নির্বাচনের ঠিক আগমুহূর্তে অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদের শেষ সময়ে এসে প্রকল্প অনুমোদনের ধুম পড়েছে। গত ২৫ জানুয়ারি একনেক সভায় ‘বাংলাদেশ ক্লিন এয়ার প্রজেক্ট’ নামের একটি বড় প্রকল্প অনুমোদনের জন্য তোলা হয়। পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের নেতৃত্বাধীন এই প্রকল্পটি শেষ পর্যন্ত পাস না হলেও এটি নিয়ে নানা মহলে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। প্রায় ৯৪৯ কোটি টাকার এই প্রকল্পের সিংহভাগই বিশ্বব্যাংকের ঋণের ওপর নির্ভরশীল।
প্রশ্ন উঠেছে, বিদায়ী সরকার যখন নীতিগতভাবে বড় সিদ্ধান্তের শেষ পর্যায়ে, তখন এমন বিপুল ঋণের বোঝা পরবর্তী সরকারের ওপর চাপিয়ে দেওয়া কতটা যৌক্তিক। প্রকল্পটিকে ‘রুটিন কাজ’ বলা হলেও বিশ্লেষকরা বলছেন ভিন্ন কথা।
এ ছাড়া নীলফামারীতে এক হাজার শয্যার ‘বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী জেনারেল হাসপাতাল’ তৈরির একটি বড় প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, যেটির অর্থায়নের ব্যাপারে চীনের পক্ষ থেকে কোনো লিখিত প্রতিশ্রুতি বা চুক্তি এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পর্যাপ্ত যাচাই-বাছাই ছাড়া এভাবে দ্রুত প্রকল্প পাস করার ফলে ভবিষ্যতে খরচ বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে, যা দেশের অর্থনীতির জন্য দীর্ঘমেয়াদি চাপ।
হিসাব অনুযায়ী, ১ ডিসেম্বর থেকে ২৫ জানুয়ারি পর্যন্ত অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ দুই মাসে মোট ৬৪টি প্রকল্প অনুমোদন পেয়েছে। এর পেছনে খরচ ধরা হয়েছে এক লাখ ৬ হাজার ৯৯৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৪০টিই একদম নতুন প্রকল্প।
এ ছাড়া পুরো দেড় বছরের মেয়াদে এই সরকার সব মিলিয়ে ১৩৫টি নতুন প্রকল্প হাতে নিয়েছে, যেগুলোর মোট ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ২ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকা। একনেকের শেষ সভাতেই একদিনে ১৯ হাজার ১৬৫ কোটি টাকার ১৪টি প্রকল্প পাস করা হয়।
বাতাস নির্মল করার যে প্রকল্পের কথা বলা হচ্ছে, কাগজে-কলমে তার উদ্দেশ্য খুবই ভালো। পরিবেশ অধিদপ্তরের নজরদারি বাড়ানো বা কলকারখানার ধোঁয়া নিয়ন্ত্রণ করার মতো পরিকল্পনা সেখানে আছে। কিন্তু বাস্তবে এটি কতটুকু কাজে আসত, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। ২০৩০ সাল পর্যন্ত মেয়াদের এই প্রকল্পের বাস্তবায়নের সময় বর্তমান সরকারের কেউ দায়িত্বে থাকবেন না। ৯৪৯ কোটি টাকার ঋণের বোঝা বইতে হবে সাধারণ মানুষকে। অথচ পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন, এই প্রকল্পের মাধ্যমে ঢাকার বায়ু দূষণের অন্যতম কারণগুলো–যেমন বর্জ্য পোড়ানো বা রাস্তাঘাটের ধুলাবালি নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি খুব একটা গুরুত্ব পায়নি।
পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ আবদুল মোতালিব জানান, এই প্রকল্পের সুফল পাওয়ার সুযোগ ছিল সীমিত। অধিদপ্তরের পরিচালক মো. হাসান হাসিবুর রহমানও স্বীকার করেন, নির্বাচনের আগমুহূর্তে এত বড় ঋণের প্রকল্প তোলা নিয়ে নৈতিক ও রাজনৈতিক প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মো. হুমায়ুন কবির বলেন, শুধু মনিটরিং করে বায়ু দূষণ কমানো সম্ভব নয়। যেখানে রাস্তায় ২০-২৫ বছরের পুরনো গাড়ি চলে, সেখানে বিশ্বব্যাংকের বিপুল টাকা খরচ করে কতটা লাভ হবে তা ভাববার বিষয়।
একইভাবে নীলফামারীর হাসপাতাল প্রকল্পটি নিয়ে দেখা দিয়েছে ধোঁয়াশা। প্রায় ২ হাজার ৪৫৯ কোটি টাকার এই প্রকল্পের মধ্যে ২ হাজার ২৮০ কোটি টাকাই চীনের দেওয়ার কথা। কিন্তু অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) একনেককে আগেই জানায়, চীনের পক্ষ থেকে কোনো লিখিত নিশ্চয়তা বা চুক্তিপত্র আসেনি। এমনকি তারা প্রকল্পের জায়গাটুকুও এসে দেখেনি।
নিয়ম অনুযায়ী কোনো বিদেশি ঋণের প্রকল্পের ক্ষেত্রে দাতা সংস্থার লিখিত সম্মতি থাকা বাধ্যতামূলক হলেও এই প্রকল্পের ক্ষেত্রে তা মানা হয়নি। এই বিষয়ে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব শাহ ইমাম আলী রেজা জানান, তারা ঋণের জন্য ইআরডির মাধ্যমে যোগাযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন।
অর্থনীতিবিদরা এই প্রকল্পের হিড়িক নিয়ে বেশ উদ্বিগ্ন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক মুহাম্মদ শাহাদাত হোসেন সিদ্দিকী মনে করেন, সরকার আয় বাড়ানোর চেয়ে খরচ করতেই বেশি আগ্রহী।
তিনি বলেন, এর মধ্যেই ৩ লাখ ৫৪ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়া হয়েছে। একদিকে সরকার মিতব্যয়ী হওয়ার কথা বলছে, অন্যদিকে শেষ সময়ে এসে এত বড় বড় প্রকল্প হাতে নিচ্ছে। এই স্ববিরোধী সিদ্ধান্ত পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের ওপর বড় ধরনের ঋণের বোঝা এবং অর্থনৈতিক সংকট তৈরি করতে পারে বলে মন্তব্য করেন শাহাদাত হোসেন সিদ্দিকী।


