সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরোয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যার তদন্ত দীর্ঘ দিনেও শেষ না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন হাইকোর্ট। আদালত রাষ্ট্রপক্ষ ও উচ্চ পর্যায়ের টাস্কফোর্স কমিটিকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন, সাগর-রুনির হত্যার ১৩ বছর পার হয়ে গেছে। এখনো তদন্ত শেষ হয়নি। তদন্ত শেষ করতে আর কত বছর লাগবে?
আদালত বলেন, ‘দুইজন মানুষ মার্ডার হয়ে গেল। তাদের কারা হত্যা করল, কিছুই জানা গেল না। সারা দেশের মানুষ তাকিয়ে আছে এই মামলার দিকে।’
বৃহস্পতিবার বিচারপতি ফাতেমা নজীব ও বিচারপতি ফাতেমা আনোয়ারের হাইকোর্ট বেঞ্চ এসব কথা বলেন।
আদালত উচ্চ পর্যায়ের টাস্কফোর্স কমিটির পক্ষে উপস্থিত থাকা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) কর্মকর্তা আজিজুল হককে উদ্দেশ করে বলেন, ‘সাগর-রুনি হত্যা মামলার তদন্ত কত শতাংশ শেষ হয়েছে, আমাদের জানান। আমরা আর সময় দিতে পারব না। শেষবারের মতো ছয় মাস সময় দিচ্ছি।’
সাগর-রুনির পরিবারের পক্ষের আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির আদালতকে বলেন, ‘এই মামলার তদন্ত দীর্ঘদিনেও শেষ না হওয়ায় আমরা বাইরে মুখ দেখাতে পারছি না। সবাই জানতে চায় তদন্ত কবে শেষ হবে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় তদন্ত শেষ হওয়া উচিত। ফেব্রুয়ারি মাসে নির্বাচন। রাজনৈতিক সরকার এলে এই মামলার তদন্ত আরও পিছিয়ে যেতে পারে।’
এরপর আদালত তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করতে উচ্চ পর্যায়ের টাস্কফোর্স কমিটিকে ছয় মাসের সময় দিয়ে আদেশ দেন।
গত বছরের ২৩ অক্টোবর হাইকোর্টের নির্দেশে সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরোয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যার ঘটনায় করা মামলার তদন্তে পিবিআই প্রধানকে আহ্বায়ক করে চার সদস্যের উচ্চ পর্যায়ের টাস্কফোর্স কমিটি গঠন করা হয়। কমিটিতে অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক পদমর্যাদার নিচে নয় পুলিশের একজন প্রতিনিধি, অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) একজন প্রতিনিধি ও র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাবে) একজন প্রতিনিধিকে রাখা হয়েছে।
গত বছরের ১৭ অক্টোবর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগ থেকে টাস্কফোর্স গঠন করে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। পরবর্তীতে ৩০ সেপ্টেম্বর সাগর সরোয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যার ঘটনায় করা মামলার তদন্তে উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন টাস্কফোর্স গঠনের নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। তাদের হাইকোর্টে ছয় মাসের মধ্যে তদন্ত শেষ করতে বলা হয়।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে এ নির্দেশনা বাস্তবায়ন করতে বলা হয়। বিভিন্ন বাহিনীর অভিজ্ঞ তদন্ত কর্মকর্তাদের নিয়ে টাস্কফোর্স গঠন করতে বলা হয়।
এর আগে, গত বছরের ২৯ সেপ্টেম্বর মামলায় নতুন আইনজীবী নিয়োগ দেওয়া হয় মোহাম্মদ শিশির মনিরকে। পরদিন ৩০ সেপ্টেম্বর মামলার তদন্তের দায়িত্ব থেকে র্যাবকে বাদ দেওয়া হয়। একই সঙ্গে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন টাস্কফোর্স গঠন করে ছয় মাসের মধ্যে তদন্ত সম্পন্ন করার নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। এর তিন সপ্তাহ পর, ২৩ অক্টোবর সরকার এ টাস্কফোর্স গঠন করে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পরিপত্রে বলা হয়, ছয় মাসের মধ্যে টাস্কফোর্স হাইকোর্টে প্রতিবেদন জমা দেবে এবং প্রয়োজনে নতুন সদস্য অন্তর্ভুক্ত করতে পারবে।
পরে গত ২২ এপ্রিল হাইকোর্ট টাস্কফোর্সকে আরও ছয় মাস সময় দেয়। বর্তমানে টাস্কফোর্সের অধীনে পিবিআই মামলার তদন্ত করছে।
মামলার নথি অনুযায়ী, ২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারের ভাড়া করা বাসায় খুন হন সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার ও রুনি। সাগর তখন বেসরকারি টেলিভিশন মাছরাঙা টিভিতে এবং রুনি এটিএন বাংলায় কর্মরত ছিলেন।
২০১২ সালের সেই রাতে সাগর-রুনির একমাত্র সন্তান, তখন পাঁচ বছরের মাহির সরওয়ার মেঘ বাসায় ছিল। পুলিশ জানিয়েছিল, খুনি ছিল দুজন। ঘটনার পর তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে খুনিদের গ্রেপ্তারের নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু তারপর এক যুগেও হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটন হয়নি।


