রাজধানীর গণপরিবহনে নিয়মিত অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের শিকার হচ্ছেন যাত্রীরা। কোথাও কোথাও আদায় করা হচ্ছে সরকারি নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ টাকা। দুর্বল তদারকি এবং বিতর্কিত টিকিট পদ্ধতির কারণে ঢাকার পরিবহন খাতে বর্তমানে চরম নৈরাজ্য বিরাজ করছে।
পল্লবীর বাসিন্দা সজিব শেখ প্রতিদিন মিরপুর থেকে ফার্মগেটে যাতায়াত করেন। সরকারি হিসেবে ৯ কিলোমিটারের এই যাত্রায় ভাড়া হওয়ার কথা ২১ টাকা ৬০ পয়সা। অথচ রাজধানী ও আলিফ পরিবহনের বাসে তাকে প্রতিদিন ৩০ টাকা দিতে হয়।
দীর্ঘদিন ধরে এই বর্ধিত ভাড়া দিতে দিতে সজিব এখন বিশ্বাস করেন, এটিই হয়তো সরকার নির্ধারিত ভাড়া।
সজিবের মতো ঢাকার অসংখ্য যাত্রী এখন বাধ্য হয়েই বেশি ভাড়া দিচ্ছেন। জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে ভাড়া নিয়ে ব্যাপক আলোচনা এবং কর্তৃপক্ষের হুঁশিয়ারি দেখা যায়। তবে যাত্রীদের মতে, কিছুদিন যেতেই পরিস্থিতি আবার আগের মতোই নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ে।
জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি ও ভাড়া বিতর্ক
ইরান যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়ায় সম্প্রতি সরকার ডিজেল, পেট্রোল ও অকটেনের দাম বাড়িয়েছে। ডিজেলের দাম প্রতি লিটারে ১৫ টাকা বাড়ার পরপরই বাস মালিকরা ভাড়ার হার দ্বিগুণের বেশি করার প্রস্তাব দেন। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, বর্তমান ডিজেলের দাম ২০২২ সালের আগস্টের হারের কাছাকাছি। সেই সময় প্রতি কিলোমিটারে ভাড়া নির্ধারিত হয়েছিল আড়াই টাকা।
পরবর্তীতে ডিজেলের দাম কয়েকবার কমানো হলেও যাত্রীরা তার সুফল পাননি। কাগজে-কলমে ভাড়া কমানোর ঘোষণা এলেও বাস্তবে তা কার্যকর হয়নি। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী জানান, বর্তমান জ্বালানি মূল্যে ভাড়া ২০২২ সালের স্তরে থাকা উচিত। তিনি অভিযোগ করেন, ভাড়া কমানোর সিদ্ধান্ত কেবল কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকে।
মোজাম্মেল হক চৌধুরী টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘ডিজেলের দাম ১৫ টাকা বাড়লে নীতি অনুযায়ী কিলোমিটারে মাত্র ১৫ পয়সা ভাড়া বাড়ার কথা। কিন্তু মালিকরা এর চেয়ে অনেক বেশি ভাড়া আদায় করছেন যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।’
প্রতিটি রুটেই অতিরিক্ত ভাড়া আদায়
সাংবাদিক অনির্বাণ বিশ্বাস শ্যামলীর শিশু মেলা থেকে বিশ্বরোড পর্যন্ত ১২ কিলোমিটার পথ যাতায়াতে ৪০ টাকা ভাড়া দেন। অথচ সরকারি হিসেবে এই ভাড়া হওয়ার কথা ২৯ টাকা। বাসের হেল্পাররা জানান, মালিকরা ওয়েবিল সিস্টেমের মাধ্যমে এই ভাড়া নির্ধারণ করে দিয়েছেন।
ওয়েবিল পদ্ধতি বর্তমানে ভাড়া নৈরাজ্যের প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই পদ্ধতিতে নির্দিষ্ট চেকপোস্টের আগে নামলেও যাত্রীদের পরবর্তী গন্তব্য পর্যন্ত পুরো ভাড়া দিতে হয়। মালিক সমিতি এটি বাতিলের ঘোষণা দিলেও বাস্তবে ওয়েবিল প্রথা এখনো চালু রয়েছে।
