বাংলার বাউল গানের সঙ্গে সুফিজম ও সহজিয়া বৈষ্ণব মতের দারুণ সম্পর্ক রয়েছে। লালন সাঁইয়ের যে গান তাতে সুফিজমের বিশাল প্রভাব দেখা যায়। মানবতাবাদী এ সাধক তার গানে ধর্ম, বর্ণ, গোত্রসহ সকল জাতিগত বিভেদ ভুলে মানবতাকে প্রাধান্য দিয়েছেন। একটা সময় পর্যন্ত এ দেশে লালনের গান বিভিন্ন বাউল আসরে গাওয়া হত। ‘ভদ্র সমাজে’ কাউকে গাইতে দেখা যেত না। মহাত্মা এ সাধকের গানকে যিনি সর্বসাধারণের কাছে পৌঁছে দিয়েছিলেন তিনি ফরিদা পারভীন।
প্রখ্যাত এ শিল্পী ছোটবেলা থেকেই এক সংস্কৃতিমনা পরিবারে বড় হয়েছেন। তিনি বলেছিলেন, ‘আমার জীবনের প্রথম অনুপ্রেরণা সংগীত।’ তিনি বিশ্বাস করতেন সঙ্গীতের মাধ্যমে জীবনের গভীর অর্থ উপলব্ধি করা যায়। তার মতে, সঙ্গীত শুধু একটি পেশা নয়, এটি জীবনের প্রতিচ্ছবি। তিনি তার সঙ্গীত ক্যারিয়ারের মধ্যে যে সাদৃশ্য এবং আত্মার শান্তি খুঁজে পেয়েছেন, তা পরবর্তীতে তার দর্শন এবং গানের সুরে প্রকাশ পায়।
ছোটবেলা মায়ের সুরেলা কণ্ঠে গান শুনতেন আর তার পাশে বসে হারোমোনিয়াম বাজাতেন। বলা যায়, ওখান থেকেই তার সুর সাধনা শুরু। বিখ্যাত সব মানুষদের কাছ থেকে গানের তালিম নিয়েছেন। তার প্রথম গুরু ছিলেন ওস্তাদ কমল চক্রবর্তী। ইব্রাহিম খান, রবীন্দ্রনাথ রায়, ওসমান গনি এবং মোতালেব বিশ্বাসের মত বিখ্যাত ওস্তাদের কাছে তিনি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের তালিম নেন। এরপর তিনি ওস্তাদ মীর মুজাফফর আলী এবং ওস্তাদ আব্দুল কাদিরের কাছ থেকে নজরুল সঙ্গীত শেখেন।

এক সাক্ষাৎকারে ফরিদা পারভীন জানিয়েছিলেন, শৈশবকাল থেকেই সন্দ্বীপা মুখোপাধ্যায়ের মধুর কণ্ঠস্বর তাকে অনেক মুগ্ধ করেছে। তার গান নিয়ে ফরিদা পারভীন বলেছিলেন, ‘তার গানে একটি বিশেষ আবেগ ছিল, যা আমার মনকে ছুঁয়ে গিয়েছিল।’ তাছাড়া, তিনি পিন্টু ভট্টাচার্য, মান্না দে, মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়, শ্যামল মিত্র, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, জগন্নাথ মিত্র এবং যতীলেশ্বর মুখোপাধ্যায়ের গানও অনেক পছন্দ করতেন। দেশিয় শিল্পীদের মধ্যে নিলুফার ইয়াসমিন, ফেরদৌসি রহমান, শাহনাজ রহমানতুল্লাহ এবং সুবীর নন্দী তার প্রিয় শিল্পী ছিলেন। প্রিয়াঙ্কা গোপে, বিজন মিস্ত্রি এবং ইউসুফ আহমেদ খান-এর গানও তিনি উপভোগ করতেন বলে জানিয়েছিলেন।
ষাটের দশকে তিনি রাজশাহী বেতারে নজরুলশিল্পী হিসেবে তালিকাভুক্ত হন। তার জনপ্রিয়তা বাড়ে ১৯৭৩ সালে প্রকাশিত ‘এই পদ্মা, এই মেঘনা’ এবং লালন গানের ‘সত্য বল সুপথে চল, ওরে আমার মন’ গানের মাধ্যমে। লালনের গানের সঙ্গে তার পরিচয় ঘটে মকছেদ আলী সাঁইয়ের মাধ্যমে। তার অনুপ্রেরণায় তিনি লালনের গান সাধনায় মননিবেশ করেন।
