মিরপুর মডেল থানার হত্যা মামলার শুনানিতে ডিজিএফআইয়ের সাবেক মহাপরিচালক (ডিজি) লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) শেখ মামুন খালেদ আদালতকে বলেন, ‘এক এগারোর সময়ে তারেক রহমানকে জামিনের জন্য বেশিরভাগ মামলায় আমি ফোন করে সুপারিশ করেছি।’ নিজেকে নির্দোষ দাবি করে তিনি বলেন, ‘দোষী হলে আগেই দেশ ছেড়ে পালাতাম।’
বৃহস্পতিবার ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. ছিদ্দিক আজাদের আদালতে তার বিরুদ্ধে মামলার শুনাতিতে তিনি এসব কথা বলেন। পরে আদালত রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামি পক্ষের আইনজীবীর শুনানি শেষে তাকে পাঁচ দিনের রিমান্ড দেন।
রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ওমর ফারুক ফারুকী। এ সময় তিনি সাত দিনের রিমান্ডের আবেদন করেন। রিমান্ড আবেদন বিরোধিতা করে আসামি পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী মোর্শেদ হোসেন শাহিন।
এর আগে দুপুর ২টা ৬ মিনিটে ডিবির একটি সাদা গাড়িতে আদালতে হাজির করা হয় শেখ মামুন খালেদকে। তাকে গারদে রাখা হয়। পরে বুলেটপ্রুভ জ্যাকেট, হেলমেট ও হাত কড়া পরিয়ে কঠোর নিরাপত্তায় তাকে বিকাল ৩টা ৮ মিনিটে এজলাসে হাজির করা হয়। এ সময় পুলিশ তার হাতকড়া ও হেলমেট খুলে দেন। ৩টা ১৩ মিনিটে বিচারক এজলাসে আসেন।
শুনানিতে পিপি ওমর ফারুক ফারুকী আদালতকে বলেন, ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন দমন করার জন্য এই আসামির নির্দেশে হত্যাকাণ্ড চালানো হয়। শুধু তাই নয়, এই আসামি এক এগারোর সময় রাজনৈতিক নেতাদের বন্দী করাসহ বিপুল পরিমাণ টাকা হাতিয়ে নেন ব্যবসায়ীদের থেকে। এরপর শেখ হাসিনাকে ক্ষমতায় আনার জন্য সব অপকর্ম করতে থাকেন। এবং ফলস্বরুপ তাকে শেখ হাসিনা উচ্চপদে আসীন করেন। ডিজিএফআইয়ের প্রধান থাকা অবস্থায় আয়নাঘর সৃষ্টি করেন এই আসামি।’
পিপি আসামির যথাযথ শাস্তির আবেদন জানান। আবেদনের পর ৩টা ১৮ মিনিটে কাঠগড়ার রেলিং ধরে মুখে হাত দিতে চিন্তিত অবস্থায় দেখা যায় মামুন খালেদকে। এর আগে তিনি মনোযোগ দিয়ে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীর শুনানি শুনতে থাকেন। পিপির শুনানির সময়ে কিছু বক্তব্যের সময় বিরোধিতা করে তিনি মাথা নাড়াতে থাকেন। পিপির বক্তব্যে শেষ হলে আরেক আইনজীবী বলেন, ‘শেখ হাসিনাকে স্বৈরাচার করে তোলার পেছনে এই ধরনের কর্মকর্তা ব্যাপক ভূমিকা পালন করেছে।’
এ সময় আসামি পক্ষের আইনজীবী শাহিনুর রহমান আদালতকে বলেন, ‘অভিযুক্ত ডিজিএফআইয়ের কর্মকর্তা সম্পূর্ণ নির্দোষ। তার বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগগুলোর কোনো প্রমাণ নেই, কোনো ভিত্তি নেই। রাজনৈতিকভাবে ফাসানোর জন্য তার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ দেওয়া হচ্ছে। তাকে আয়নাঘরের হোতা বলা হচ্ছে অথচ এই আয়নাঘরের জন্মের অনেক আগে তিনি চাকরি ছাড়েন। তিনি অনেক আগেই অবসরে গেছেন।’
