যুক্তরাজ্যে প্রথমবারের মতো মৃত নারীর জরায়ু প্রতিস্থাপন করে এক শিশুর জন্ম হয়েছে। ২০২৫ সালের ২৫ ডিসেম্বরের ঠিক আগে পশ্চিম লন্ডনের কুইন শার্লটস অ্যান্ড চেলসি হাসপাতালে জন্ম নেওয়া ছেলে শিশুটির নাম হুগো। জন্মের সময় তার ওজন ছিল প্রায় সাত পাউন্ড। চিকিৎসকেরা একে যুক্তরাজ্যে অঙ্গ প্রতিস্থাপনের ক্ষেত্রে একটি ঐতিহাসিক অগ্রগতি হিসেবে দেখছেন।
বিবিসিকে দেওয়া সাক্ষাতকারে শিশুটির মা গ্রেস বেল (৩০) জানান, তিনি এমআরকেএইচ সিনড্রোমে আক্রান্ত। এ অবস্থায় নারীরা মূলত জরায়ু ছাড়া জন্ম নেন। তাদের স্বাভাবিক ঋতুস্রাব হয় না, তবে ডিম্বাশয় স্বাভাবিক থাকে।
১৬ বছর বয়সে গ্রেস জানতে পারেন, জরায়ু না থাকায় তিনি নিজের গর্ভে কখনো সন্তান ধারণ করতে পারবেন না। কাজেই সন্তান নেওয়ার জন্য গ্রেস ও তার সঙ্গী স্টিভ পাওয়েলের সামনে দুটি পথ ছিল- সারোগেসি (ভিন্ন নারীর জরায়ু ধার নিয়ে সন্তান জন্মদান) অথবা জরায়ু প্রতিস্থাপন।
ঠিক এমন সময় তাদের সামনে আসে চমকপ্রদ এক প্রস্তাব। অঙ্গদানের অনুমতি দেওয়া এক নারী ২০২৪ সালের জুনে মারা গেলে তার জরায়ু প্রতিস্থাপনের সুযোগ লুফে নেন গ্রেস।
অক্সফোর্ডের চার্চিল হাসপাতালে প্রায় ১০ ঘণ্টার অস্ত্রোপচারে মৃত ওই দাতার জরায়ু তার শরীরে প্রতিস্থাপন করা হয়। কয়েক মাস পর লন্ডনের লিস্টার ফার্টিলিটি ক্লিনিকে আইভিএফ চিকিৎসা এবং ভ্রূণ স্থানান্তরের প্রক্রিয়া শেষে তিনি গর্ভধারণ করেন।
গ্রেস বলেন, ‘যখন আমি ফোন পাই- একটি জরায়ু দান করা হয়েছে এবং প্রতিস্থাপন সম্ভব, তখন আমি সম্পূর্ণ হতবাক হয়ে যাই। একই সঙ্গে আমরা ভীষণ উচ্ছ্বসিত হয়ে পড়ি। আমরা দাতা ওই ব্যক্তির পরিবারের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞ। আমি প্রতিদিন তাদের কথা ভাবি, তাদের মেয়ে আমাকে জীবনের সবচেয়ে বড় উপহার দিয়েছেন- আরেকটি জীবনের উপহার। তার একটি অংশ চিরকাল আমার সন্তানের মধ্যে বেঁচে থাকবে।’
শিশু হুগোর জন্মের পর গ্রেস বলেন, ‘এটা ছিল অলৌকিক স্বপ্নের মতো। সকালে ঘুম ভেঙে তার ছোট্ট মুখটা দেখে মনে হচ্ছিল, যেন স্বপ্ন দেখছি।’

এই সফলতা যুক্তরাজ্যের একটি ক্লিনিক্যাল গবেষণা প্রকল্পের অংশ। মৃত দাতার জরায়ু প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে মোট ১০টি অস্ত্রোপচারের পরিকল্পনা করছে দেশটির স্বাস্থ্যমন্ত্রণালয়। এরইমধ্যে তিনটি অস্ত্রোপচার সফলভাবে শেষ হয়েছে।
