ঢাকার মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ অনুষ্ঠান ঘিরে কড়া নিরাপত্তার ভুক্তভোগী হচ্ছেন নগরবাসী। ভোর থেকে বিভিন্ন রাস্তায় যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ করায় সীমাহীন ভোগান্তিতে পড়েছেন স্কুলগামী শিশুসহ নানা শ্রেণী-পেশার লাখো মানুষ।
চোখে মুখে বিরক্তির ছাপ নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা জ্যামে আটকে বসে থেকে রীতিমত হাঁসফাঁস করছেন তারা। অনেকের প্রশ্ন, দেশে জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম দিনই যদি জনগণকে এমন ভোগান্তিতে পড়তে হয় তবে বাকি দিন কাটবে কিভাবে।
মঙ্গলবার সকাল সরেজমিনে দেখা যায়, সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজা সংলগ্ন আসাদগেট মোড় বন্ধ করে যান চলাচলের জন্য সোজা ধানমন্ডির দিকে রাস্তা খুলে দেওয়া হয়েছে। তবুও প্রতিটি ট্রাফিক সিগন্যাল ও মোড়গুলোতে সীমিত সংখ্যক যান চলাচলের সুযোগ পাচ্ছে। এতে মিরপুর রোডে যানবাহন চলাচল প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে।
গাবতলি পার হয়ে জ্যাম পৌঁছে গেছে আমিনবাজার। টেকনিক্যাল মোড়ের আগে সড়কে সংস্কার কাজের জন্য স্বাভাবিকভাবেই যান চলাচল ধীর গতির থাকলেও মঙ্গলবার সকাল থেকে যানবাহন যেন সড়কেই থমকে আছে।


একই পরিস্থিতি দেখা যায়, কলেজগেট সংলগ্ন সিগন্যালেও। আসাদগেট-ফার্মগেট মুখী যানবাহনগুলো বিকল্প বিভিন্ন রাস্তায় ডাইভারশন নেওয়ায় সেসব রাস্তায়ও অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। শ্যামলী- শিশুমেলা থেকে বামে ঘুরে আগারগাঁও-বিজয় স্মরণী হয়ে অসংখ্য গাড়ি ফার্মগেট পৌঁছানোর চেষ্টা করেছে।
কিছু গাড়ি ধানমন্ডি ৩২ নাম্বার থেকে বামে ঘুরে বসুন্ধরা সিটির সামনে দিয়ে সোজা কারওয়ান বাজার বের হয়েছে। বাসের ধীরগতির ফলে দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছাতে অসংখ্য যাত্রী বেছে নিয়েছেন মোটরসাইকেলের রাইড শেয়ারিং। তবুও ট্রাফিক সিগন্যালের যাতাকলে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে তাদেরও।
সাভার থেকে ওয়েলকাম বাসে আসা এক যাত্রী বলেন, ‘কেবল সংসদ সদস্যদের শপথ পড়াতেই যদি এতো হাঙ্গামা করতে হয়, তাদের “ভিআইপি ট্রিটমেন্ট” দিতে গিয়ে জনগণকে এমন কষ্ট পেতে হয় তবে আর কি লাভ হলো।’
একই পথের স্কুলগামী এক শিক্ষার্থীর ভাষায়, ‘নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের যদি এমন কড়া নিরাপত্তা দিতে হতো তবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণ ছুটি ঘোষণা করলেই পারতো। শপথ সকাল ১০টায় অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। অথচ রাস্তাঘাট আটকে দিয়েছে সেই ভোরে। এটি তো জনগণের সঙ্গে অবিচার।’

কলেজগেটের শহীদ সোহ্রাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের সামনে কথা হয় রোগী নিয়ে আসা এক স্বজনের সঙ্গে। তিনি ক্ষোভ জানিয়ে বলেন, ‘সেই রাজশাহী থেকে রোগী নিয়ে ঢাকায় এসেছি। রাতে এক আত্মীয়ের বাড়িতে ছিলাম। ভোরে বের হয়েছি হাসপাতালের আউটডোরে ডাক্তার দেখাবো বলে। অথচ এখনো আমরা হাসপাতালে পৌঁছতে পারিনি। অ্যাম্বুলেন্সগুলো যে রং সাইড দিয়ে আসবে সেই অবস্থাও নেই। দুই পাশের পুরো রাস্তাই জ্যাম। সরকারের অন্তত রোগীদের কথা কিংবা জরুরী সেবায় নিয়োজিত গাড়িগুলোর কথা মাথায় রাখা উচিত ছিল।’
এদিকে রাস্তায় যাত্রীদের অসহায়ত্ব চাপ ফেলেছে নগরের মেট্রোস্টেশনগুলোতেও। গন্তব্যে পৌঁছাতে সময় বাঁচাতে বেশিরভাগ যাত্রীই ছুটছেন আশেপাশের মেট্রোস্টেশনের দিকে।
মিরপুর ১০, কাজীপাড়া, শেওড়াপাড়া, বিজয় স্মরণী স্টেশনগুলোতে দেখা গেছে যাত্রীদের উপচে পড়া ভিড়।
মিরপুর ১০ থেকে মতিঝিলগামী মেট্রোর অপেক্ষায় থাকা এক যাত্রী বলেন, ‘আমি কল্যাণপুরের বাসিন্দা। অনেকক্ষণ বাসের জন্য দাঁড়িয়ে থেকেও কোনো কিছু না পেয়ে বিপরীত পথে মিরপুর ১০ এ এলাম মেট্রো ধরতে।’

জনগণের সীমাহীন ভোগান্তির সুযোগে অতিরিক্ত ভাড়া দাবি করছেন রিকশা, সিএনজি, মোটরসাইকেলগুলোও। সবার মুখে একই অজুহাত- সামনে রাস্তা বন্ধ কিংবা জ্যাম। এরপরও যাত্রীর তুলনায় রিকশা এবং সিএনজির পরিমাণ অপ্রতুল। ফলে উপায় না পেয়ে স্বল্প গন্তব্যের যাত্রীরা হাঁটাপথকেই শ্রেয় মনে করে ছুটছেন ফুটপাত ধরে। তবে সেখানেও অবৈধ দখল, ছোট ব্যবসায়ীদের দোকান থাকায় এবং মোটরসাইকেল ও সাইকেল চালকরা ফুটপাতকে সহজ রাস্তা হিসেবে বেছে নেওয়ায় ঝুঁকিতে পড়ছেন সধারণ জনগণ।
এমন অগণিত নেতিবাচক পরিস্থিতিতেও অনেকে আশা করছেন, নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর হওয়ার পর হয়তো নগরের জীবনযাপন ফের স্বাভাবিক হবে। উচ্ছেদ হবে অবৈধ দোকানপাট, দখলমুক্ত হবে ফুটপাত, ভিআইপিদের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাস্তা আটকে রাখার রীতি বন্ধ হবে, জনমনে আসবে স্বস্তি।


