মহাকাশে নক্ষত্রগুলোর মধ্যবর্তী বিস্তীর্ণ গ্যাস ও ধুলোর অঞ্চলে নতুন এক ধরনের চিনির সন্ধান পেয়েছেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা। গবেষকদের মতে, এই আবিষ্কার পৃথিবীতে প্রাণের উৎপত্তি কীভাবে হয়েছিল, সে বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ নতুন তথ্য দিতে পারে।
জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা যে চিনির সন্ধান পেয়েছেন, তার নাম এরিথ্রুলোজ । এটি রাস্পবেরি ফল এবং ত্বকে কৃত্রিম ট্যান তৈরির কিছু প্রসাধনীতেও ব্যবহৃত হয়।
এই চিনি পাওয়া গেছে ইন্টারস্টেলার মিডিয়াম নামে পরিচিত অঞ্চলে। এটি নক্ষত্রগুলোর মধ্যবর্তী বিস্তীর্ণ এলাকা, যেখানে পাতলা গ্যাস ও ধুলোর মেঘ ছড়িয়ে রয়েছে।
চিনি শুধু খাবারে মিষ্টি স্বাদই যোগ করে না। বিভিন্ন ধরনের চিনি আমাদের দেহের কোষে শক্তির জোগান দেয় এবং ডিএনএর গঠনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই চিনি কীভাবে তৈরি হয়, তা জানতে বিজ্ঞানীদের আগ্রহ অনেক, কারণ প্রাণের অস্তিত্বের জন্য এটি একটি মৌলিক উপাদান।
স্পেনে অবস্থিত দুটি ডিশ-আকৃতির রেডিও টেলিস্কোপ ব্যবহার করে গবেষকরা মিল্কিওয়ের কেন্দ্রের কাছে অবস্থিত একটি বিশাল গ্যাসমেঘ থেকে তথ্য সংগ্রহ করেন। পরে পরীক্ষাগারে প্রস্তুত করা নমুনার সঙ্গে টেলিস্কোপে পাওয়া রেডিও সংকেতের তুলনা করে গ্যাসীয় অবস্থায় থাকা এরিথ্রুলোজ শনাক্ত করা হয়।
এটি মহাকাশে শনাক্ত হওয়া সর্বশেষ ধরনের চিনি। যে অঞ্চলটিতে এর সন্ধান মিলেছে, সেটি দিয়েই একসময় নাসার যমজ ভয়েজার মহাকাশযান অতিক্রম করেছিল। পৃথিবী থেকে সবচেয়ে দূরে যাওয়া মহাকাশযান হিসেবে ভয়েজারেরই রেকর্ড রয়েছে।
সোমবার বিজ্ঞানবিষয়ক সাময়িকী নেচার এস্ট্রোনমিতে এই গবেষণার ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে।
এর আগেও আমাদের ছায়াপথ মিল্কিওয়েতে প্রাণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন রাসায়নিক যৌগের সন্ধান মিলেছে। প্রায় ২৫ বছর আগে মিল্কিওয়ের কেন্দ্রের কাছে সাধারণ খাবার চিনির একটি কাছাকাছি ধরনের যৌগ শনাক্ত করা হয়। এছাড়া নাসার ওসিরিস-রেক্স মহাকাশযানের মাধ্যমে গ্রহাণু বেন্নু থেকে আনা নমুনায় ডিএনএর একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদানসহ বিভিন্ন ধরনের চিনি পাওয়া গেছে।
সর্বশেষ শনাক্ত হওয়া এই চিনি সরাসরি জীবনের জন্য অপরিহার্য নয়। তবে এটি সহজেই এমন একটি রূপে পরিবর্তিত হতে পারে, যা পৃথিবীতে প্রাণের সূচনা ঘটাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল বলে বিজ্ঞানীরা মনে করেন। গবেষকদের ভাষ্য, এ পর্যন্ত মহাকাশে শনাক্ত হওয়া সবচেয়ে জটিল চিনিগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম।
গবেষণায় অংশ না নেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যোতির্পদার্থবিদ এরিকা হ্যামডেন বলেন, ‘এটি গ্যালাক্সিজুড়ে ভেসে বেড়ানো পদার্থের একটি একেবারে বিশুদ্ধ উদাহরণ।’
বিজ্ঞানীদের এসব গবেষণার মূল লক্ষ্য হলো পৃথিবীতে প্রাণের সূচনা কীভাবে হয়েছিল তা বোঝা। প্রাণের জন্য প্রয়োজনীয় মৌলিক উপাদান কি দূরবর্তী ধূমকেতু বা মহাকাশীয় শিলাখণ্ডের মাধ্যমে পৃথিবীতে এসেছিল, নাকি এসব উপাদান আগে থেকেই সেই গ্যাস ও ধুলোর মেঘে ছিল, যেখান থেকে পরে আমাদের সৌরজগতের জন্ম হয়েছে?
নতুন এই চিনির সন্ধান দ্বিতীয় ধারণাটিকেই আরও জোরালো করেছে। গবেষকরা এখন মহাকাশে আরও বিভিন্ন ধরনের চিনি খুঁজে বের করতে এবং সেগুলো কীভাবে এক রূপ থেকে অন্য রূপে পরিবর্তিত হয়, তা জানতে চান।
গবেষণার প্রধান লেখক ও স্পেনের সেন্টার ফর অ্যাস্ট্রোবায়োলজি–এর জ্যোতির্পদার্থবিদ ইজাসকুন জিমেনেজ-সেরা বলেন, একটি অঞ্চলে এই চিনি পাওয়া যাওয়ার অর্থ হলো, গ্যালাক্সির আরও বহু দূরবর্তী এলাকায়ও এটি এবং জীবনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অন্য রাসায়নিক উপাদান লুকিয়ে থাকতে পারে।
তিনি বলেন, ‘প্রাণের উৎপত্তির জন্য প্রয়োজনীয় মূল উপাদানগুলো গ্যালাক্সির অন্য অঞ্চলগুলোতেও থাকতে পারে। ফলে মহাবিশ্বের অন্য কোথাও প্রাণের বিকাশের সম্ভাবনাও উন্মুক্ত থাকে।’
সূত্র: এপি