তবে মৃত ব্যক্তির দেহ থেকে নেওয়া জরায়ুর মাধ্যমে এটিই প্রথম শিশু জন্মের ঘটনা। এর আগে ২০২৫ সালের শুরুতে এক জীবিত দাতার জরায়ু প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে প্রথম শিশু অ্যামির জন্ম হয়। তার মা ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে নিজের বড় বোনের জরায়ু প্রতিস্থাপন করেছিলেন।
ইম্পেরিয়াল কলেজ হেলথকেয়ার এনএইচএস ট্রাস্টের কনসালট্যান্ট গাইনোকোলজিস্ট অধ্যাপক রিচার্ড স্মিথ ২৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে জরায়ু প্রতিস্থাপন নিয়ে গবেষণা করছেন এবং তিনিই শিশু হুগোর জন্মের সময় পুরো প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করেছেন।
তিনি বলেন, জরায়ু প্রতিস্থাপন থেকে ভ্রূণ স্থানান্তর ও প্রসব পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়ায় একটি বড় দল কাজ করেছে। তিনি ‘উম্ব ট্রান্সপ্লান্ট ইউকে’ নামের একটি দাতব্য সংস্থার প্রতিষ্ঠাতাও। তার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাতে গ্রেস ও স্টিভ তাদের সন্তানের মাঝের নাম রেখেছেন রিচার্ড।
প্রতিস্থাপন সার্জন ইসাবেল কুইরোগা বলেন, ‘ইউরোপে মৃত দাতার জরায়ু প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে খুব কম শিশুর জন্ম হয়েছে। যেসব নারী কার্যকর জরায়ু ছাড়া জন্মেছেন বা অন্য কারণে সন্তান ধারণে অক্ষম, তাদের জন্য এ পদ্ধতিকে নিয়মিত ও অনুমোদিত চিকিৎসা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব কি না তা নির্ধারণ করাই এ গবেষণার লক্ষ্য।’

অবশ্য চিকিৎসকেরা জানান, মৃত দাতার জরায়ু প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে জন্ম নেওয়া শিশুর সঙ্গে দাতার কোনো জেনেটিক সম্পর্ক থাকে না। বিশ্বজুড়ে এখন পর্যন্ত ১০০টির বেশি জরায়ু প্রতিস্থাপন হয়েছে এবং এর মধ্য দিয়ে ৭০টিরও বেশি সুস্থ শিশুর জন্ম হয়েছে।
গ্রেস ও স্টিভ দম্পতি ভবিষ্যতে দ্বিতীয় সন্তান নেওয়ার কথা ভাবছেন। দ্বিতীয় সন্তানের পর প্রতিস্থাপিত জরায়ুটি অপসারণ করা হবে, যাতে গ্রেসকে সারা জীবন রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা দমনকারী শক্তিশালী ওষুধ খেতে না হয়।
জরায়ু দান অন্যান্য অঙ্গদানের মতো নয়। এটি কেবল বিশেষ অনুরোধের ভিত্তিতে করা হয়, যখন কোনো পরিবারের সদস্য আগেই অঙ্গদানের সম্মতি দিয়েছেন। যুক্তরাজ্যে কেউ অঙ্গদান থেকে নিজেকে প্রত্যাহার না করলে, মৃত্যুর পর তাকে অঙ্গদাতা হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দাতার বাবা-মা জানান, তাদের মেয়ের রেখে যাওয়া এই উপহারে তারা অপরিসীম গর্ব অনুভব করেন। ওই নারীর মৃত্যুর পর আরও পাঁচটি অঙ্গ বিভিন্ন ব্যক্তির শরীরে প্রতিস্থাপন করা হয়েছে।


