প্রায় দুই বছর বন্ধ থাকার পর বাংলাদেশসহ ১২টি দেশের জন্য পুনরায় শ্রমবাজার চালুর ঘোষণা দিয়েছে মালয়েশিয়া। তবে এ বিষয়ে এখনো পর্যন্ত সরকারের কোনো আনুষ্ঠানিক নির্দেশনা না থাকায় সম্ভাব্য অভিবাসী কর্মী ও রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর মধ্যে বিভ্রান্তি বিরাজ করছে।
গত সোমবার মালয়েশিয়ার মানবসম্পদমন্ত্রী রামানান রামাকৃষ্ণন বাংলাদেশসহ ১২টি দেশের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার আবার খুলে দেওয়ার ঘোষণা দেন। প্রধান উপদেষ্টা তারেক রহমানের সাম্প্রতিক মালয়েশিয়া সফরের পর এ ঘোষণা আসে। ওই সফরে তিনি বাংলাদেশ থেকে কর্মী নিয়োগ পুনরায় শুরু করার জন্য কুয়ালালামপুরের প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলেন।
গত মঙ্গলবার সিলেট সার্কিট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরীও এ তথ্য নিশ্চিত করে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া সফর সফল হয়েছে বলেই দেশটি বাংলাদেশের জন্য শ্রমবাজার পুনরায় খুলেছে।’
আগামী দিনে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ, জাপান ও মরিশাসের শ্রমবাজারও বাংলাদেশের জন্য উন্মুক্ত করতে সরকার কাজ করছে বলেও জানান তিনি।
তবে মালয়েশিয়া শ্রমবাজার চালুর ঘোষণার পরও বিভিন্ন রিক্রুটিং এজেন্সির সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভাব্য কর্মীরা জানিয়েছেন, সরকার থেকে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক নির্দেশনা না পাওয়ায় তারা নতুন করে আবেদন বা এ সংক্রান্ত কোনো প্রক্রিয়া শুরু করতে পারছেন না।
ঝালকাঠির দপদপিয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা ইবাইদুল হক জানান, মালয়েশিয়া হঠাৎ শ্রমবাজার বন্ধ করে দেওয়ার প্রায় দুই বছর আগে তিনি একটি এজেন্সিতে টাকা জমা দিয়েছিলেন। মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশ হাইকমিশনে পরিচিত কর্মকর্তাদের সঙ্গেও কথা হয়েছে। তারাও জানিয়েছেন, এ বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি।
একই এলাকার আরেক সম্ভাব্য অভিবাসী নাদিম হোসেন বলেন, ‘২০২৪ সালের ১ জুন মালয়েশিয়া শ্রমবাজার বন্ধ করার পর থেকেই তারা পুনরায় চালুর অপেক্ষায় ছিলেন। কিন্তু এখনো সরকারি ঘোষণা না আসায় তারা অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন।’
বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিজ (বায়রা)-এর সদস্যরা জানান, মালয়েশিয়ার ১২টি দেশের জন্য একযোগে এ ঘোষণা দিয়েছে। তবে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে কী প্রক্রিয়ায় কর্মী নিয়োগ হবে, সে বিষয়ে এখনো কোনো সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত হয়নি।
বায়রার সাবেক যুগ্ম মহাসচিব মোহাম্মদ ফখরুল ইসলাম বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া সফরের পর থেকেই রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো আশাবাদী ছিল। তবে শ্রমবাজার খুলে যাওয়ার অর্থ এই নয় যে, সঙ্গে সঙ্গে কর্মী পাঠানো শুরু হবে। দুই দেশের মধ্যে কারিগরি কমিটি ও যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপের বৈঠক করতে হবে। পাশাপাশি শ্রম অভিবাসনসংক্রান্ত বিদ্যমান সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সংশোধনেরও প্রয়োজন রয়েছে।’
মাত্র দুই দিন আগে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিবের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক হয়েছে। কিন্তু সেখানে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় চালুর বিষয়ে কোনো দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়নি। তাই সম্ভাব্য কর্মীদের আপাতত কোনো রিক্রুটিং এজেন্সিতে অর্থ জমা না দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি। ইতোমধ্যে কিছু অসাধু এজেন্সি টাকা নেওয়ার চেষ্টা শুরু করেছে বলেও অভিযোগ করেন ফখরুল ইসলাম।
২০২৪ সালে শ্রমবাজার বন্ধ হওয়ার আগে কোন কোন রিক্রুটিং এজেন্সি কর্মী পাঠাতে পারবে তা মালয়েশিয়া নিজেই নির্ধারণ করত। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় সিন্ডিকেট ভেঙে দেওয়া এবং অর্থ পাচারের অভিযোগ রোধের অংশ হিসেবে এ ব্যবস্থা চালু করা হয়েছিল। তবে এবার বাংলাদেশ সরকারই সিদ্ধান্ত নেবে কোন এজেন্সিগুলো কর্মী পাঠানোর অনুমোদন পাবে।
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক বলেন, ‘ভবিষ্যতে শ্রমিক পাঠানোর ক্ষেত্রে যাতে কোনো জটিলতা না হয়, সে জন্য রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোকে বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে ভাগ করা হবে। মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত রেটিং দেখে সম্ভাব্য কর্মীরা এজেন্সি নির্বাচন করতে পারবেন।
তবে বায়রার সদস্যদের আশঙ্কা, এ ধরনের শ্রেণিবিন্যাস নতুন জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে। তারা বলছেন, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অনেক এজেন্সি মালিক দেশ ছেড়েছেন, আবার নতুন উদ্যোক্তারাও এ খাতে যুক্ত হতে চাইছেন।
বায়রার সাবেক মহাসচিব আলী হায়দার চৌধুরী বলেন, ‘এজেন্সিগুলোকে বিভিন্ন শ্রেণীতে ভাগ করা হলে জর্ডান, ব্রুনেই, সিঙ্গাপুর ও থাইল্যান্ডের মতো আবারও সিন্ডিকেট বা একচেটিয়া ব্যবস্থা গড়ে উঠতে পারে, যা শ্রমবাজারের জন্য ক্ষতিকর হবে।’
আওয়ামী লীগ সরকারের পতন, অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব পালন এবং পরে বিএনপি সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের প্রেক্ষাপটে গত প্রায় আড়াই বছর ধরে বায়রার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি। বর্তমানে সরকার নিয়োগপ্রাপ্ত একজন প্রশাসক সংগঠনটি পরিচালনা করছেন। ফলে বায়রার সঙ্গে সরকারের দূরত্বও বেড়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, মালয়েশিয়ায় স্বচ্ছ ও নির্বিঘ্নভাবে কর্মী পাঠাতে হলে নীতিগত সংস্কার, রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর পুনর্গঠন এবং সর্বোপরি সরকারের দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা প্রয়োজন।।


