এ বছর সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন কানাডার কবি, লেখক ও অনুবাদক অ্যান কারসন। নোবেল কমিটি জানিয়েছে, ধ্রুপদি সাহিত্য ঐতিহ্যের সঙ্গে সৃজনশীল সংলাপের মাধ্যমে সমকালীন সাহিত্যে নতুন রূপ তৈরির জন্য তাকে এই পুরস্কার দেওয়া হয়েছে। কমিটির ভাষায়, কারসনের সাহিত্যকর্ম সাহসী ও নতুন চিন্তায় ভরপুর।
অ্যান কারসনের জন্ম ১৯৫০ সালে কানাডার টরন্টোতে। তার সাহিত্যজীবনে কবিতা লেখার পাশাপাশি অনুবাদ ও শিক্ষকতার কাজও গুরুত্বপূর্ণ জায়গা দখল করে রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানোর পাশাপাশি তিনি প্রাচীন গ্রিক সাহিত্য নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন। ১৯৮১ সালে তিনি ক্লাসিকস বিষয়ে ডক্টরেটের গবেষণাপত্র ‘ওডি এট আমো এরগো সুম’ প্রকাশ করেন।
শব্দের উৎপত্তি বা ব্যুৎপত্তি তার লেখার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। প্রাচীন গ্রিক ভাষা থেকে তার করা অনুবাদগুলোও স্বতন্ত্র সাহিত্যকর্ম হিসেবে আন্তর্জাতিকভাবে গুরুত্ব পেয়েছে। প্রাচীন গ্রিক কবি স্যাফোর কবিতার খণ্ডাংশ নিয়ে কারসনের উল্লেখযোগ্য কাজ ‘ইফ নট, উইন্টার’ প্রকাশিত হয় ২০০২ সালে। এ ছাড়া সোফোক্লিসের ‘ইলেক্ট্রা’ ও ‘অ্যান্টিগনি’ এবং ইউরিপিদিসের ‘বাকখাই’ অনুবাদ করেছেন তিনি। তবে কারসনের কাজ শুধু অনুবাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রাচীন সাহিত্যকে আধুনিক অভিজ্ঞতা ও ভাষার সঙ্গে মিশিয়ে তিনি তৈরি করেছেন নতুন ধরনের সাহিত্যিক রূপ।
১৯৮৬ সালে প্রকাশিত ‘ইরোস দ্য বিটারসুইট’ বইটি কারসনের সাহিত্যভাবনার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। বইটিতে প্রেম, আকাঙ্ক্ষা ও দূরত্বের সম্পর্ক নিয়ে তিনি আলোচনা করেছেন। স্যাফোর একটি শব্দবন্ধকে কেন্দ্র করে কারসন দেখিয়েছেন, প্রেমের মধ্যে একই সঙ্গে আনন্দ ও বেদনা থাকতে পারে। পরবর্তী সময়ের সাহিত্যকর্মেও বিভিন্ন সময় ও সাহিত্যের ভিন্ন ভিন্ন কণ্ঠকে পাশাপাশি নিয়ে আসার প্রবণতা দেখা যায়।
১৯৯৮ সালে প্রকাশিত ‘অটোবায়োগ্রাফি অব রেড: অ্যা নভেল ইন ভার্স’ কারসনের অন্যতম পরিচিত কাজ। প্রাচীন গ্রিক কবি স্টেসিকোরাসের একটি পৌরাণিক চরিত্র জেরিয়নকে কেন্দ্র করে বইটি লেখা। গ্রিক পুরাণের ভয়ংকর লাল ডানাওয়ালা দৈত্যকে কারসন আধুনিক এক তরুণ চরিত্রে রূপ দিয়েছেন। ফলে প্রাচীন পুরাণের সঙ্গে আধুনিক প্রেম, পরিচয় ও মানবিক সম্পর্কের গল্প একসঙ্গে মিশে গেছে।
১৯৯৫ সালে প্রকাশিত ‘দ্য গ্লাস এসে’তে দুঃখ, বিচ্ছেদ ও একাকীত্বের গল্প উঠে এসেছে। এখানে কবিতা, গল্প ও প্রবন্ধের সীমারেখা অনেকটাই মুছে দিয়েছেন কারসন।
