লালন আখড়ায় পূর্ণ সেবায় শেষ সাধুসঙ্গ

লালন আখড়ায় পূর্ণ সেবায় শেষ সাধুসঙ্গ
ছবি: টাইমস
Advertisement
Advertisement

কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ার লালন আখড়াবাড়িতে পূর্ণ সেবার মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে সাধুসঙ্গের আনুষ্ঠানিকতা।

রোববার সকালে বাল্যসেবা ও দুপুরে পূর্ণ সেবা শেষে বিদায় নিতে শুরু করেন দেশ-বিদেশ থেকে আসা সাধু-গুরুরা। তবে লালন সাঁইয়ের ১৩৬তম তিরোধান দিবস উপলক্ষে আয়োজিত উৎসবের আলোচনা সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও গ্রামীণ মেলা চলবে সোমবার পর্যন্ত।

দীর্ঘ এক বছরের অপেক্ষা শেষে লালনের মানবতাবাদী দর্শন ও মরমি সাধনার টানে ছেঁউড়িয়ায় সমবেত হয়েছিলেন হাজারো সাধু-গুরু ও অনুসারী। অধিবাস, রাখাল সেবা, বাল্যসেবা ও পূর্ণ সেবার মধ্য দিয়ে তারা সাধুসঙ্গের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করেন। বিকাল থেকে অধিকাংশ সাধু আখড়াবাড়ি ছেড়ে যান। কেউ কেউ গুরুকার্য শেষে সোমবার সকালে ফিরবেন বলে জানা গেছে।

গাইবান্ধা থেকে আসা নিজাম ফকির বলেন, ‘আমরা প্রতিবছর সাঁইজির ধামে আসি। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সাধু-গুরুরা এখানে মিলিত হয়ে সাধুসঙ্গ করি। এবারও চারটি সেবার মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকতা শেষ হয়েছে। আজ অশ্রুসিক্ত নয়নে আখড়াবাড়ি ছেড়ে যাচ্ছি। আগামী বছর আবারও সবার সঙ্গে দেখা হবে, এটাই প্রত্যাশা।’

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আসা এক নারী শিক্ষার্থী বলেন, ‘লালন সাঁইয়ের দার্শনিক ভাবনা জানতে ও উপলব্ধি করতে এখানে এসেছি। সমাজের বৈষম্যবিরোধী বার্তা আমাকে ভীষণভাবে আকৃষ্ট করে। তার দর্শন ও ভাবধারা কাছ থেকে বোঝার পাশাপাশি তার গানও উপভোগ করতে চাই।’

লালন অনুসারী মামুন সাধু বলেন, ‘সাঁইজির ধামে এলে আমরা সবাই এক পরিবারের মতো মিলিত হই। গুরু-সান্নিধ্যে লালনের মানবতাবাদী দর্শন ও মরমি ভাবধারার চর্চা করি। পূর্ণ সেবার মধ্য দিয়ে সাধুসঙ্গ শেষ হওয়ায় এখন বিদায়ের পালা। মনটা ভারী হয়ে আছে। আগামী বছর আবারও এখানে ফেরার অপেক্ষায় থাকব।’

আরও পড়ুন

ঢাকা থেকে আসা এক নারী দর্শনার্থী জানান, লালনের দর্শন ও চিন্তাধারা কাছ থেকে জানতেই তাঁর এখানে আসা। বিশেষ করে বৈষম্যবিরোধী বার্তা তাকে আকৃষ্ট করে। লালনের গানও তার মনে গভীর প্রভাব ফেলে। এ আয়োজন থেকে মানবতা, সাম্য ও ইতিবাচক চিন্তার বার্তা নিয়ে ফিরতে চান তিনি।

সাধুদের বিদায়ে আখড়াবাড়িতে সাধুসঙ্গের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হলেও উৎসব চলছে। মূল মঞ্চে লালন একাডেমির শিল্পী ও দেশের বিশিষ্ট লালনশিল্পীরা মরমি সংগীত পরিবেশন করছেন। আখড়াবাড়ি প্রাঙ্গণের গ্রামীণ মেলাও চলবে সোমবার পর্যন্ত। তাই সাধুদের অনেকে ফিরে গেলেও লালনভক্ত ও দর্শনার্থীদের ভিড় রয়েছে।

লালনের প্রেম, মানবিকতা ও আত্মশুদ্ধির বাণী জানতে প্রতিবছর দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ ছেঁউড়িয়ায় আসেন। কেউ তার দর্শনে জীবনের অর্থ খোঁজেন, কেউ আসেন আত্মিক প্রশান্তির আশায়।

উৎসব নির্বিঘ্ন রাখতে জেলা প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কয়েক স্তরের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়েছে।

জেলা প্রশাসক তৌহিদ বিন হাসান বলেন, ‘লালন সাঁইয়ের তিরোধান দিবস তার মানবতাবাদী দর্শন, অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও সম্প্রীতির বার্তা ছড়িয়ে দেওয়ার গুরুত্বপূর্ণ আয়োজন। এতে দেশ-বিদেশের লালনভক্ত, সাধু-গুরু ও দর্শনার্থীরা অংশ নেন। উৎসব শান্তিপূর্ণ ও সুশৃঙ্খল রাখতে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো সমন্বিতভাবে কাজ করছে। দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা ও উৎসবের পরিবেশ বজায় রাখতে প্রশাসন সতর্ক রয়েছে। লালনের দর্শন ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণে এ আয়োজন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

উল্লেখ্য, ১২৯৭ বঙ্গাব্দের পহেলা কার্তিক ফকির লালন সাঁইয়ের মৃত্যুর পর থেকে তার স্মরণে ভক্ত-অনুসারীরা অনুষ্ঠান আয়োজন করে আসছেন। পরবর্তী সময়ে লালন একাডেমি ও জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে এ আয়োজন বিস্তৃত হয়। প্রতিবছর তিরোধান দিবসে লালনের দর্শন ও মরমি সংগীতের টানে ছেঁউড়িয়ার আখড়াবাড়িতে সমবেত হন দেশ-বিদেশের অসংখ্য ভক্ত, সাধু ও দর্শনার্থী।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad