চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের আইসিইউতে এখন প্রতিটি মুহূর্ত যেন এক অনিশ্চিত অপেক্ষা। চিকিৎসকরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন, স্বজনরা দোয়া করছেন, আর লাইফ সাপোর্টে নিস্তেজ হয়ে পড়ে আছে ১১ বছর বয়সী রেশমি আক্তার।
গত পাঁচদিন ধরে ছোট্ট এই শিশুটিকে বাঁচিয়ে রাখতে চলছে এক অসম লড়াই-যেখানে আশা আর শঙ্কা প্রতিনিয়ত মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে।
স্থানীয় একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রী রেশমি। হাসিখুশি আর চঞ্চল এই শিশুটির জীবন কয়েক মিনিটের সহিংসতায় থমকে গেছে। গত ৭ মে রাতে চট্টগ্রাম নগরের বায়েজিদ বোস্তামী থানার রৌফাবাদ এলাকার শহীদ মিনার কলোনিতে ঘটে এই মর্মান্তিক ঘটনা।
পরিবারের জন্য পান কিনতে ঘর থেকে বের হয়েছিল রেশমি। ঠিক সেই সময় এলাকায় সন্ত্রাসীদের গুলির ঘটনা ঘটে। মূলত হাসান রাজু নামের এক যুবককে লক্ষ্য করে ছোড়া গুলির একটি গিয়ে লাগে পথচারী রেশমির চোখে। মুহূর্তেই রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে লুটিয়ে পড়ে সে।
স্থানীয়রা দ্রুত তাকে উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে নিয়ে যান। পরে অবস্থার অবনতি হলে নেয়া হয় আইসিইউতে। ঘটনার পর থেকে মঙ্গলবার পর্যন্ত আইসিইউতে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে শিশুটি।
চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, গুলিটি রেশমির চোখের ভেতর দিয়ে প্রবেশ করে মস্তিষ্কে আঘাত করেছে। এতে জটিল নিউরোট্রমা তৈরি হয়েছে। হাসপাতালের নিউরোসার্জারি বিভাগের চিকিৎসকদের মতে, তার শরীরে মাল্টি অর্গান ডিসফাংশনের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে এবং নিউরোলজিক্যাল রেসপন্স প্রায় নেই বললেই চলে। চিকিৎসকরা শিশুটির অবস্থাকে ‘ব্রেইন ডেথ সদৃশ’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। অলৌকিক কোন ঘটনা ছাড়া তার ফেরার কোনো সম্ভাবনা নেই বলেও জানিয়ে দিয়েছে চিকিৎসকরা।
বর্তমানে সাত সদস্যের একটি মেডিকেল বোর্ড তার চিকিৎসার তদারকি করছে। তবে তার অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় পরিবার ও চিকিৎসকদের উদ্বেগ আরও বাড়ছে। আইসিইউর সামনে অপেক্ষায় থাকা স্বজনদের চোখেমুখে এখন শুধু আতঙ্ক আর অসহায়ত্ব।
রেশমির বাবা রিয়াজ আহমেদ একজন সাধারণ শাক বিক্রেতা। পাঁচ ভাই-বোনের মধ্যে রেশমি সবার ছোট। আদরের মেয়েটিকে এভাবে হাসপাতালের বিছানায় দেখে ভেঙে পড়েছেন তিনি। কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, আমার মেয়ের কী দোষ ছিল? শুধু পান কিনতে বের হয়েছিল। আমরা গরিব মানুষ, কিন্তু আমার মেয়ের জন্য বিচার চাই।
রেশমির মেজ ভাই ফয়সাল আহমেদ বলেন, চিকিৎসকরা তাদের খুব বেশি আশা দেখাতে পারছেন না। তিনি বলেন, ডাক্তাররা বলেছেন, লাইফ সাপোর্ট ছাড়া ওকে বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব নয়। যতক্ষণ শ্বাস চলছে, ততক্ষণ চেষ্টা করা হচ্ছে।
এই লড়াই শুধু হাসপাতালের আইসিইউতে সীমাবদ্ধ নয়, চলছে পরিবারটির জীবনেও। স্বল্প আয়ের এই পরিবার চিকিৎসার ব্যয় বহন করতে গিয়ে প্রায় নিঃস্ব হয়ে পড়েছে। অসুস্থ বাবা শাক বিক্রি করে সংসার চালান, আর ফয়সাল একটি মুদির দোকানে চাকরি করেন। পরিবারের দাবি, এখন পর্যন্ত চিকিৎসার পেছনে প্রায় ৮০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা খরচ হয়ে গেছে। ধারদেনা আর আত্মীয়স্বজনের সহযোগিতায় চিকিৎসা চালানো হলেও সামনে কী হবে, তা নিয়ে গভীর দুশ্চিন্তায় রয়েছেন তারা।
