ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হবে এবং বিএনপি এককভাবে সরকার গঠন করবে বলে দৃঢ় আশাবাদের কথা জানিয়েছেন দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। জার্মান সংবাদমাধ্যম ডয়চে ভেলেকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি এ আশাবাদ জানান।
সাক্ষাৎকারে তারেক রহমান আগামী নির্বাচন, নির্বাচন-পরবর্তী সম্ভাবনা এবং দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলেন। একটি ভারসাম্যপূর্ণ রাষ্ট্র ও সরকার গঠনের লক্ষ্যে বিএনপি জোট সরকার গঠন করবে কি না–এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘একটি ভারসাম্যপূর্ণ রাষ্ট্র ও ভারসাম্যপূর্ণ সরকারের জন্য কাউকে না কাউকে বিরোধী দলে থাকতে হবে। সবাই যদি সরকারে যোগ দেয়, তবে দেশ চলবে কীভাবে?’
সাক্ষাৎকারে জাতীয় নির্বাচন, নারীর ক্ষমতায়ন, প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক এবং গুম ও খুনের শিকার ব্যক্তিদের বিচার নিশ্চিত করাসহ বিভিন্ন প্রসঙ্গের অবতারণা করেন তারেক রহমান।
আওয়ামী লীগের রাজনীতি এবং দলটিকে নিষিদ্ধ করার বিষয়ে তার অবস্থানের প্রশ্নে বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, ‘আমরা জনগণের জন্য রাজনীতি করি, তাদের সমর্থন নিয়ে চলি। জনগণ যদি কাউকে গ্রহণ করে, তবে কেউ তাদের থামাতে পারবে না। আর যদি তারা প্রত্যাখ্যান করে, তবে কোনো শক্তিই তাদের টিকিয়ে রাখতে পারবে না, যার প্রমাণ আমরা ৫ আগস্ট দেখেছি।’
বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বিএনপির দৃষ্টিভঙ্গি আলোচনা করতে গিয়ে ভারতের প্রতি দলের অবস্থান সম্পর্কেও কথা বলেন তারেক রহমান। তিনি বলেন, ‘আমরা যদি দেখি কোনো চুক্তি বাংলাদেশের স্বার্থের পরিপন্থী হচ্ছে, তবে স্বাভাবিকভাবেই একটি দূরত্ব তৈরি হবে, তা সে যে দেশের সঙ্গেই হোক না কেন। আমি আমার দেশের মানুষের প্রতিনিধিত্ব করি।’
দীর্ঘ ১৭ বছরের প্রবাস জীবন কাটিয়ে দেশে ফেরার অনুভূতি ব্যক্ত করতে গিয়ে তিনি ব্যক্তিগত আবেগ ও চ্যালেঞ্জের কথা শেয়ার করেন। বিশেষ করে দেশে ফেরার মাত্র পাঁচ দিনের মাথায় মাকে হারানোর বিষয়টি তাকে গভীরভাবে ব্যথিত করেছে।
তিনি বলেন, ‘এত বছর পর মানুষের চোখে আমি অনেক প্রত্যাশা দেখেছি। কিন্তু ফেরার মাত্র পাঁচ দিন পর আমার মা মারা গেলেন। স্বাভাবিকভাবেই সেটি ছিল অত্যন্ত বেদনাদায়ক। নির্বাচনের কোলাহল আর ব্যক্তিগত শোকের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখাটাই ছিল আমার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।’
তরুণ প্রজন্মের কাছে দলের আবেদন প্রসঙ্গে তারেক রহমান সমাজের সব স্তরের মানুষের প্রয়োজন মেটাতে বিএনপির অঙ্গীকারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি উল্লেখ করেন, ‘আমাদের ইশতেহারে তরুণ, প্রবীণ, দেশের ৪০ লাখ প্রতিবন্ধী এবং দেশের মোট জনসংখ্যার অর্ধেক যে নারী গোষ্ঠী–সবার জন্যই সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও কর্মসূচি রয়েছে। এই পরিকল্পনা শুধু তরুণদের জন্য নয়, বরং সবার জন্য। কারণ, সবার অংশগ্রহণেই দেশ গড়তে হবে।’
সাক্ষাৎকারে বিএনপি চেয়ারম্যান নারীর ক্ষমতায়নে তার দলের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার নেওয়া দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত মেয়েদের অবৈতনিক শিক্ষা কার্যক্রমের কথা স্মরণ করিয়ে দেন।
তারেক রহমান বলেন, ‘সেটি ছিল নারীর ক্ষমতায়নের প্রথম ধাপ। আমরা যদি সরকার গঠন করি, তবে এই সুযোগ শিক্ষার উচ্চতর পর্যায় পর্যন্ত বিস্তৃত করব।’
বিএনপি চেয়ারম্যান প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর গৃহিণীদের স্বাবলম্বী করার লক্ষ্যে ‘ফ্যামিলি কার্ডে’র মাধ্যমে সহায়তা করার পরিকল্পনার কথা জানান। নারী উন্নয়নের লক্ষ্যে বিভিন্ন প্রকল্প এবং নারী সমাজকে ক্ষমতায়িত করতে আরও পদক্ষেপ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি।
বিএনপি প্রার্থীদের ঋণখেলাপি হওয়া এবং দুর্নীতির বিষয়ে দলের অবস্থান সংক্রান্ত প্রশ্নের জবাবে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, ‘দুর্নীতি এবং ব্যাংক ঋণখেলাপি হওয়া দুটি আলাদা বিষয়। আমাদের নেতা ও ব্যবসায়ীরা হয়রানির শিকার হয়েছেন, অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছেন এবং বৈধ ঋণ পাওয়া থেকেও তাদের দূরে রাখা হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে ঋণখেলাপি হওয়াটা ছিল স্বাভাবিক। এর সঙ্গে দুর্নীতির কোনো সম্পর্ক নেই।’
গত ১৫-১৬ বছরে ঘটে যাওয়া গুম ও খুনের বিচার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমাদের কর্মী, অন্যান্য গণতান্ত্রিক দল, এমনকি অরাজনৈতিক ব্যক্তিরাও এর শিকার হয়েছেন। একটি সভ্য দেশে মানুষ এভাবে নিখোঁজ হতে পারে না বা বিচারহীনভাবে জীবন দিতে পারে না। আইন অনুযায়ী প্রতিটি নাগরিকের ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার রয়েছে।’


