সত্যেন সেন: সংগ্রাম, সংস্কৃতি ও সাম্যের এক অনমনীয় নাম

সত্যেন সেন: সংগ্রাম, সংস্কৃতি ও সাম্যের এক অনমনীয় নাম
সত্যেন সেন। ছবি: সংগৃহীত
Advertisement
Advertisement

বাঙালি সংস্কৃতির ইতিহাসে কিছু মানুষ আছেন, যাদের জীবন কেবল ব্যক্তিগত পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। তারা হয়ে ওঠেন সময়ের ভাষ্যকার, সংগ্রামের দিশারি, একটি আদর্শের জীবন্ত প্রতীক। সত্যেন সেন তেমনই একজন। তিনি ছিলেন বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর প্রতিষ্ঠাতা। সোমবার (৫ জানুয়ারি) তার ৪৪তম মৃত্যুবার্ষিকী।

১৯০৭ সালের ২৮ মার্চ মুন্সীগঞ্জের টঙ্গিবাড়ী উপজেলার সোনারং গ্রামে জন্ম সত্যেন সেনের। জমিদার পরিবারে জন্ম হলেও তার মন পড়ে থাকত মাঠে-ঘাটে, খেটে খাওয়া মানুষের জীবনে। ছোটবেলার ডাকনাম ছিল লস্কর। কৈশোরেই তিনি ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে যুক্ত হন এবং যোগ দেন যুগান্তর দলে। এর ফলস্বরূপ ১৯৩১, ১৯৩২ ও ১৯৩৩—এই তিন বছরে একাধিকবার তাকে কারাবরণ করতে হয়। জেলখানার অন্ধকার কক্ষেই গড়ে ওঠে তার রাজনৈতিক দর্শন; সেখানেই মার্কসবাদ-লেনিনবাদের সঙ্গে ঘটে গভীর পরিচয়। শোষণহীন, সাম্যবাদী সমাজ গড়ার স্বপ্ন হয়ে ওঠে তার জীবনের মূলমন্ত্র।

ব্রিটিশ শাসনের অবসানের পরও তার সংগ্রাম থেমে থাকেনি। পাকিস্তানি শাসনামলেও তিনি ছিলেন অবিচল। কৃষক আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক হিসেবে তিনি মাঠে কাজ করেছেন, ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষে মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধেও তার ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ—প্রত্যক্ষ অস্ত্রধারণে নয়, বরং মানুষের চেতনায় মুক্তির আগুন জ্বালিয়ে।

১৯৬৮ সালের ২৯ অক্টোবর রণেশ দাশগুপ্ত, শহীদুল্লাহ কায়সারসহ একঝাঁক তরুণকে সঙ্গে নিয়ে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী। ‘উদীচী’—অর্থাৎ উত্তর আকাশের তারা, ভোরের আলোর অগ্রদূত। এই নামের মধ্যেই নিহিত ছিল তার দর্শন। উদীচী কেবল একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন নয়; এটি হয়ে ওঠে গণমানুষের সাংস্কৃতিক মঞ্চ, শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ভাষা। গান, নাটক, কবিতা ও আবৃত্তির মাধ্যমে তিনি গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে মানুষের অধিকারবোধ জাগিয়ে তুলেছেন।

আরও পড়ুন

সাহিত্যিক হিসেবেও সত্যেন সেন ছিলেন দৃঢ় ও স্পষ্ট উচ্চারণের মানুষ। তার উপন্যাস ও গবেষণামূলক লেখায় উঠে এসেছে ইতিহাস, শ্রেণিসংগ্রাম ও প্রান্তিক মানুষের জীবন। ‘অভিশপ্ত নগরী’, ‘পাপের সন্তান’, ‘সেয়ানা’, ‘পদচিহ্ন’—এসব উপন্যাসে সমাজের গভীর দ্বন্দ্ব ও মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে। ‘গ্রাম বাংলার পথে পথে’, ‘মহাবিদ্রোহের কাহিনি’সহ তার ইতিহাসচর্চা বাংলার গণআন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ দলিল। সাহিত্যকর্মের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি ১৯৬৯ সালে আদমজী সাহিত্য পুরস্কার, ১৯৭০ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার এবং ১৯৮৬ সালে মরণোত্তর একুশে পদকে ভূষিত হন।

লোকসংস্কৃতি ছিল তার আরেকটি বড় প্রেম। তিনি বিশ্বাস করতেন, এ দেশের মানুষের প্রাণের সুর লুকিয়ে আছে বাউল ও লোকগানে। সেই সুর তিনি তুলে এনেছিলেন শহরের মঞ্চে, আবার রাজপথের মিছিলে। “চাষি দে তোর লাল সেলাম”—এর মতো গণসংগীত আজও আন্দোলনের মুখে মুখে ফেরে।

১৯৮১ সালের ৫ জানুয়ারি শান্তিনিকেতনের গুরুপল্লীতে সত্যেন সেনের জীবনাবসান ঘটে। মানুষটি চলে গেলেও তার আদর্শ রয়ে গেছে। আজ যখন সমাজে সাম্প্রদায়িকতা, অসহিষ্ণুতা ও বৈষম্যের ছায়া ঘনিয়ে আসে, তখন সত্যেন সেনের উচ্চারণ আরও প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad