রাজধানীর ‘কিচেন গার্ডেন’ হিসেবে পরিচিত মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলায় গাজর চাষে এক নীরব বিপ্লব ঘটেছে। অল্প সময়ে অধিক লাভজনক হওয়ায় এই অঞ্চলের কৃষকদের মধ্যে গাজর চাষে আগ্রহ দিন দিন বাড়ছে। বর্তমানে সিংগাইর কেবল স্থানীয় চাহিদা মেটাচ্ছে না, বরং দেশের বিভিন্ন জেলা ও বড় শহরগুলোর সবজি বাজারের অন্যতম প্রধান সরবরাহকারী হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।
এলাকার কৃষি অর্থনীতির চিত্র বদলে যাওয়ায় অনেকেই এখন সিংগাইরকে ‘গাজরের গ্রাম’ নামে ডাকছেন। তবে বীজ বিপণনে সিন্ডিকেট, হিমাগার সংকট এবং বিদেশ থেকে গাজর আমদানির ফলে কৃষকরা মাঝে মাঝে কাঙ্ক্ষিত লাভের ক্ষেত্রে বাধার সম্মুখীন হচ্ছেন।
উপজেলা কৃষি অফিসের দেওয়া তথ্যমতে, চলতি মৌসুমে সিংগাইরের বিভিন্ন ইউনিয়নে মোট ৯০৫ হেক্টর জমিতে গাজর আবাদ হয়েছে। পাইকারি বাজারে প্রতি কেজি গাজরের গড় মূল্য ২০ টাকা হিসাব করলে এই উপজেলায় এ বছর প্রায় ৯০ কোটি টাকার গাজর বিক্রির সম্ভাবনা রয়েছে। তবে স্থানীয়দের ধারণা, বিক্রির পরিমাণ ১০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে।
এই বিপুল কর্মযজ্ঞে উপজেলার প্রায় ২ হাজার ৮০০ কৃষকের ভাগ্য বদলে যাচ্ছে। পাশাপাশি অসংখ্য ব্যবসায়ী ও শত শত শ্রমিকের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। শুধু গাজরই নয়, গাজরের পাতা ও নিম্নমানের গাজর গরু-ছাগলের খাদ্য হিসেবে ব্যবহার হওয়ায় গবাদি পশু পালনেও এটি ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে।
সিংগাইরের বেলে-দোঁআশ মাটি গাজর চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী হওয়ায় জয়মন্টপ, ধল্লা, সিংগাইর সদর, শায়েস্তা, জামির্ত্তা, তালেবপুর ও বায়রাসহ অধিকাংশ ইউনিয়নে ব্যাপক আবাদ হয়েছে। সাধারণত আশ্বিন-কার্তিক মাসে বীজ বপনের পর মাত্র ৯০ থেকে ১২০ দিনের মধ্যেই ফসল তোলা যায়।
স্থানীয় কৃষকরা জানান, প্রতি বিঘা জমিতে গাজর চাষে খরচ হয় ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা। ফলন ভালো হলে বিঘা প্রতি ১২০ থেকে ১৫০ মণ গাজর পাওয়া যায়। বর্তমানে প্রতি বিঘা জমির গাজর ৯০ হাজার থেকে এক লাখ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এতে সব খরচ বাদ দিয়ে বিঘা প্রতি ৪০ থেকে ৬০ হাজার টাকা লাভ থাকছে, যা অন্য যেকোনো শীতকালীন ফসলের চেয়ে বেশি।
সাফল্যের গল্প শুনিয়ে জয়মন্টপ ইউনিয়নের চরদুর্গাপুর এলাকার কৃষক মো. শামিম বলেন, তিনি এ বছর নিজের ও ভাড়া নেওয়া জমি মিলিয়ে মোট ১৫০ বিঘা জমিতে গাজর চাষ করেছেন। এতে তার খরচ হয়েছে প্রায় ৭৫ লাখ টাকা। বর্তমান বাজারদর বজায় থাকলে তিনি প্রায় ১ কোটি ৩৫ লাখ টাকার গাজর বিক্রি করতে পারবেন বলে আশা করছেন। গাজর চাষই তার জীবনের অবস্থার পরিবর্তন এনেছে বলে তিনি জানান।