এ সময় আদালতের অনুমতি নিয়ে কথা বলেন ডিজিএফআইয়ের সাবেক মহাপরিচালক শেখ মামুন খালেদ। আদালতকে তিনি বলেন, ‘এক এগারো যখন ঘটে আমি তখন কুমিল্লাতে। এক এগারো যখন ঘটে তখন আমি খুবই জুনিয়র। সেই সময়ে তারেক রহমানকে জামিনের জন্য বেশিরভাগ মামলায় আমি ফোন দিয়ে সুপারিশ করেছি। আয়নাঘরের সঙ্গে আমার কোনো সম্পৃক্ততা নেই। শেখ হাসিনার সময়ে সাতজন ডিজিএফআই প্রধান ছিলেন। তাদের ছয়জনই বিদেশে। একমাত্র আমি দেশে। কারণ আমার কোনো সম্পৃক্ততা নেই। আমি নির্দোষ। আমি দোষী হলে তাদের মতো দেশ ছেড়ে আগেই পালাতাম।’
আদালতকে তিনি আরও বলেন, ‘আন্দোলনের সময় আমি বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস (বিইউপির) ভিসি ছিলাম। এই ইউনিভার্সিটিতে আমার হাত ধরে অনেক বিষয় (সাবজেক্ট) খোলা হয়েছে। আমি একজন শিক্ষানুরাগী মানুষ। আমার কোনো নির্দেশ বা হত্যার অর্ডার দেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। আমি আমার ছাত্রদের পক্ষে ছিলাম সব সময়। মিরপুর ১০ এর রোডে আমার কখনো যাওয়াই পড়ে না। যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। আমি নির্দোষ এবং আমাকে রিমান্ডে নেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। জলসিঁড়িতে আমাদের ডেকেছিল। কিন্তু সেখানে আমার কোনো সম্পৃক্ততা নেই।’
এই বক্তব্যের বিরোধিতা করে পিপি ওমর ফারুক ফারুকী বলেন, ‘আসামি আগে আর্মিতে ছিলেন, পরে তাকে শেখ হাসিনা ডিজিএফআইয়ের প্রধান বানিয়েছেন। ফ্যাসিস্টের আমলে তাদেরই প্রমোশন দেওয়া হয়েছে, যারা শেখ হাসিনাকে সহযোগিতা করেছেন। তার নির্দেশে ও পরামর্শে হত্যাকাণ্ড চালানো হয়েছে। উভয় পক্ষের শুনানি শেষে আদালত ৩.৩৮ মিনিটে পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে এজলাস ত্যাগ করেন।
এর আগে সাত দিনের রিমান্ড চেয়ে আবেদন করেন এই মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও ডিবি পুলিশের উপপরিদর্শক কফিল উদ্দিন। রিমান্ড আবেদনে বলা হয়, ২৪ এর ১৯ জুলাই বিকালে মিরপুর-১০ নম্বর ফলপট্টি এলাকায় ছাত্র-জনতার শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের সময় ৫/৭ শত আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী দেশীয় ও আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে হামলা চালায়। অভিযোগ রয়েছে, গ্রেপ্তার আসামি শেখ মামুন খালেদের নির্দেশেই আন্দোলনকারীদের ওপর নির্বিচারে এলোপাতাড়ি গুলি চালানো হয়। সে সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত হন দেলোয়ার হোসেন। চিকিৎসাধীন অবস্থায় শ্যামলীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে তিনি মারা যান।
রিমান্ড আবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, এই হত্যাকাণ্ডের পেছনের মূল রহস্য উদঘাটন, এজাহারনামীয় অন্য আসামিদের গ্রেপ্তার, অজ্ঞাতনামাদের সঠিক নাম-ঠিকানা সংগ্রহ এবং ব্যবহৃত অস্ত্র উদ্ধারের জন্য আসামিকে নিবিড়ভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা একান্ত প্রয়োজন।
বুধবার দিবাগত রাত সাড়ে ১২টার দিকে রাজধানীর ডিওএইচএস এলাকার একটি ফ্ল্যাট থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে ডিবি পুলিশ।


