাডা আক্রমণের ধার বাড়িয়ে ১৩টি শট নেয় এবং এর সাতটি শটই সুইসদের গোলপোস্টে লক্ষ্যে ছিল।
ম্যাচের একাদশ মিনিটেই প্রথম কাঁপন ধরায় সুইজারল্যান্ড। বল পায়ে নিয়ে সরাসরি বক্সে ঢুকে পড়েন ব্রিল এমবোলো। তবে ওয়ান অন ওয়ান পজিশনে তার নেওয়া শটটি শরীর ছুড়ে দিয়ে রুখে দেন কানাডার বাজপাখি খ্যাত গোলরক্ষক মাক্সিম ক্রেপো। এরপরও সুইসদের সামনে সুযোগ ছিল, তবে বসনিয়ার বিপক্ষে আগের ম্যাচে জোড়া গোল করা মানজাবির প্রচেষ্টা এবার এক ডিফেন্ডারের দেওয়ালে ধাক্কা খেয়ে ফিরে আসে।
এর ঠিক দুই মিনিট পর পাল্টা আক্রমণে কানাডার ল্যারিন সতীর্থের নিখুঁত থ্রু বল ধরে বক্সে ঢুকে পড়েছিলেন। সুইস গোলরক্ষককে কাটানোর চেষ্টা করলেও শেষ পর্যন্ত তিনি ব্যর্থ হন এবং পরে লাইন্সম্যান অফসাইডের পতাকা তোলেন। ম্যাচের ৩৩তম মিনিটে আবারও সুযোগ আসে কানাডার সামনে। বক্সের ভেতর থেকে ল্যারিনের নেওয়া নিচু শটটি দক্ষতার সাথে ঠেকিয়ে দেন সুইস প্রাচীর গ্রেগর কোবেল। ৪১তম মিনিটে ল্যারিনের আরও একটি জোরালো আক্রমণ নসাৎ করে দেন এই গোলরক্ষক। ফলে গোলশূন্যভাবেই শেষ হয় প্রথমার্ধের খেলা।
বিরতি থেকে ফিরে খোলস ছেড়ে বের হয় সুইজারল্যান্ড। দ্বিতীয় বাউন্ডের খেলা শুরু হতে না হতে গোল উৎসবের খাতা খোলেন রুবেন ভার্গাস। ডান দিক দিয়ে দুর্দান্ত গতিতে বক্সে ঢুকে নিখুঁত এক পাস বাড়িয়ে দেন মানজাবি। সেই বল এমবোলোর পা ফস্কে গেলেও পেছনে ওত পেতে থাকা ভার্গাস নিচু শটে বল জালে জড়িয়ে দেন। বসনিয়ার বিপক্ষে আগের ম্যাচেও একটি গোল করেছিলেন এই সুইস তারকা।
ম্যাচের ৫৭তম মিনিটে কানাডার রক্ষণভাগকে স্তব্ধ করে ব্যবধান দ্বিগুণ করে সুইজারল্যান্ড। এবার এমবোলোর পাস থেকে বক্সের ভেতর বল পান ২০ বছর বয়সী তরুণ তুর্কি মানজাবি। তার নেওয়া জোরাল শটটি কানাডার গোলরক্ষকের হাতে লাগলেও বলের গতি এতোটাই বেশি ছিল যে তা আটকানো সম্ভব হয়নি। বসনিয়ার বিপক্ষেও এই তরুণের পা থেকে এসেছিল জোড়া গোল।
তবে দুই গোলে পিছিয়ে পড়েও হাল ছাড়েনি স্বাগতিক কানাডা। ম্যাচের ৭৫তম মিনিটে বদলি খেলোয়াড় হিসেবে মাঠে নামার পরের মিনিটে স্টেডিয়ামের দর্শকদের উল্লাসে মাতান প্রমিস ডেভিড। বক্সে প্রথম স্পর্শে বল নিয়ন্ত্রণে নিয়ে দ্বিতীয় টাচেই অন্য পাশে পাস বাড়িয়ে দেন সালিবা, আর সেই উড়ন্ত বলে নিখুঁত ভলিতে গোলপোস্টের জাল খুঁজে নেন ডেভিড। ম্যাচের শেষ দিকে সমতা টানার জন্য মরিয়া হয়ে একের পর এক আক্রমণ করতে থাকে কানাডা। কিন্তু সুইস গোলরক্ষক গ্রেগর কোবেলের অতন্দ্র প্রহরীর মতো দাঁড়িয়ে থাকা দেয়াল তারা আর কোনোভাবেই ভাঙতে পারেনি।
গ্রুপের অন্য ম্যাচে কাতারকে ৩-১ গোলে হারিয়ে টুর্নামেন্টে টিকে থাকার জোর আশা বাঁচিয়ে রেখেছে বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা। ৪ পয়েন্ট নিয়ে টেবিলের তিনে শেষ করা দলটি এখন বাকি গ্রুপগুলোর সমীকরণের দিকে তাকিয়ে থাকবে পরের রাউন্ডের টিকিটের জন্য। অন্যদিকে গ্রুপ পর্বে কোনো জয়ের মুখ না দেখে এবং টানা তিন ম্যাচ হেরে একদম শূন্য হাতে বিশ্বকাপ মিশন শেষ করল এশিয়ান কাপের চ্যাম্পিয়ন কাতার।