ফরিদা পারভীন লালনের গান নিয়ে কোথায় যাননি—ইউরোপ, আমেরিকাসহ পৃথিবীর সব প্রান্তে নিয়ে গেছেন। লালনের যে জীবন দর্শন তা শুধু এক সময় বাউলদের মধ্যে চর্চা হত। কিন্তু এখন বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ছে এ দর্শন। এটা সম্ভব হয়েছে অনেকটাই ফরিদা পারভীনের একক প্রচেষ্টায়।

লালন উৎসব নিয়মিত করা, লালন একাডেমী প্রতিষ্ঠা—লালনকে ঘিরে তার অনেক অবদান রয়েছে। তরুণদের মধ্যে শুদ্ধ লালন সংগীত চর্চা বাড়াতে প্রতিষ্ঠা করেছেন ‘ফরিদা পারভীন ফাউন্ডেশন’। সংগীত শেখার ব্যাপারে তার অভিমত ছিল, ‘কোনো শর্টকার্ট পদ্ধতিতে শিল্পী হওয়া যায় না’।
যত, খ্যাতি, সম্মান—সব কিছু লালনের গানের কারণে পেলেও তিনি অন্যান্য গান গেয়েছেন। করেছেন চলচ্চিত্রে প্লেব্যাক। ‘অন্ধ প্রেম’ ছবিতে গাওয়া গানের জন্য তিনি ১৯৯৩ সালে ‘শ্রেষ্ঠ কণ্ঠশিল্পী (নারী)’ ক্যাটাগরিতে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মাননা একুশে পদক পেয়েছিলেন ১৯৮৭ সালে। এছাড়া ২০০৮ সালে ফুকুয়োকা এশিয়ান কালচার পুরস্কারসহ অসংখ্য পুরস্কার পেয়েছেন এ গুণীজন।
‘লালন গানের রাণী’ এ শিল্পী ১৯৫৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর নাটোরে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তার বেড়ে উঠা ছিল কুষ্টিয়ায়।
বরেণ্য দীর্ঘদিন ধরে কিডনিসহ নানান শারীরিক সমস্যায় ভুগছিলেন। তাকে বেশ কয়েকবার হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) ভর্তি করা হয়। দীর্ঘদিন ধরে কিডনি জটিলতায় ভুগছিলেন ফরিদা পারভীন। কিছুদিন ধরে পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে, সপ্তাহে দুই দিন তাঁকে ডায়ালাইসিস করাতে হয়। নিয়মিত ডায়ালাইসিসের অংশ হিসেবে ২ সেপ্টেম্বর মহাখালীর ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয় তাকে। কিন্তু ডায়ালাইসিসের পর তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়। তখন চিকিৎসক তাকে হাসপাতালে ভর্তি করানোর পরামর্শ দেন। এর পর থেকে তিনি হাসপাতালের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন ছিলেন।
স্বজন, শুভাকাক্ষ্মী, ভক্তদের কাঁদিয়ে গানের পাখি উড়ে গেছেন অচিন লোকে শনিবার রাত ১০টা ১৫ মিনিট। খবরটি নিশ্চিত করেছেন ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আশীষ কুমার চক্রবর্তী । তার বয়স হয়েছিল ৭১। তিনি স্বামী এবং ৪ সন্তান রেখে গেছেন।
গত বুধবার অবস্থার অবনতি হলে তাকে ভেন্টিলেশনে রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। অবশেষে চিকিৎসকদের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে চলে গেলেন তিনি।