ঘটনার পরপরই রেশমিকে দেখতে চমেক হাসপাতালে যান চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা। তিনি পরিবারকে ২৫ হাজার টাকা আর্থিক সহায়তা দেন এবং সরকারি সহায়তার আশ্বাস দেন।
জেলা প্রশাসক টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, প্রথমে তাকে চমেক হাসপাতালে নেওয়া হয়। আইসিইউ খালি না থাকায় পরে তাকে প্রাইভেট হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু চিকিৎসার ব্যয় পরিবার বহন করতে পারছিল না। পরে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতে ব্যবস্থা করা হয়েছে। তাকে বাঁচিয়ে রাখার সর্বোচ্চ চেষ্টা চলছে। প্রয়োজনে সরকারিভাবে আরও সহায়তা দেওয়া হবে।
এদিকে, হাসান রাজু হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মূল পরিকল্পনাকারী সৈয়দুল করিমসহ ছয়জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত অস্ত্রও উদ্ধার করা হয়েছে। পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আহত শিশু রেশমির ঘটনায়ও দ্রুত তদন্ত শেষ করে জড়িতদের আইনের আওতায় আনা হবে।
তদন্তে পুলিশ জানতে পারে, হত্যাকাণ্ডটি ছিল পূর্বপরিকল্পিত। প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে এর পরিকল্পনা করা হয়। ঘটনার পেছনে রাউজানের কদলপুর এলাকার পুরোনো বিরোধ কাজ করেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
সংবাদ সম্মেলনে উপকমিশনার মো. আমিরুল ইসলাম বলেন, প্রায় দুই সপ্তাহ আগে রাউজানের কদলপুর এলাকায় ‘মধু নাসির’ নামে এক ব্যক্তি খুন হন। ওই হত্যা মামলার আসামি ছিলেন রাজু। সেই হত্যাকাণ্ডের প্রতিশোধ নিতেই তাকে টার্গেট করে হামলা চালানো হয়।
পুলিশের ভাষ্য, গ্রেপ্তার সৈয়দুল করিম এই হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী। তিনি নিজেই ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকে গুলি চালান এবং রাজুর মৃত্যু নিশ্চিত করেন। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই অন্য আসামিদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
পুলিশ জানায়, ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজ ও গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণ করে ঘাতকদের বহনকারী সিএনজি অটোরিকশাটি শনাক্ত করা হয়। পরে অটোরিকশাচালক আবদুল মান্নানকে গ্রেপ্তারের পর তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে মূল শ্যুটার করিমকে আটক করা হয়। এরপর করিমের বাসা থেকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত বিদেশি পিস্তল, ম্যাগাজিন, দুই রাউন্ড কার্তুজ এবং রক্তমাখা টি-শার্ট উদ্ধার করা হয়।
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) উত্তর বিভাগের উপকমিশনার মো. আমিরুল ইসলাম বলেন, যেহেতু ঘটনা একটি এবং মামলাও হয়েছে। এ ছাড়া একই ঘটনায় একাধিক মামলা হয় না। তাই রেশমির পরিবারের নতুন করে মামলার প্রয়োজন নেই। রেশমি আক্তারের পরিবার অবশ্যই সুবিচার পাবে।
মামলার বিষয়ে আইনজীবীরা জানান, একই ঘটনায় একাধিক মামলা দায়ের করা সম্ভব, তবে আইন অনুযায়ী এটি সাধারণত নিরুৎসাহিত করা হয়। ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী, একই ঘটনার জন্য বারবার বিচার বা ‘অ্যাবুউস অব প্রসেস’ এড়াতে আদালত সাধারণত একটি প্রধান মামলা গ্রহণ করে এবং অন্যগুলোর সঙ্গে একীভূত করার নির্দেশ দেয়।


