বিপুল অঙ্কের টাকা বরাদ্দ দেওয়ার পরেও সিলেট বিভাগে ভিক্ষুক পুনর্বাসন প্রকল্পের অগ্রগতি হতাশাজনক। গত এক দশকে এই অঞ্চলে প্রায় পৌনে তিন কোটি টাকা ব্যয় করা হলেও পুনর্বাসিত হয়েছেন মাত্র ৮৯৬ জন ভিক্ষুক।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তদারকির অভাবে অনেকে সহায়তার সামগ্রী বিক্রি করে আবারও ভিক্ষাবৃত্তিতে ফিরে যাচ্ছেন। ফলে সরকারের বড় অঙ্কের বাজেট বরাদ্দ থাকার পরেও এই পুনর্বাসন প্রক্রিয়া কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন করতে পারছে না।
সারা দেশে ভিক্ষুকদের পুনর্বাসনের জন্য ২০১০ সালে ‘ভিক্ষুক পুনর্বাসন প্রকল্প’ হাতে নিয়েছিল আওয়ামী লীগ সরকার। এই প্রকল্পের শুরুতে মোটা অঙ্কের টাকা বরাদ্দ রেখে দেশব্যাপী জরিপ ও পাইলটিং প্রকল্প চালাতেই কেটে যায় প্রথম ৪ বছর। এরপর ২০১৫-১৬ অর্থবছর থেকে স্থানীয় পর্যায়ে আনুষ্ঠানিকভাবে ভিক্ষুক পুনর্বাসনের মূল মাঠপর্যায়ের কাজ শুরু হয়, যা এখন পর্যন্ত চলমান রয়েছে।
প্রকল্পের শুরুতে ২০১০-১১ অর্থবছরে সারা দেশে ভিক্ষুক পুনর্বাসনে বরাদ্দ ছিল ৩ কোটি ২৬ লাখ টাকা। এরপর ২০১১-১২ অর্থবছরে ৬ কোটি ৭০ লাখ টাকা, ২০১২-১৩ অর্থবছরে ১০ কোটি টাকা, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে এক কোটি টাকা এবং ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ৫০ লাখ টাকা বরাদ্দ করা হয়। তবে এই দীর্ঘ সময়ে বরাদ্দের অর্থ কেবল জরিপ এবং ময়মনসিংহ ও জামালপুর জেলায় পাইলটিং প্রকল্প খাতেই ব্যয় করা হয়েছে।
এরপর ২০১৫ সালে স্থানীয় পর্যায়ে পুনর্বাসন কাজ শুরু হলে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে এক লাফে ৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। সেই অর্থবছরের পুরো টাকাই ভিক্ষুক পুনর্বাসনে ব্যয় করা হলেও সারা দেশে উপকারভোগীর সংখ্যা ছিল মাত্র ২৫১ জন। সর্বশেষ বিগত তিন অর্থবছর ধরে সারা দেশে এই খাতে প্রতিবছর ১২ কোটি টাকা করে বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
স্থানীয়ভাবে কাজ শুরু হওয়ার পর থেকে সিলেট বিভাগে এ পর্যন্ত মোট ২ কোটি ৭৬ লাখ টাকার বেশি বরাদ্দ হয়েছে। এর মধ্যে জেলাভিত্তিক বরাদ্দের হিসাবে সিলেট জেলায় ৫৬ লাখ ৫১ হাজার টাকা, মৌলভীবাজারে ৪৪ লাখ টাকা, সুনামগঞ্জে ৯৩ লাখ ২৮ হাজার টাকা এবং হবিগঞ্জে ৮২ লাখ ২৪ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়।
এই বিপুল বরাদ্দের বিপরীতে বিভাগের চার জেলায় এ পর্যন্ত মাত্র ৮৯৬ জন ভিক্ষুককে পুনর্বাসিত করা সম্ভব হয়েছে। জেলাভিত্তিক পুনর্বাসনের হিসাবে সিলেটে ১৯০ জন, মৌলভীবাজারে ৯৪ জন, সুনামগঞ্জে ২৯৫ জন এবং হবিগঞ্জে ৩১৭ জন ভিক্ষুক পুনর্বাসিত হয়েছেন। সেলাই মেশিন, গবাদি পশু ও ক্ষুদ্র ব্যবসার পুঁজি দিয়ে তাদের পুনর্বাসিত করা হয়েছে বলে জানিয়েছে সমাজসেবা অধিদপ্তর।
বর্তমানে সিলেটে কত সংখ্যক মানুষ ভিক্ষাবৃত্তিতে জড়িত, সমাজসেবা অধিদপ্তরের কাছে তার সুনির্দিষ্ট কোনো পরিসংখ্যান নেই। তবে সিলেট নগরীসহ বিভিন্ন উপজেলা পর্যায়ে ভিক্ষুকদের উপস্থিতি দিন দিন বাড়ছে। একই সঙ্গে মৌসুমী ভিক্ষুকদের সংখ্যাও এখন চোখে পড়ার মতো।
