বাংলা সংগীতে লালন গীতি মানেই এক গভীর অনুরণন। সেই অনুরণনের সঙ্গে সবচেয়ে নিবিড়ভাবে যুক্ত যিনি, তিনি ফরিদা পারভীন। অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় ধরে লালনের বাণীকে সুরে-সঙ্গীতে মানুষের হৃদয়ে পৌঁছে দিয়েছেন তিনি। কিন্তু শুরুটা হয়েছিল একেবারেই অনিচ্ছা থেকে।
১৯৭২ বা ৭৩ সালের দিকে, স্বাধীনতার পর কুষ্টিয়ার ছেঁউরিয়ায় দোল পূর্ণিমার উৎসবে গুরু মোকছেদ সাঁই প্রথম বলেছিলেন, ‘মা, লালনের মহাউৎসবে তোকে একটা গান গাইতে হবে।’ ফরিদা তখন নজরুল, দেশাত্মবোধক, ক্ল্যাসিক্যাল আর আধুনিক গানেই ব্যস্ত। লালনের গান গাওয়ার প্রস্তাবে তিনি সোজাসাপ্টা না বলে দিয়েছিলেন। এমনকি তাচ্ছিল্যের সুরে বলেছিলেন, ‘ধূর, এসব গান গায় নাকি মানুষ।’
তবে গুরু নাছোড়বান্দা। অবশেষে মান ভাঙিয়ে শেখালেন লালনের ‘সত্য বল সুপথে চল’। সেই গান দিয়েই প্রথম মঞ্চে লালনের সংগীত পরিবেশন করেন ফরিদা। দর্শকের অনুরোধ সত্ত্বেও দ্বিতীয় গান গাইতে না পারায় তার মনে এক অদ্ভুত আলোড়ন জেগে ওঠে। ঘুমহীন রাতের সেই অনুরণনই তাকে লালনের গানে ডুবিয়ে দেয়। ফরিদার নিজের ভাষায়, ‘তখনই বুঝেছিলাম লালনই আমার পথ।’
কুষ্টিয়ায় বেড়ে ওঠা ফরিদার জীবনে গান ছিল সবচেয়ে বড় আশ্রয়। বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান তিনি। বাবা দেলোয়ার হোসেন ছিলেন সরকারি চিকিৎসক, মা-ও মেয়ের সংগীতচর্চায় সমানভাবে সহযোগিতা করেছেন। চারপাশের মানুষ কিছু বললেও বাবা নির্দ্বিধায় বলতেন, ‘আমার একটা মেয়ে, সে গান করুক।’ মারমুখো স্বভাবের মেয়ে ফরিদা তখন বাজে মন্তব্যকারীদেরও সহজে চুপ করিয়ে দিতে পারতেন।
আজ তাকে বলা হয় ‘লালন গানের সম্রাজ্ঞী’, ‘লালন কন্যা’। কিন্তু এসব উপাধি তিনি কখনোই পছন্দ করেননি। তার মতে, লালনের গান গাওয়া মানে কোনো উপাধি পাওয়া নয়, বরং আত্মস্থ করা। ‘এসব নাম দেওয়ার কোনো যুক্তি নেই। আমি লালনের গান অন্তরের সঙ্গে আত্মার মিলন ঘটিয়েই আজকের জায়গায় এসেছি,’ বলেছিলেন তিনি।
লালনের দর্শন তার ব্যক্তিজীবনকেও প্রভাবিত করেছে। নানান পরীক্ষার মুখোমুখি হলেও সেগুলোকে তেমন গুরুত্ব দেননি। পেশাগত জীবনে তিনি শুধু সুরের সঙ্গে সুর মিলিয়েছেন। তার প্রতিটি গানই তিনি সন্তানতুল্য মনে করেন, আলাদা করে প্রিয় গান বেছে নিতে পারেন না।
লালনের গানের আধুনিকীকরণে তার তীব্র আপত্তি ছিলো। তিনি বলেছিলেন, ‘ওইভাবে লাফালাফি করে লালনের গান হয় না। এগুলো নিভৃতে বসে গাইতে হয়, গভীর উপলব্ধি থেকে মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে হয়।’
লালনের গান সংরক্ষণেও তিনি কাজ করছেন। ১০০ গান নিয়ে একটি সংকলনের পরিকল্পনা ছিল তার। এরই মধ্যে ৭৫টি গান লিপিবদ্ধ করে যেতে পেরেছিলেন তিনি।


