অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে গণভোট, সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ, জাতীয় মানবাধিকার ও পুলিশ কমিশন এবং গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকারসংক্রান্ত বিধানসহ অন্তত ২০টি অধ্যাদেশ বাতিল বা সংশোধন নিয়ে সরকারের সঙ্গে বিরোধীদলের তীব্র টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে। সরকার ও বিরোধী পক্ষের বিপরীতমুখী অবস্থানে রাজনৈতিক বিতর্কের পাশাপাশি কাঙ্ক্ষিত সংবিধান সংস্কার প্রক্রিয়ার ভবিষ্যৎ নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
সরকারি দল মনে করছে, কিছু অধ্যাদেশ সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বা অন্তর্বর্তী সরকারের এখতিয়ারবহির্ভূত ছিল। বিশেষ করে গণভোটের বিধান সংবিধানে স্পষ্টভাবে উল্লেখ না থাকায় এটি আইনি প্রশ্নের মুখে পড়েছে। তাই সবকিছু সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যেই আনতে চায় সরকার।
বিরোধী দলের অভিযোগ, এসব অধ্যাদেশ বাতিলের উদ্যোগ আসলে ক্ষমতা পুনরায় কেন্দ্রীভূত করার কৌশল, যা জুলাই সনদের চেতনার পরিপন্থি। গণভোটের মাধ্যমে জনগণের দেওয়া রায় উপেক্ষা করা হলে তা হবে গণআকাঙ্ক্ষার পরিপন্থি।
বিশ্লেষকদের মতে, এসব অধ্যাদেশ ছিল অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার এজেন্ডার মূল ভিত্তি। ফলে, এগুলো বাতিল হলে সংস্কার প্রক্রিয়ায় ধাক্কা খাওয়ার পাশাপাশি জাতীয় ঐক্যমত্য কমিশন গঠন করে রাজনৈতিক দলগুলোর মতামতের ভিত্তিতে ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ বাস্তবায়নে গণভোটের পারপাসে হওয়া রাষ্ট্রীয় অর্থ খরচের বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে।
গত বুধবার জাতীয় সংসদের বিশেষ কমিটির বৈঠকের পর বিষয়টি এখন জোরালো আলোচনায়। ওই বৈঠকের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ১১৩টি পাস করাতে সরকারি ও বিরোধী দল একমত। আর ২০টিতে তীব্র বিরোধ দেখা দিয়েছে।
ওই বৈঠক শেষে জামায়াতের সংসদ সদস্য রফিকুল ইসলাম খান বলেছিলেন, ‘আইন মন্ত্রণালয় থেকে গণভোট অধ্যাদেশ বাতিলের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, এতে বিরোধী দল আপত্তি জানিয়েছে। এছাড়াও দুর্নীতি দমন কমিশন, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, পুলিশ কমিশন ও গুম প্রতিরোধ অধ্যাদেশে সংশোধনের প্রস্তাব উঠলেও এ বিষয়ে এখনো বিস্তারিত আলোচনা হয়নি।’
অন্যদিকে কমিটির সভাপতি ও সরকারি দলের সংসদ সদস্য জয়নুল আবেদীন বলেন, ‘গণভোট বাতিল বা রাখার বিষয়ে আমরা এখনো কোনো পক্ষে-বিপক্ষে অবস্থান নিইনি।’ আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামানও বলেন, ‘বিষয়টি এখনো আলোচনার টেবিলে আছে, কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।’
রোববার সংসদের বিশেষ কমিটির তৃতীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। সংবিধানের ৯৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী এসব অধ্যাদেশ প্রথম অধিবেশন শুরুর ৩০ কার্য়দিবসের মধ্যে, পাস না হলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে।
এদিকে শনিবার বেলা ১১টায় সংসদ কমিটির সভা ও বিকালে বিএনপির সংসদীয় দলের সভা অনুষ্ঠিত হবে বলে জানিয়েছে সংসদ সচিবালয়। জানা গেছে, এসব অধ্যাদেশ নিয়ে দলের অবস্থান নিয়ে সংসদীয় দলের সভায় আলাপ-আলোচনা হতে পারে।
কেন জারি হয়েছিল ১৩৩ অধ্যাদেশ?
মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে সংস্কারের লক্ষ্যে ১৩৩টি অধ্যাদেশ জারি করে। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অচলাবস্থা, নির্বাচনব্যবস্থার ওপর আস্থার সংকট, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে বিতর্ক এবং গুম-নির্যাতনসহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ—এসব বাস্তবতা এই পদক্ষেপের পেছনে প্রধান ভূমিকা রাখে।
রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে ধারাবাহিক সংলাপের ভিত্তিতে প্রণীত ‘জুলাই জাতীয় সনদ’-এ সংবিধান ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো পুনর্গঠনের রূপরেখা নির্ধারণ করা হয়। সেই রুপরেখা বাস্তবায়নে কার্যকর উপায় হিসেবেই অধ্যাদেশগুলো জারি করা হয়, যা মূলত একটি পরিবর্তিত রাষ্ট্রব্যবস্থার সূচনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছিল।
গণভোট অধ্যাদেশ: বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ‘গণভোট অধ্যাদেশ-২০২৫’ পুরো সংস্কার প্রক্রিয়ার কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করছে। এই অধ্যাদেশের মাধ্যমেই ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ বাস্তবায়ন আদেশ জনগণের সরাসরি ভোটে অনুমোদন পায়।
গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত গণভোটে ৬৮ শতাংশের বেশি ভোটে ‘হ্যাঁ’ বিজয়ী হওয়ায় সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের পথ উন্মুক্ত হয়। প্রোপোরশনাল রিপ্রেজেন্টেশন (পিআর) পদ্ধতিতে উচ্চকক্ষ গঠনের প্রস্তাবও সামনে আসে এর মাধ্যমে।
জামায়াতের এমপি ও সংসদের বিশেষ কমিটির সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেছেন, ‘বিএনপির আচরণে মনে হচ্ছে তারা গণভোট বাতিল করতে চায়। গণভোট বৈধ কি না সেই আলোচনা তুলে সংশোধনের নামে সংসদে উত্থাপন মানেই সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে বাতিল করা, যা জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে অস্বীকার করার শামিল। আমরা সরকারের এ সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ সংসদ ও রাজপথ উভয় জায়গায় অব্যাহত রাখব।’
বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশে ক্ষমতার ভারসাম্যের প্রশ্ন
সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশে নির্বাহী বিভাগের একক প্রভাব কমিয়ে একটি স্বচ্ছ ও প্রাতিষ্ঠানিক নিয়োগব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়। সার্চ কমিটির মাধ্যমে বিচারক নিয়োগের প্রস্তাব ছিল, যা বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছিল।
এই অধ্যাদেশ সংশোধন বা বাতিল হলে পুনরায় নির্বাহী কর্তৃত্ব বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে, যা ‘চেক অ্যান্ড ব্যালান্স’ ব্যবস্থাকে দুর্বল করে দিতে পারে বলে বিরোধী দল বলছে।
সুপ্রীম কোর্টের আইনজীবী শিশির মনির টাইমসকে বলেছেন, ‘বিএনপি ফের ফ্যাসিবাদী কায়দায় বিচারক নিয়োগ থেকে শুরু করে সর্বত্র রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের উদ্দেশ্যেই এসব সংস্কার চায় না।’
মানবাধিকার ও গুম প্রতিরোধ অধ্যাদেশ: জবাবদিহির কাঠামো
গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের দীর্ঘদিনের অভিযোগের প্রেক্ষাপটে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে শক্তিশালী করা এবং গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকারের জন্য কার্যকর আইনি কাঠামো গড়ে তোলার লক্ষ্যেই এসব অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছে বলে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল।
এসব উদ্যোগকে অনেকেই ‘ট্রানজিশনাল জাস্টিস’ বা পরিবর্তিত ন্যায়বিচারের অংশ হিসেবে দেখছিলেন। ফলে এগুলো বাতিল হলে অতীতের মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিচার প্রক্রিয়াই অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে পারে বলে কয়েকজন আইনজীবী জানিয়েছেন।
বাতিল হলে কী প্রভাব পড়তে পারে
বিশ্লেষকদের মতে, আলোচিত এসব অধ্যাদেশ বাতিল বা এতে মৌলিক পরিবর্তন আনা হলে কয়েকটি বড় ধরনের প্রভাব দেখা দিতে পারে। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে, অন্তর্বর্তী সরকারের নেওয়া পুরো সংস্কার প্রক্রিয়ার বৈধতার সংকট তৈরি করতে পারে। গণভোটের ভিত্তি দুর্বল হলে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের কার্যকারিতা ও গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে। বিচারক নিয়োগে নির্বাহী প্রভাব বাড়লে বিচার বিভাগের নিরপেক্ষতা নিয়ে নতুন করে আশঙ্কা হতে পারে বলে বিরোধীদলের নেতারা মনে করছেন।
গুম ও মানবাধিকার সংশ্লিষ্ট অধ্যাদেশ দুর্বল হলে জবাবদিহি কমে যেতে পারে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে। দুদক, নির্বাচন কমিশন, পিএসসিসহ কিছু প্রতিষ্ঠানের সংস্কার থমকে যেতে পারে বা রাজনৈতিক প্রভাবের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
এ প্রসঙ্গে আইনজীবী শিশির মনির বলেন, ‘গণভোটসহ গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশসমূহ বাতিল বা নিজেদের মতো সংশোধন করে বিএনপি পুরনো ধারায় ফিরতে চায়। গণভোটের গণরায়কে অবজ্ঞার হীন উদ্দেশ্যে ভালো হবে না।’
তিনি বলেন, ‘অধ্যাদেশ বাতিল করবেন, সংস্কার মানবেন না তাহলে এখন প্রশ্ন উঠবে কেন? আপনারা ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায় গিয়েছিলেন বা সনদে সই করেছিলেন। এ ছাড়া গণভোটে সরকারের যে খরচ সেটি নিয়েও মানুষ প্রশ্ন শুরু করবে।’
রাজনৈতিক ঐকমত্যে ভাঙন
‘জুলাই জাতীয় সনদ’ভিত্তিক ঐকমত্য ভেঙে গেলে রাজনৈতিক বিভেদ আরও তীব্র হতে পারে। সরকারি দল তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতার বলে নিজের মতো করে সংস্কার করতে চাইলে শেষ পর্যন্ত ইস্যুটি মোকাবিলায় বিরোধী দল রাজনীতির মাঠে নিয়ে যেতে পারে। ইতোমধ্যে জামায়াত জোট এ ব্যাপারে কর্মসূচির কথা ভাবছে। শুরুর দিকে যেটি সংস্কারে জনমত গঠনে সভা-সেমিনার করলেও পরবর্তীতে মাঠের কর্মসূচির দিকে যেতে পারে।
অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা অধ্যাদেশগুলো ছিল একটি বৃহৎ সংস্কারে রোডম্যাপ, যা রাষ্ট্রের ক্ষমতার ভারসাম্য পুনর্গঠন এবং জবাবদিহিতামূলক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছিল। এগুলো বাতিল হলে বরং পুরো সংস্কার কাঠামোর ভিত্তিই প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা বলছেন।