২০১০ সালে প্রকাশিত ‘নক্স’ বইটিও তার ব্যতিক্রমী কাজগুলোর একটি। মৃত ভাই মাইকেলের স্মৃতিকে কেন্দ্র করে বইটি তৈরি। ছবি, চিঠি ও বিভিন্ন লেখা একটি বাক্সের মধ্যে সাজিয়ে তিনি বইটিকে এক ধরনের শিল্পকর্মের রূপ দিয়েছেন। এর সঙ্গে যুক্ত করেছেন রোমান কবি ক্যাটুলাসের ভাইকে নিয়ে লেখা একটি কবিতা।
কারসনের কাজের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো, তিনি সাহিত্যের প্রচলিত সীমারেখায় আটকে থাকেননি। ২০১৬ সালের ‘ফ্লোট’ বইটি ২২টি ছোট বইয়ের সমন্বয়ে তৈরি। এগুলো বিভিন্ন বিষয়ে লেখা এবং ইচ্ছামতো ক্রমে পড়া যায়। ২০২৪ সালে প্রকাশিত ‘রং নর্মা’ বইয়েও বিভিন্ন ধরনের লেখা একসঙ্গে জায়গা পেয়েছে। এ ছাড়া চিত্রশিল্পী, কোরিওগ্রাফার, অপেরা ও থিয়েটার নির্মাতাদের সঙ্গেও কাজ করেছেন তিনি।
নোবেল কমিটির চেয়ারম্যান অ্যান্ডার্স ওলসন কারসনের সাহিত্যকর্মের মূল্যায়ন করে জানান, কারসনের লেখার মাধ্যমে কবিতা, প্রাচীন সাহিত্য, আধুনিক সাহিত্য ও বিভিন্ন শিল্পমাধ্যমের মধ্যে নতুন সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। এই স্বাধীন ও পরীক্ষামূলক লেখার ধরনই সমকালীন আন্তর্জাতিক সাহিত্যাঙ্গনে কারসনের কাজকে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।
BREAKING NEWS
The 2026 #NobelPrize in Literature is awarded to the Canadian author Anne Carson, “for her bold and inventive oeuvre that, in playful dialogue with the classical tradition, has created new forms for contemporary literature.” https://t.co/YRvlRghlGG— The Nobel Prize (@NobelPrize) October 8, 2026
গত বছর সাহিত্যে নোবেল পান হাঙ্গেরির লেখক লাসলো ক্রাসনাহোরকাই। অ্যাপোক্যালিপ্টিক আতঙ্কের মধ্যেও শিল্পের শক্তিকে পুনরায় প্রতিষ্ঠিত করে এমন এক গভীর ও দুরদৃষ্টিসম্পন্ন সাহিত্যকর্মের জন্য তাকে পুরস্কারটি দেওয়া হয়।
ক্রাসনাহোরকাইয়ের জার্মান ভাষার উপন্যাস ‘হার্শট ০৭৭৬৯’ সম্পর্কে নোবেল কর্তৃপক্ষ বলেছিল, এটি জার্মান সমাজের অস্থিরতাকে নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তুলেছে। এতে জার্মানির একটি ছোট্ট শহরে সামাজিক অস্থিরতা, হত্যা ও অগ্নিসংযোগের কারণে বিপর্যস্ত জীবনের গল্প তুলে ধরা হয়েছে।
শুক্রবার শান্তিতে পুরস্কার বিজয়ীর নাম ঘোষণা হবে। অর্থনীতিতে পুরস্কার ঘোষণা করা হবে মঙ্গলবার।
পুরস্কারের অংশ হিসেবে একটি করে ডিপ্লোমা, স্বর্ণপদক এবং প্রায় ১২ লাখ ডলারের চেক দেওয়া হয়। কোনো বিভাগে একাধিক বিজয়ী থাকলে পুরস্কারের অর্থ ভাগাভাগি করে নেন।
মানবতার জন্য বড় ধরনের অগ্রগতি বয়ে এনেছেন এমন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে ১৯০১ সাল থেকে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হচ্ছে। পুরস্কারের প্রতিষ্ঠাতা, উদ্ভাবক আলফ্রেড নোবেলের ইচ্ছার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এই পুরস্কার দেওয়া হয়।