একই এলাকার মো. মিজানুর রহমান জানান, তিনি ৩৫ বিঘা জমিতে গাজর চাষ করতে ২১ লাখ টাকা ব্যয় করেছেন। নিজস্ব উদ্যোগে শ্রমিক দিয়ে গাজর প্রক্রিয়াজাত করে তিনি ঢাকার বাজারে সরবরাহ করছেন। সবকিছু ঠিক থাকলে ৩২ লাখ টাকার মতো বিক্রির আশা করছেন তিনি।
তবে এই সফলতার মাঝে কিছু অভিযোগও রয়েছে। দেওলী গ্রামের গাজর চাষি মো. ইদ্রিস বেপারী জানান, তিনি ২৮ বিঘা জমিতে গাজর চাষ করে প্রায় ১৩ লাখ টাকা খরচ করে ২৬ থেকে ২৮ লাখ টাকার বিক্রির আশা করছেন। তবে বীজ বপনের সময় ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেটের কারণে তাকে চড়া দামে বীজ কিনতে হয়েছে। এর সঙ্গে সার ও কীটনাশকের উচ্চমূল্য লাভের পরিমাণ কিছুটা কমিয়ে দিচ্ছে বলে তিনি আক্ষেপ করেন।
অন্যদিকে, চরআজিমপুর এলাকার কৃষক বাবুল হোসেন জানান, ৯ বিঘা জমিতে গাজর চাষ করে তিনি খরচের তুলনায় ভালো দাম পাচ্ছেন।
আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার সিংগাইরের গাজর বাজারজাতকরণে নতুন গতি এনেছে। আগে পা দিয়ে ঘষে গাজর পরিষ্কার করা হলেও এখন এ কাজে মেশিন ব্যবহার করা হয়। এতে শ্রমিকের কষ্ট কমছে এবং কম সময়ে বেশি গাজর প্রস্তুত করা যাচ্ছে।
রাজশাহীর বাঘা থেকে আসা শ্রমিক সর্দার মো. ফারুক হোসেন ও তার সহযোগী মো. লুথু জানান, মেশিনের মাধ্যমে প্রতিদিন ১০-১২ জন শ্রমিক মিলে প্রায় ২৫০ বস্তা গাজর পরিষ্কার করে ট্রাকে লোড দিতে পারছেন। এতে তাদের প্রত্যেকের দৈনিক আয় ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা।
ভূমদক্ষিণ গ্রামের গাজর ব্যবসায়ী মো. আজমত আলী, আবেদ আলী ও মোহাম্মদ আলী জানান, তারা সরাসরি কৃষকের জমি থেকে গাজর কিনে ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় পাঠান। শুরুতে দাম ভালো থাকলে লাভ হয়, তবে বৃষ্টির মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি সবসময় থাকে।
দেওলী গ্রামের ব্যবসায়ী মো. মোতালেব জানান, তিনি এ বছর ১০০ বিঘা জমির গাজর কিনেছেন। বাজার স্বাভাবিক থাকলে ভালো লাভের আশা করছেন তিনি।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. হাবিবুল বাশার চৌধুরী বলেন, সিংগাইরের মাটি ও জলবায়ু গাজর চাষের জন্য অত্যন্ত অনুকূল। কৃষকরা এখন আধুনিক পদ্ধতি গ্রহণ করায় উৎপাদন ও গুণগত মান উভয়ই বেড়েছে।
তিনি মনে করেন, পরিকল্পিত বাজার ব্যবস্থাপনা ও হিমাগার বা সংরক্ষণ সুবিধা বাড়ানো গেলে এই অঞ্চলের গাজর দেশের সবজি অর্থনীতিতে আরও বড় ও সুদূরপ্রসারী ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে।


