তিন বছর আগে ঢাকার গুলিস্তানের সিদ্দিকবাজার এলাকার ‘ক্যাফে কুইন’ ভবনে বিস্ফোরণে ২৬ জন নিহতের ঘটনায় সরকার ঘোষিত সহায়তা এখনও পায়নি ভুক্তভোগী পরিবারগুলো। এর মধ্যে অর্থাভাবে বেশ কয়েকটি পরিবারের কাটাচ্ছেন কষ্টের জীবন।
এই সময়ের মধ্যে দেশে তিনটি সরকার এসেছে এবং সহায়তা দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া শ্রম মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানাতেই পারছেন না কিছু।
২০২৩ সালের ৭ মার্চের সেই বিস্ফোরণের পর প্রত্যেক নিহতের পরিবারকে দুই লাখ টাকা করে সহায়তা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিল শ্রম মন্ত্রণালয়।
ক্ষতিগ্রস্ত ২৬টি পরিবারের মধ্যে ১১টি পরিবারের সঙ্গে কথা হয় টাইমস অব বাংলাদেশের। কোনো পরিবারই শ্রম মন্ত্রণালয় থেকে কোনো অর্থ পাননি বলে জানিয়েছেন। কেউ কেউ বলছেন, সহায়তা দেওয়ার নামে পরবর্তীতে দীর্ঘদিন হয়রানি করা হয়েছে।
জানতে চাইলে মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. বোরহান উদ্দীন বলেন, ‘এটা তো তিন বছর আগের ঘটনা। এক্ষেত্রেও নিশ্চয়ই সহায়তা দেওয়া হয়েছে।’
কীভাবে বুঝলেন সহায়তা দেওয়া হয়েছে? এমন প্রশ্নে বলেন, ‘গত বছর এরকম কয়েকটি ঘটনায় ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়েছে।’
কয়টি পরিবারকে কবে সেই ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়েছে তা জানতে চাইলে কয়েকদিন সময় চান তিনি। কিন্তু তারপরও সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য দিতে পারেননি।
জানতে চাইলে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সহকারী সচিব মোহাম্মদ শাহীনুর ইসলাম টাইমসকে বলেন, ‘বিষয়ে আমি কিছু বলতে পারব না।’
পরিদর্শন ও পরিসংখ্যান শাখায় কর্মরত এই কর্মকর্তার সংযুক্তি যে বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশনে, বিষয়টি উল্লেখ করার পর তিনি ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালকের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন।
মহাপরিচালক মো. মুনির হোসেন খান প্রথমে বলেন, ‘তিন বছর আগের ঘটনা। আমি একটু খোঁজ নিয়ে পরে জানাব।’
এরপর এক এক মাস পেরিয়ে পেরিয়ে গেলেও তিনি আর কিছু জানাননি। তবে ফোন দিলে একাধিকবার ফোন ধরেছেন এবং মিটিংয়ে আছেন, পরে কথা বলবেন বলে প্রতিবারই ফোন রেখেছেন।
সহায়তার আশ্বাসে ‘হয়রানি’
বিস্ফোরণে ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান পুরান ঢাকার নদী বেগম ও মমিনুল ইসলাম দম্পতি। এতিম হয়ে যায় তাদের দুই সন্তান। এখন ইসলামবাগ এলাকায় আশি ঊর্ধ্ব বয়সী প্রবীণ দাদা-দাদির কাছে বড় হচ্ছেন তারা। বাবা-মার অকাল মৃত্যুর পর তাৎক্ষণিকভাবে শিশুদের জন্য সহায়তার প্রয়োজন থাকলেও এখন আর কিছু আশা করছেন না এই ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্যরা।
নিহত মমিনুলের চাচাত ভাই মো. ইব্রাহিম টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘ঘটনার দুদিন পরই শ্রম মন্ত্রণালয় থেকে ফোন করে ডেকে কাগজপত্র জমা নিয়েছে। এরপরও অনেকবার খোঁজ নিয়েছি কিন্তু প্রতিবারই কৌশলে পাশ কাটিয়ে গেছেন কর্মকর্তারা। সহায়তার নামে এভাবে ডেকে নিয়ে অনেকদিন হয়রানি করা হয়েছে।’
আরও কয়েকটি পরিবার সেসময় শ্রম মন্ত্রণালয়ে কাগজ জমা দিয়ে টাকার জন্য ঘুরেছেন। তাদের সঙ্গে দীর্ঘদিন যোগাযোগ ছিল। তারাও কেউ কোনো টাকা পায়নি বলে জানান মমিনুল।
