মাত্র নয় মাসেরও কম সময়ে শেষ হতে যাচ্ছে গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ। অথচ এই চুক্তি নবায়নের জন্য আনুষ্ঠানিক আলোচনা এখনো শুরু না হওয়ায় গভীর উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তিন দশক আগে যখন এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল, তখন জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টি বর্তমানের মতো এতোটা প্রকট ছিল না। তাই এবারের আলোচনায় ক্রমবর্ধমান পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় জলবায়ু-সংক্রান্ত ধারাগুলো অন্তর্ভুক্ত করার জন্য বাংলাদেশকে জোরালো অবস্থান নিতে হবে।
বর্তমান পরিস্থিতি ও চুক্তির কাঠামো
বিদ্যমান চুক্তি অনুযায়ী প্রতি বছর ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ মে পর্যন্ত শুষ্ক মৌসুমে গঙ্গার পানি বণ্টন করা হয়। ফারাক্কা পয়েন্টে গত ৪০ বছরের গড় প্রবাহের ওপর ভিত্তি করে ১০ দিন অন্তর এই পানি ভাগ করা হয়।
চুক্তি অনুযায়ী, পানি প্রবাহের পরিমাণের ওপর ভিত্তি করে একটি স্তরবিন্যাস রয়েছে। নদীর পানি প্রবাহ ৭০ হাজার কিউসেক বা তার কম হলে উভয় দেশ সমান অংশ পায়। প্রবাহ ৭০ হাজার থেকে ৭৫ হাজার কিউসেকের মধ্যে থাকলে বাংলাদেশ পায় ৩৫ হাজার কিউসেক এবং বাকিটা পায় ভারত। আবার প্রবাহ ৭৫ হাজার কিউসেকের বেশি হলে ভারত পায় ৪০ হাজার কিউসেক এবং অবশিষ্ট পানি বাংলাদেশ পায়।
বিশেষ করে এই চুক্তিতে এপ্রিল মাসের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে আধাআধি অনুপাতে পানি বণ্টনের নিশ্চয়তা রয়েছে।
তবে সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, উজানে ভারত পানি সরিয়ে নেওয়ায় ফারাক্কায় পানির প্রাপ্যতা কমে গেছে। ফলে বাংলাদেশ প্রত্যাশার চেয়ে অনেক কম পানি পাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, উজানে পানি প্রত্যাহারের কারণে বাংলাদেশের নদীগুলো শুকিয়ে যাচ্ছে এবং পলি প্রবাহ কমে যাওয়ায় নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে।
প্রায় এক দশকের বিরতি দিয়ে ২০২২ সালের আগস্টে যৌথ নদী কমিশনের ৩৮তম মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছিল। তৎকালীন পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রী জাহিদ ফারুক বাংলাদেশের পক্ষে এবং ভারতের জলশক্তি মন্ত্রী গজেন্দ্র সিং শেখাওয়াত ভারতের পক্ষে সেই বৈঠকে নেতৃত্ব দেন। গঙ্গা ও তিস্তাসহ অভিন্ন নদীগুলোর পানি বণ্টন নিয়ে দীর্ঘদিনের ঝুলে থাকা সমস্যাগুলো সমাধানের লক্ষ্যে সেই বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হলেও বিগত সরকারের পরবর্তী ১৮ মাসেরও বেশি সময় ধরে কোনো মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠক বা দৃশ্যমান অগ্রগতি লক্ষ্য করা যায়নি।
বর্তমান চুক্তিটি নদীর বাস্তুসংস্থান, পলি সংকট এবং পদ্মা নদীতে প্রবাহ কমে যাওয়ার মতো দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবগুলো মোকাবিলা করতে ব্যর্থ হচ্ছে বলেও বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।
বিএনপির অবস্থান
নির্বাচনের আগে বিএনপি তাদের অঙ্গীকারে পদ্মা ও তিস্তাসহ অভিন্ন নদীগুলোর পানির ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত করার কথা উল্লেখ করেছে। দলটির পক্ষ থেকে সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার এবং চোরাচালান, মানব পাচার ও মাদক পাচারের মতো আন্তঃসীমান্ত অপরাধ বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
গত মাসে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর কাছে পাঠানো এক চিঠিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মর্যাদা, সমতা, পারস্পরিক বিশ্বাস ও অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানান। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, দুই দেশের জনগণের স্বার্থ রক্ষা করে ঢাকা ও নয়াদিল্লি বিদ্যমান সমস্যাগুলো সমাধানের মাধ্যমে সামনে এগিয়ে যেতে পারবে।
দ্রুত আলোচনার প্রয়োজনীয়তা
গঙ্গাচুক্তির মেয়াদ শেষ হয়ে আসায় বিশেষজ্ঞরা অবিলম্বে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু করার ওপর তাগিদ দিয়েছেন। নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশের সাবেক উপ-হাইকমিশনার মাহবুব হাসান সালেহ বলেন, নবায়নযোগ্য চুক্তির কাঠামোতে অবশ্যই জলবায়ু পরিবর্তন ইস্যুটি অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। তিনি উল্লেখ করেন, উজানে পানি প্রত্যাহারের কারণে বাংলাদেশের নদীগুলো শুকিয়ে যাচ্ছে। ইতিমধ্যে বাংলাদেশে পানির অভাবে প্রায় ৮০টি নদী মরে গেছে। এর ফলে মানুষের জীবিকা ও পরিবেশের ভারসাম্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে।
মাহবুব হাসান সালেহ আরও বলেন, আন্তঃসীমান্ত নদীগুলো আন্তর্জাতিক প্রাকৃতিক সম্পদ এবং এগুলোর টেকসই ব্যবস্থাপনা বজায় রাখা সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর যৌথ দায়িত্ব। পানির ন্যায্য এবং পরিবেশবান্ধব ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হলে ভাটির দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে ভয়াবহ পরিণতির শিকার হতে হবে।


