বৈষম্যমুক্ত বাংলাদেশের স্বপ্নপূরণে আদিবাসীদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। একই সঙ্গে সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে সমতল ও পার্বত্য অঞ্চলের আদিবাসীরা অনিয়ম-দুর্নীতির শিকার হচ্ছে বলে জানায় সংস্থাটি।
মঙ্গলবার টিআইবির ধানমন্ডির কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে উপস্থাপিত প্রতিবেদনে বলা হয় সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে আদিবাসীদের কাছ থেকে ঘুষ আদায়ে জড়িত রয়েছেন ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য, চেয়ারম্যান, গ্রাম পুলিশ, উপজেলা সমাজসসেবা অফিসের কর্মকর্তাসহ আরও অনেকে।
টিআইবির ‘সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্তি: সুশাসনের চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, বিভিন্ন ভাতাভিত্তিক ও পণ্যভিত্তিক কর্মসূচিতে আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে এককালীন সর্বনিম্ন ৫০০ থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা পর্যন্তু ঘুষ দিতে হয়।
এ ছাড়া সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে আদিবাসীদের বরাদ্দ হ্রাস, আইনি ও নীতিকাঠামোগত ঘাটতি, প্রত্যাশিত পর্যায়ে অন্তর্ভুক্ত না হওয়া, চাহিদা ও জনসংখ্যাভিত্তিক কর্মসূচি গ্রহণ না করা এবং উপকারভোগী তালিকা প্রণয়ণে স্বচ্ছতার ঘাটতি বিদ্যমান।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান, উপদেষ্টা, নির্বাহী-ব্যবস্থাপনা সুমাইয়া খায়ের ও মুহাম্মদ বদিউজ্জামান, পরিচালক, রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি। সংবাদ সম্মেলনটি পরিচালনা করেন মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম, পরিচালক, আউটরিচ অ্যান্ড কমিউনিকেশন। প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করেন রাজিয়া সুলতানা, রিসার্চ ফেলো, টিআইবি।
ইফতেখারুজ্জামান বলেন, শান্তি প্রতিষ্ঠার অন্যতম পূর্বশর্ত বৈষম্য দূর করা ও সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর ন্যায্য অধিকার প্রাপ্তি নিশ্চিত করা। প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, বিশেষ করে সমতল ও পার্বত্য অঞ্চলের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ন্যায্য অধিকার বিবেচনায় সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় তাদের ন্যায্য প্রাপ্তি নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি উল্লেখ করে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেন, ‘গবেষণার সাতটি নির্দেশকের প্রতিটিতেই সুশাসন ও স্বচ্ছতার ঘাটতি এবং দুর্নীতি ও অনিয়মের উদ্বেগজনক চিত্র প্রকাশিত হয়েছে।’
এ থেকে সুস্পষ্ট যে আদিবাসীদের ন্যায্য প্রাপ্য রাষ্ট্র নিশ্চিত করতে পারছে না। বৈষম্যহীন ও শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠার অন্যতম পূর্বশর্ত সমঅধিকার প্রতিষ্ঠা এবং সে লক্ষে সামাজিক সুরক্ষা ও নিরাপত্তার যে মূল ধারা তার মধ্যে আদিবাসীদের অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব হয়নি। আদিবাসীরা অনিয়ম-দুর্নীতির চক্রে আবর্তিত হচ্ছে, যোগ করেন তিনি।
ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘রাষ্ট্রকাঠামোর মধ্যে একধরনের সংখ্যাগরিষ্ঠতন্ত্র বিদ্যমান। যার ফলে আদিবাসীদের ন্যায্য পাওনা ও অধিকার উপলব্ধি বা স্বীকৃতি আমরা দেখতে পাচ্ছি না।’
গবেষেণায় ভাতাভিত্তিক কর্মসূচি ও পণ্যভিত্তিক কর্মসূচিতে যেসব অনিয়ম-দুর্নীতির চিত্র উঠে এসেছে তার মধ্যে বয়স্কভাতা (আজীবন) কর্মসূচিতে দেখা গেছে, বয়স্ক ভাতার (আজীবন) জন্য সমতলের আদিবাসীদের ৫০০ থেকে সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা এককালীন ঘুষ দিতে হয় এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীদের ২ হাজার ৫ শত থেকে ৬ হাজার টাকা।
একইভাবে, ভাতাভিত্তিক কর্মসূচি ভিডব্লিউবি-এর জন্য সমতলের আদিবাসীদের এককালীন ঘুষ দিতে হয় ২ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা এবং পার্বত্য আদিবাসীদের ২ হাজার থেকে ৬ হাজার টাকা।
গবেষণা প্রতিবেদন আরও বলা হয়, আর্থিক বরাদ্দের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, জিডিপিতে সামাজিক নিরাপত্তা বাজেটের হার ২০২০-২১ অর্থবছর থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত ক্রমান্বয়ে কমেছে। একইভাবে আইএলও কনভেনশনে ‘আদিবাসী’ পরিচয় ও প্রথাগত ভূমি অধিকারের স্বীকৃতি থাকলেও বাংলাদেশ অনুস্বাক্ষর করেনি।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, পাঁচটি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে আদিবাসীদের মধ্যে সুবিধা পাওয়ার যোগ্য জনসংখ্যার তুলনায় আবেদনকারী ও তাদের মধ্যে নির্বাচিতের গড় হার ১৯ দশমিক ৭ শতাংশ। গবেষণার আওতাভুক্ত ২২টি ইউনিয়ন পরিষদের ওয়েবসাইটে বেশিরভাগ কর্মসূচির সুবিধাভোগীর তালিকা ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির প্রয়োজনীয় তথ্য প্রকাশ করা হয়নি, থাকলেও তথ্য হালনাগাদ ছিল না।


