কারাগারে থাকা সাবেক মেজর মো. সাদিকুল হক সাদিক কীভাবে ভাটারায় প্রাইভেটকার পোড়ানোর ঘটনায় জড়িত- এ বিষয়ে আদালতে লিখিত ব্যাখ্যা দিয়েছে ভাটারা থানা পুলিশ। তাদের দাবি, কারাগারে যাওয়ার আগেই বিভিন্ন গোপন সভা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের সংগঠিত ও প্রশিক্ষিত করেছিলেন সাদিক। পরবর্তী সময়ে তার নির্দেশনা, অর্থায়ন ও মদদেই গাড়িতে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটানো হয়।
রোববার ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ এহসানুল ইসলামের আদালতে লিখিত ব্যাখ্যা জমা দেন ভাটারা থানার ওসি মাজহারুল ইসলাম ও মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই মো. চাঁদ আলী।
ভাটারা থানার বসুন্ধরা এলাকায় প্রাইভেটকার পোড়ানোর ঘটনায় করা সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় সাদিককে সন্দেহভাজন আসামি হিসেবে গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন করা হয়েছে।
প্রসিকিউশনের পুলিশ কর্মকর্তা এসআই কামাল হোসেন জানান, বিচারক পুলিশের দেওয়া লিখিত বক্তব্য পর্যালোচনা করে এ বিষয়ে আদেশ দেবেন।
পুলিশের লিখিত ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, তদন্তে উঠে এসেছে- সেনাবাহিনীতে চাকরিরত অবস্থায় ২০২৫ সালের ৩ থেকে ৮ জুলাই বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার কাছে কেবি কনভেনশন হলের দ্বিতীয় তলার একটি হলরুমে গোপন সভার আয়োজন করেন সাদিক। সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত চলা এসব কার্যক্রমে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা অংশ নেন বলে দাবি পুলিশের।
পুলিশের ভাষায়, এসব সভায় আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের কর্মকাণ্ডকে গতিশীল করা, নেতাকর্মীদের উৎসাহিত করা এবং দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির লক্ষ্যে আলোচনা ও প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো।
লিখিত ব্যাখ্যায় আরও বলা হয়, সাদিক নিজেকে প্রধান প্রশিক্ষক ও ‘কানেক্টর’ হিসেবে রেখে রূপগঞ্জের পূর্বাচল সি-সেল রিসোর্ট, কাঁটাবনের একটি রেস্টুরেন্ট, মিরপুর ডিওএইচএস, উত্তরা ১২ নম্বর সেক্টর এবং আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের বিপরীতে প্রিয়াংকা সিটিতে তার স্ত্রী সুমাইয়া তাহমিদ যাফরিনের ফ্ল্যাটে একাধিকবার গোপন প্রশিক্ষণ ও কর্মশালার আয়োজন করেন।
পুলিশের দাবি, এসব সভা ও প্রশিক্ষণে অংশ নেওয়া আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের অনেক নেতাকর্মী পরবর্তী সময়ে গ্রেপ্তার হয়েছেন। আবার অনেকে গ্রেপ্তার হননি। এসব সভা থেকে পলাতক নেতাকর্মীরা শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরানোর লক্ষ্যে দেশকে অস্থিতিশীল করার পরিকল্পনা ও প্রশিক্ষণ নেন বলে তদন্তে তথ্য পাওয়া গেছে।
ভাটারা থানা পুলিশ আরও দাবি করেছে, সাদিকের পূর্বের নির্দেশনা, অর্থায়ন ও মদদের অংশ হিসেবে পরবর্তী সময়ে মামলার ঘটনার তারিখ ও সময়ে বাদীর গাড়িতে আগুন দেওয়া হয়। তদন্তে সাদিকের প্রকাশ্য ও গোপন সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
গত ৭ আগস্ট মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই চাঁদ আলী সাদিককে ২০২৫ সালের ১১ নভেম্বর বসুন্ধরা এলাকায় প্রাইভেটকার পোড়ানোর মামলায় সন্দিগ্ধ আসামি হিসেবে গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন করেন। আবেদনে বলা হয়, ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচির অংশ হিসেবে এবং দেশকে অস্থিতিশীল করতে গাড়িতে আগুন দেওয়া হয়। তদন্তে সাদিকের ঘটনায় প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে বলে দাবি করা হয়।
এরপর শুনানির জন্য গত সোমবার সাদিককে আদালতে হাজির করা হয়। ওইদিন তার আইনজীবী এইচ এম আল-আমিন প্রশ্ন তোলেন, ‘ঘটনার সময় সাদিক কারাগারে ছিলেন; তাহলে কারাগারে থেকে কীভাবে তিনি গাড়ি পোড়ানোর ঘটনায় জড়িত হলেন?’
আইনজীবীর বক্তব্যের পর আদালত ভাটারা থানার ওসি ও তদন্ত কর্মকর্তাকে লিখিত ব্যাখ্যা দেওয়ার নির্দেশ দেয়। সেই নির্দেশ অনুযায়ী রোববার আদালতে হাজির হয়ে লিখিত ব্যাখ্যা দেন তদন্ত কর্মকর্তা।
মামলার এজাহার অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১১ নভেম্বর রাতে ভাটারা থানার বিটুমিন গেটের সামনে প্রাইভেটকার রেখে বাসায় যান মনির হোসেন নামে এক ব্যক্তি। পরে গাড়িতে আগুন লাগার খবর পেয়ে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস ঘটনাস্থলে গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।
পরদিন সংবাদপত্র ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে মনির হোসেন জানতে পারেন, আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনগুলো ১৩ নভেম্বর ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচির ঘোষণা দিয়েছিল। পরে গাড়িতে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনে ভাটারা থানায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা করেন তিনি। মামলায় কারও নাম উল্লেখ না করে ২০ থেকে ২৫ জনকে আসামি করা হয়।
এর আগে সেনাবাহিনী থেকে চাকরিচ্যুত মেজর সাদিককে ২০২৪ সালের ২৯ অক্টোবর সামরিক আদালত তিন মাসের কারাদণ্ড দেয়। এরপর তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। পরে ভাটারা থানার সন্ত্রাসবিরোধী আইনের আরেকটি মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। সেই থেকে তিনি কারাগারে রয়েছেন।


