ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের মতোই এক ব্যক্তির একক সিদ্ধান্ত গ্রহণের বৃত্তে আটকে যাচ্ছে বিএনপি। দেশের সবচেয়ে বড় এ দলটির সকল সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা দলের চেয়ারম্যানকে অর্পণ করছেন সিনিয়র নেতারা। এই ক্ষমতাবলেই সংসদ নির্বাচনে মনোনয়নদান থেকে শুরু করে মন্ত্রিসভা গঠন, সিটি কর্পোরেশন ও জেলা পরিষদের প্রশাসক নিয়োগ সম্পর্কে এককভাবে সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
বিএনপির একাধিক সিনিয়র নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে টাইমস অব বাংলাদেশ’কে জানান, দলের সর্বোচ্চ নীতি-নির্ধারনী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটি। দলের চেয়ারম্যান এই স্থায়ী কমিটির সদস্যদের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক-অনানুষ্ঠানিক বৈঠক করলেও বেশিরভাগ সময় নিজের সিদ্ধান্তের কথা প্রকাশ করেন না। স্থায়ী কমিটির সকল সদস্যই এসব বৈঠকে কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য চেয়ারম্যানকেই দায়িত্ব দেন।
বিএনপর গঠনতন্ত্র অনুসারে স্থায়ী কমিটি সংসদ নির্বাচনে দলের মনোনয়ন চূড়ান্ত করার জন্য সংসদীয় বোর্ডের দায়িত্ব পালন করে। প্রচলিত রীতি অনুযায়ী দলের পক্ষ থেকে প্রথমে মনোনয়ন ফরম বিক্রি বা বিতরণ করা হয়। এরপর মনোনয়ন প্রত্যাশীদের সাক্ষাৎকার নেয় সংসদীয় বোর্ড। সেখানে বোর্ডের সদস্যরা কোনো মনোনয়ন প্রত্যাশী সম্পর্কে তাদের মতামত জানানোর সুযোগ পান। অবশ্য শেষ পর্যন্ত মনোনয়নের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেন দলের প্রধান।
বিএনপির একজন সিনিয়র নেতা জানান, দলের ইতিহাসে এবারই প্রথম সংসদ নির্বাচনের আগে দলীয় প্রার্থী বাছাইয়ের জন্য এই প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি। এবার সংসদীয় বোর্ড হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী স্থায়ী কমিটির সদস্যরা অনেকটা আগেই প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষমতা দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানকে অর্পণ করে রেখেছিলেন। একারণে গত সংসদ নির্বাচনের আগে মনোনয়ন প্রত্যাশীদের কাছে ফরমও বিক্রি করা হয়নি, কোনো আবেদনও আহবান করা হয়নি। সংসদীয় বোর্ড মনোনয়ন প্রত্যাশীদের সাক্ষাৎকারও নেয়নি।
এর বদলে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান কয়েকজন ব্যক্তি ও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সারা দেশে গোপন জরিপ চালিয়ে দলের সম্ভাব্য প্রার্থী চূড়ান্ত করেন। তিনি চূড়ান্ত করা প্রার্থীর সঙ্গে ফোনে বা হোয়াটসঅ্যাপে কথা বলে তার সিদ্ধান্ত জানিয়ে নির্বাচনের প্রস্তুতিও নিতে বলেন।
পরবর্তীতে দলের কয়েকজন সিনিয়র নেতাকে প্রতিটি এলাকায় নির্বাচন করতে ইচ্ছুক প্রার্থীদের নিয়ে বৈঠক করার দায়িত্ব দেওয়া হয়। তবে এসব বৈঠকে সিনিয়র নেতারা মূলত যিনি মনোনয়ন পাবেন তাদের পক্ষে কাজ করার জন্য অন্যদেরকে নির্দেশনা দেন। এছাড়াও দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান নিজে বিভাগ-ভিত্তিক মনোনয়ন প্রত্যাশীদের সঙ্গে ভার্চুয়াল সভা করে একই রকম নির্দেশনা দেন।
বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে নির্বাচনে জয়ী হয়ে মন্ত্রিসভা গঠন নিয়েও দলের মধ্যে কোনো আলোচনা হয়নি বলে জানিয়েছেন একাধিক সিনিয়র নেতা। তবে তারা জানান, বিষয়টি তারা দলের চেয়ারম্যানের ওপরই ছেড়ে দিয়েছিলেন।
