‘শোলে’ শব্দটি উচ্চারণ করলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে ধূলিঝড়ে মোড়া রামগড় গ্রামের দৃশ্য, দুই বন্ধু জয় ও বীরুর বন্ধুত্ব, ঠান্ডা মাথার খলনায়ক গব্বর সিং-এর নির্মমতা, আর ঠোঁটে লেগে থাকা কালজয়ী সংলাপ।
ভারতীয় সিনেমায় আগে নায়ক বলতে ছিলো নিতান্তই ভদ্রলোক—যে কিনা কোনো মারামারি করে না, কারো সঙ্গে ঝগড়ায় জড়ায় না। কিন্তু ‘শোলে’ এ ধারণা পাল্টে দেয়। শুধু নায়ক নয়, নায়িকা কিংবা ভিলেন—এসবের সংজ্ঞাও নতুন করে তৈরি করে ছবিটি। বলিউডের ইতিহাসে সর্বাধিক ব্যবসা করা ছবিটি মুক্তির ৫০ বছর পূর্ণ করলো।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট তখনকার সময়ের ৩ কোটি রুপী (আজকের দিনের হিসেবে ৯০০ কোটি) বাজেটের ছবিটি মুক্তি পায়। কিন্তু শেষ দৃশ্য পছন্দ না হওয়ায় প্রথম সপ্তাহ শেষে ছবিটি ‘ফ্লপ’! পরিচালক রমেশ সিপ্পি সিদ্ধান্ত নিলেন শেষ দৃশ্য নতুন করে শুট ক্রে মুক্তি দিবেন। কিন্তু লেখক জুটি সলিম-জাভেদ রাজি হলেন না। বরং একটা গ্যাম্বলিংয়ের আশ্রয় নিলেন। পত্রিকায় ফুল পেইজ বিজ্ঞাপন দিয়ে দাবি করা হলো—ভারতের প্রত্যেক অঞ্চল থেকে ১ কোটি করে তুলবে ছবিটি।
কাজ হলো। দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে হাউজফুল। ‘ছোলে’ বলে কটাক্ষ করা দর্শকরাই ‘শোলে’-কে এগিয়ে দিল ইতিহাসের পথে। তাদের মুখে মুখে তখন ছবির বিভিন্ন সংলাপ।
চরিত্র এবং অভিনয়:
অমিতাভ বচ্চন (জয়) ও ধর্মেন্দ্র (বীরু)-র অনবদ্য বন্ধুত্ব সিনেমাটিকে প্রাণ দিয়েছে। হেমা মালিনী (বসন্তী) ও জয়া ভাদুড়ী (রাধা) তাদের চরিত্রে সংযত অথচ হৃদয়ছোঁয়া অভিনয় করেছেন। কিন্তু এই ছবির সবচেয়ে স্মরণীয় চরিত্র নিঃসন্দেহে গব্বর সিং, যাকে জীবন্ত করে তুলেছিলেন অমজাদ খান।
কাহিনি ও নির্মাণশৈলী:
শোলে মূলত এক প্রতিশোধের কাহিনি, যেখানে সাবেক পুলিশ ঠাকুর বলদেও সিং (সঞ্জীব কুমার) দুই অপরাধী জয় ও বীরুকে ভাড়া করেন ডাকাত গব্বরকে ধরার জন্য। কিন্তু ধীরে ধীরে গল্প এগোয় বন্ধুত্ব, ত্যাগ, প্রেম আর প্রতিশোধের এক জটিল আবেগের মোড়কে। ছবির চিত্রগ্রহণ, আর. ডি. বর্মণের সংগীত, এবং সেলিম-জাভেদ জুটির চিত্রনাট্য ‘শোলে’কে করে তোলে এক মহাকাব্যিক অভিজ্ঞতা।
সংস্কৃতিতে প্রভাব:
‘শোলে’ শুধু একটি চলচ্চিত্র নয়, বরং ভারতীয় পপ কালচারে এক স্থায়ী ছাপ ফেলে গেছে। এর সংলাপ, চরিত্র, এমনকি ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকও আজও নানাভাবে ব্যবহৃত হয় বিজ্ঞাপন, রাজনীতি, থিয়েটার ও সামাজিক মাধ্যমে।
ব্যবসা:
মুম্বইয়ের মিনার্ভা থিয়েটারে টানা ২৮৬ সপ্তাহ চলেছিল ছবিটি। কলকাতায় মুক্তি পায় ‘এলিট’ সিনেমা হলে। টানা তিন বছর হাউসফুল হওয়ার পরে চলে যায় ‘জ্যোতি’সিনেমা হলে। ১৯৭০-এর দশকে ৭০ এমএম স্ক্রিনে ফিল্ম দেখার অভিজ্ঞতা বদলে দিয়েছিল লেনিন সরণির এই হল। সেখানেও টানা দুই বছর এবং হাউসফুল। ‘শোলে’ বাদে কোনও হিন্দি ছবির কলকাতায় টানা পাঁচ বছর হাউসফুলের রেকর্ড নেই। বিবিসি ইন্ডিয়া ছবিটিকে ‘ফিল্ম অফ দ্য মিলেনিয়াম’ বলে ঘোষণা করে। ধুলোমাখা, পাথুরে রামগড় বনাম দুর্ধর্ষ ডাকাত দলের এই ‘বই’ মূল্যবৃদ্ধির নিরিখে এ পর্যন্ত প্রায় ৩ হাজার কোটির ব্যবসা করেছে।