সিলেট নগরীর গুরুত্বপূর্ণ এলাকা, মাজার, হাসপাতাল ও বাসস্ট্যান্ডগুলোতে অহরহ ভিক্ষুক দেখা যায়। দূরপাল্লার বাস ও ট্রেনের ভেতরেও ভিক্ষুকদের কারণে সাধারণ মানুষ অতীষ্ট হচ্ছেন। এর পাশাপাশি বাসাবাড়িতেও দলবেঁধে ভিক্ষুকরা ছুটছেন। এদের মধ্যে অনেকেই ভিক্ষাবৃত্তিকে স্থায়ী পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন।
সমাজসেবা অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, পুনর্বাসনের জন্য কোনো ভিক্ষুককে সরাসরি নগদ অর্থ দেওয়া হয় না, বরং তারা যে কাজে সক্ষম, তাদের সেই কাজের প্রয়োজনীয় সামগ্রী কিনে দেওয়া হয়। পুনর্বাসিত ভিক্ষুকদের ফলোআপ বা পরবর্তী তদারকি প্রতিবেদন সবার ক্ষেত্রে হতাশাজনক নয় বলে মন্তব্য করেন কোনো কোনো কর্মকর্তা।
সমাজসেবা অধিদপ্তরের সিলেট জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক (কার্যক্রম ও সামাজিক নিরাপত্তা) মোহাম্মদ রফিকুল হক বলেন, একেকজন ভিক্ষুককে তার সক্ষমতার ভিত্তিতে সর্বোচ্চ এক লাখ ২০ হাজার থেকে এক লাখ ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত সহায়তা দেওয়া হয়েছে। এই প্রক্রিয়ায় স্থানীয় পর্যায়ের স্থায়ী বাসিন্দাদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়, যাতে তারা দোকান বা সামগ্রী বিক্রি করে অন্য কোথাও চলে যেতে না পারেন।
তিনি আরও বলেন, এই প্রকল্পের অধীনে বিশেষ করে যারা শারীরিকভাবে অক্ষম কিন্তু কাজ করার সামান্য সক্ষমতা আছে, তাদেরকে পুনর্বাসনে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। পুনর্বাসিত ব্যক্তিরা ভালো আছেন এবং তারা আর ভিক্ষাবৃত্তিতে ফিরে যাননি বলেও দাবি করেন রফিকুল হক।
তবে সমাজসেবা অধিদপ্তরের হবিগঞ্জ জেলার উপপরিচালক মো. হাবিবুর রহমান জানান, পুনর্বাসন প্রক্রিয়া প্রত্যাশা অনুযায়ী সফল হচ্ছে না। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, ভিক্ষুকরা সহায়তায় পাওয়া রিকশা বা অন্যান্য সম্পদ বিক্রি করে দিয়ে পুনরায় ভিক্ষাবৃত্তিতে ফিরে যান।
তিনি আরও বলেন, উপজেলা পর্যায়ে সাধারণত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের মাধ্যমে ভিক্ষুক নির্বাচন করা হয়। এরপর ন্যূনতম ২০ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকার মধ্যে মালামাল কিনে দেওয়া হয়। কোনো অবস্থাতেই নগদ টাকা দেওয়া হয় না। বরাদ্দের টাকা উপজেলা পর্যায়ে একটি অ্যাকাউন্টে জমা থাকে, উপজেলা কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তা খরচ করা হয় বলে হাবিবুর রহমান জানান।
সমাজসেবা অধিদপ্তরের সিলেট বিভাগীয় কার্যালয়ের উপপরিচালক সুচিত্রা রায় জানান, সিলেট বিভাগে ২০১৫ সাল থেকে এখন পর্যন্ত ৮৯৬ জনকে পুনর্বাসিত করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ভিক্ষুকদের কোনো সরকারি সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান নেই। অনেকে ‘ভবিষ্যতে আর ভিক্ষা করা যাবে না’ এই শর্তে সরকারি সহায়তা বা টাকা নিতে চান না। তবে যাদেরকে পুনর্বাসিত করা হয়েছে, তারা যেন পুনরায় এই ভিক্ষাবৃত্তিতে ফিরে না আসেন, সেজন্য তাদের সর্বোচ্চ সহযোগিতা করা হয় বলে তিনি দাবি করেন।