এখনও আশায় আছেন বিস্ফোরণে নিহত ওই মার্কেটের একটি স্যানিটারি দোকানের স্টাফ মুনসুরের পরিবার। নিহতের ভায়রা বাংলাদেশ পাইপ অ্যান্ড টিউবয়েল অ্যাসোসিয়েশনের পরিচালক মুরাদ হোসেন বলেন, ‘শ্রম মন্ত্রণালয়ের অফিসে অনেকবার গিয়েছি। কর্মকর্তারা যেসব কাগজপত্র চেয়েছিলেন, সেগুলোও জমা দিয়েছি। কিন্তু ঘুরতে ঘুরতে ক্লান্ত হয়ে এখন আর যাই না।’
মুনসুরের স্ত্রী ও একমাত্র সন্তানকে দেখভাল করছেন মুরাদই। চাচাদের আর্থিক সহায়তায় প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে পাস করে এবার ক্লাস সিক্সে উঠেছে সেই সন্তান।
মুরাদের ধারণা, শ্রম মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা শ্রমিকদের জন্য বরাদ্দের টাকা আত্মসাৎ ফেলেছেন। তাই তারা পরে টাকা দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর সঙ্গে লুকাছাপা করেছেন।
বিরক্ত কুদ্দুস, আর আশাও করেন না
ওই বিস্ফোরণে নিহত ব্যবসায়ী মো. ইসমাইলের ভাই আব্দুল কুদ্দুস বলেন, ‘আমার ভাই ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। তার আয়ের ওপরেই আমরা সবাই নির্ভরশীল ছিলাম। চারজন সন্তান রেখে সেই বিস্ফোরণে ভাইয়ের অকাল মৃত্যুর পর আমাদের পরিবারের ওপর অনেক ঝড়-ঝাপটা গেছে।’’
চারটি সন্তান নিয়ে নিহত ইসমাইলের স্ত্রীর সংগ্রামের জীবনের কথা উল্লেখ করে তিনি জানান, ‘তাৎক্ষণিকভাবে সহায়তা পেলে ভাবির উপকার হতো হয়ত। কিন্তু আমরা আর কারো কাছে কিছু আশা করি না। আমার ভাইয়ের ব্যবসা ছিল। তার পরিবার সেটা আঁকড়ে ধরে বাঁচার চেষ্টা করছে।’
‘আমরা মানসিকভাবে মৃত। যে ক্ষতি হয়েছে তা কোনোভাবেই পূরণ করা সম্ভব না’, বলেন তিনি।
সেই বিস্ফোরণে প্রাণ হারিয়েছেন আবু জাফর সিদ্দিক তারেক ও আওলাদ হোসেন মুসা নামের দুই খালাত ভাই। নির্মাণাধীন বাড়ির জন্য স্যানিটারি সামগ্রী কিনতে সেদিন মুন্সিগঞ্জের গজারিয়া উপজেলা থেকে গুলিস্তানে এসেছিলেন তারা। হাসপাতাল থেকে মরদেহ নিয়ে যাওয়ার সময় দুজনের দাফনের জন্য এক লাখ টাকা দিয়েছিল ডিসি অফিস থেকে।
‘এরপর কোনো মন্ত্রণালয় বা সরকারের পক্ষ থেকে কেউ আর কখনো মৃতদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করেনি’, বলেন নিহতদের আরেক খালাতো ভাই রাশেদুল হাসান।
তিনি বলেন, ‘আমার দুই খালু আরও আগেই মারা গেছেন। সন্তান হারানো দুই খালার দেখভাল করেন তাদের অন্য সন্তানরা। তাদের আর্থিক সমস্যা নাই। তাই আমরা আর টাকা-পয়সা চাই না। তবে যেহেতু প্রত্যেক নিহতের পরিবারকে দুই লাখ করে টাকা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিল মন্ত্রণালয়, তাহলে প্রশ্ন ওঠে- সেই টাকা আসলে গেলো কোথায়? বিষয়টি নিয়ে তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।’
‘যাদের আয়ের ওপর তাদের পরিবার নির্ভরশীল ছিল- এমনও অনেকে সেদিন মারা গেছেন। তাদের পরিবার টাকাটা পেলে উপকৃত হতো’, বলেন রাশেদ।
সহায়তা পাচ্ছেন বাবুলের পরিবার, কারা দিচ্ছেন জানেন না
ওই মার্কেটের একটি স্যানিটারি দোকানের কর্মচারী নিহত ওবায়দুল হাসান বাবুলের জামাতা জানান, তার শ্বশুর যে দোকানে কাজ করতেন সেই দোকান মালিকসহ কিছু কর্মচারী একই পীরের মুরিদ ছিলেন। সেই দোকান মালিক ও ‘পীর ভাই’ টাকা সংগ্রহ করে নিহতের স্ত্রীকে মানিকগঞ্জের নিজ গ্রামে একটি দুই কক্ষেক টিনশেড ঘর করে দিয়েছেন।
টাকা কোথায় থেকে এসেছে পরিবারের সদস্যরা তা বিস্তারিত জানে না। তবে পীর ভাই ও দোকান মালিকের মাধ্যমে এখনো টুকটাক সাহায্য পাচ্ছেন তার বিধবা শাশুড়ি।