মন্ত্রিসভা গঠনের পর সংসদের স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন নিয়েও স্থায়ী কমিটিতে কোনো আলোচনা হয়নি। তবে সংসদ অধিবেশন শুরুর আগের দিন সংসদীয় দলের সভায় সংসদ পরিচালনা নিয়ে কয়েকজন সিনিয়র সদস্যদের মতামত নেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
একইভাবে সিটি কর্পোরেশন ও জেলা পরিষদের প্রশাসক নিয়োগের বেলাতেও দলের চেয়ারম্যান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এককভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে জানান কয়েকজন নেতা। এক্ষেত্রেও স্থায়ী কমিটিতে কোনো আলোচনা হয়নি। অবশ্য এসব নিয়োগে চেয়ারম্যানের ঘনিষ্ঠ কয়েকজনের মতামত নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
যেকোনো সিদ্ধান্ত নিতে দলের চেয়ারম্যানের একক ক্ষমতা সম্পর্কে বিএনপির একাধিক নেতা জানান, আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেওয়ার বেলায় অতীতে কোনো কোনো নেতার বিরুদ্ধে মনোনয়ন বাণিজ্যের অভিযাগ ওঠেছিল। এবার তেমন অভিযোগ এড়াতেই দলীয় প্রধানকে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া হয়।
এদিকে সরকার গঠনের পর সরকার ও দলের কার্যক্রমের মধ্যে পার্থক্য রাখার ওপর জোর দিচ্ছেন কয়েকজন সিনিয়র নেতা। তাদের মতে, সরকার ও দল একাকার হয়ে গেলে ভবিষ্যতে দল সাংগঠনিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। এ কারণে মন্ত্রিসভায় ঠাঁই পাওয়া নেতাদের জায়গায় অন্য নেতাদের দায়িত্ব দিয়ে দলীয় কার্যক্রম সচল রাখা দরকার। তবে এখন পর্যন্ত এনিয়ে দলের স্থায়ী কমিটিতে কোনো আলোচনা হয়নি।
বিএনপির কয়েকজন সিনিয়র নেতা জানান, ১৯৯১ ও ২০০১ সালে বিএনপি সরকার গঠনের পর সরকার ও দলের বিভিন্ন বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণে সিনিয়র নেতাদের মতামত নিতেন বেগম খালেদা জিয়া। এমনকি সিনিয়র নেতাদের কথায় কখনো কখনো তিনি সিদ্ধান্তও বদল করেছেন।
বিএনপির এক নেতা মনে করেন, একক ব্যক্তির সিদ্ধান্তে দল চলতে থাকলে দলের চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়তে পারে। কারণ, এ ধরনের পরিস্থিতিতে অপেক্ষাকৃত জুনিয়র নেতারা সিনিয়র নেতাদের তোয়াক্কা করতে চান না। জুনিয়র নেতারা নানা ভাবে দলীয় প্রধানের দৃষ্টি আকর্ষনের দিকেই বেশি মনোযোগী হয়ে ওঠেন। আর এমন পরিস্থিতির সুযোগ নেন দলীয় প্রধানের ঘনিষ্ঠজনরা। এতে দলীয় ও সরকার প্রধান নির্দিষ্ট কিছু মানুষের বৃত্তবন্দি হয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয় বলে জানান বিএনপির এই নেতা।
অতীতে মন্ত্রিসভায় ছিলেন এমন কয়েকজন সিনিয়র নেতা জানান, সরকারের চেয়ে দলের গুরুত্ব কমে গেলে রাজনীতিবিদদের চেয়ে সামরিক-বেসামরিক আমলারা বেশি ক্ষমতাশালী হয়ে ওঠার সুযোগ পান। এতে সরকারের সঙ্গে জনগণের দূরত্বও বেড়ে যায়।
ছাত্র-জনতার আন্দোলনে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের বেলাতেও একই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল বলে মনে করেন বিএনপির একাধিক নেতা। তারা বলেন, সুদূর অতীতে আওয়ামী লীগ দলের সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিলেও পরে সেই ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। আওয়ামী লীগ নেতারাও তাদের সকল সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা দলীয় প্রধান শেখ হাসিনার ওপর ছেড়ে দিয়েছিলেন। আর এভাবেই প্রথমে দল ও পরে জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল শেখ হাসিনার সরকার।