মগবাজার থেকে আসাদ গেট পর্যন্ত ৫ কিলোমিটারের ভাড়া হওয়ার কথা ১৩ টাকা। কিন্তু লাব্বায়িক ও লাভলী পরিবহনের মতো বাসগুলো ২০ টাকা আদায় করছে। একইভাবে মোহাম্মদপুর থেকে মিরপুর পর্যন্ত ৩০ টাকার ভাড়া ৪০ টাকা এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কারওয়ান বাজার পর্যন্ত ৪৬ টাকার ভাড়া ৬০ টাকা করে নেওয়া হচ্ছে।
ই-টিকিটিং ও স্বচ্ছতার অভাব
নিয়ম অনুযায়ী প্রতিটি বাসে ভাড়ার তালিকা দৃশ্যমান স্থানে থাকার কথা থাকলেও তা কোথাও দেখা যায় না। ফলে যাত্রীরা সঠিক ভাড়া যাচাই করার সুযোগ পান না। এই দুর্নীতি বন্ধ করতে ২০২২ সালে ই-টিকিটিং ব্যবস্থা চালু করা হয়েছিল। শুরুতে এটি জনপ্রিয় হলেও বাস মালিকরা লাভের অংক কমে যাওয়ার অজুহাতে এই ব্যবস্থা বন্ধ করে দেন।
ঢাকা মহানগর পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের অতিরিক্ত কমিশনার আনিসুর রহমান জানান, বড় ধরনের পরিকল্পনা ও আর্থিক ব্যবস্থাপনার কারণে ই-টিকিটিং বর্তমানে স্থগিত রয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী স্পর্শা খান বলেন, ‘ই-টিকিটিং চালু থাকলে হেলপারদের সঙ্গে তর্কাতর্কি ও হয়রানি বন্ধ হতো।’
দূরপাল্লার বাসেও অনিয়ম
ভাড়ার এই অসংগতি কেবল ঢাকার ভেতরেই নয় বরং দূরপাল্লার রুটেও দেখা যাচ্ছে। বিআরটিএ ৫২ সিটের বাসের ভিত্তিতে ভাড়া নির্ধারণ করে। বাসের আসন কমানো হলে ভাড়া কিছুটা বাড়ানোর অনুমতি থাকলেও জামালপুর-ঢাকা রুটে দেখা গেছে, ৪২ সিট ও ৫৫ সিটের সব বাসই একই ভাড়া আদায় করছে।
জামালপুর থেকে ঢাকার দূরত্ব ১৭৩ কিলোমিটার। সরকারি হিসেবে আসন কমানোর পরও এই ভাড়া ৪১৪ টাকা হওয়ার কথা। কিন্তু যাত্রীদের কাছ থেকে আদায় করা হয় ৪৫০ টাকা। অনেক ক্ষেত্রে নতুন বাইপাস হওয়ার ফলে দূরত্ব কমলেও পুরোনো দীর্ঘ পথের হিসেবেই ভাড়া নেওয়া হচ্ছে।
নীতিমালার ফাঁক
ভাড়া নির্ধারণের ক্ষেত্রে কিছু ভ্রান্ত ধারণা কাজ করে বলে মনে করে ভোক্তা অধিকার সংগঠন ক্যাব। সংগঠনটির সহসভাপতি এস এম নাজির হোসেন বলেন, ভাড়া নির্ধারণের সময় ২০ শতাংশ আসন খালি থাকবে বলে ধরে নেওয়া হয়। কিন্তু বাস্তবে কোনো বাসই খালি থাকে না। বরং ধারণক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি যাত্রী পরিবহন করা হয়।
নাজির হোসেন অভিযোগ করেন, ভাড়া নির্ধারণের বৈঠকে যাত্রী প্রতিনিধিদের কোনো গুরুত্ব দেওয়া হয় না। মালিকদের স্বার্থ রক্ষার্থেই অধিকাংশ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বৈঠকে কোনো বিরোধিতা করলে যাত্রী প্রতিনিধিদের হেনস্তা হতে হয় বলেও জানান তিনি।
পরিবহন বিশেষজ্ঞ এম শামসুল হক মনে করেন, কেবল বাস মালিকদের সাথে আলোচনা করে ভাড়া ঠিক করা উচিত নয়। এতে নগর পরিকল্পনাবিদ ও সাধারণ যাত্রীদের অংশগ্রহণ থাকা জরুরি। তিনি সতর্ক করে বলেন, কর্তৃপক্ষের যথাযথ হস্তক্ষেপ না থাকায় এই শোষণ এখন প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিচ্ছে যা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে।
ভাড়া নৈরাজ্যের বিষয়ে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব সাইফুল আলম এবং বিআরটিএ চেয়ারম্যান মীর আহমেদ তারিকুল ওমরের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তারা কেউই ফোন বা ক্ষুদেবার্তার কোনো উত্তর দেননি।


