‘রাজ্য’ স্বীকৃতি দেওয়ার দাবিতে ফুঁসে উঠেছে ভারতের পাহাড়ি অঞ্চল লাদাখের লাখো ছাত্র-জনতা। সংবিধানের ষষ্ঠ তফসিলের আওতাভুক্ত করে লাদাখকে পূর্ণ রাজ্যের মর্যাদার দাবি জানিয়ে বুধবার লেহতে শুরু হয় তুমুল বিক্ষোভ।
এক পর্যায়ে সেই বিক্ষোভ সহিংসতায় গড়ায়। নিরাপত্তাকর্মীদের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষে এ পর্যন্ত প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত চারজন। আহত হয়েছেন অন্তত ৭০ জন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে লাদাখে কারফিউ জারি করেছে প্রশাসন।
এনডিটিভি’র খবরে বলা হয়, তরুণ ছাত্র-জনতার ‘জেন জি’ স্টাইল বিক্ষোভের সঙ্গে নেপালের সাম্প্রতিক বিক্ষোভের মিল খুঁজে পাওয়ার দাবি জানিয়েছে কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকার। আর বিক্ষোভের পেছনে মদদদাতা হিসেবে দায়ী করা হচ্ছে লাদাখের জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব সোনাম ওয়াংচুককে।
তিনি একাধারে প্রকৌশলী, ‘স্তুপা আর্টিফিশিয়াল গ্লেসিয়ার’ নামক কৃত্রিম হিমবাহের উদ্ভাবক এবং লাদাখের আন্তঃহিমালয় অঞ্চলে ‘শিক্ষা সংস্কার’ নিয়ে কাজ করা এক পরিচিত মুখ। তার জীবনের ওপর ভিত্তি করেই নির্মিত হয় বিশ্বনন্দিত বলিউড সিনেমা ‘থ্রি ইডিয়টস’।
ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়, ‘লাদাখের অনেক নেতা উত্তেজিত ছাত্র-জনতাকে অনশন কর্মসূচি প্রত্যাহার করে ঘরে ফেরার আহ্বান জানানোর পরও সোনাম ওয়াংচুক তা চালিয়ে গেছেন।’
ওয়াংচুক আরব বসন্তের আদলে ও নেপালের জেন জি প্রজন্মের আন্দোলনে সরকার পতনের উদাহরণ টেনে মানুষকে আরও প্ররোচিত করেছেন বলেও অভিযোগ তুলেছে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সরকার।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ‘উসকানির মাধ্যমে অনশনে বসা একটি গোষ্ঠীকে রাজনৈতিক দলের কার্যালয় এবং লেহ’র প্রধান নির্বাচনি কমিশনারের কার্যালয়ে হামলা চালাতে উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে। এটিই স্পষ্ট করে, ওয়াংচুকের প্ররোচনামূলক বক্তব্যই তাদের ভিন্ন ও সহিংস পথে পরিচালিত করেছে।’
‘তরুণদের দোষারোপ করা যাবে না, তাদের বিভ্রান্ত করা হয়েছে এবং তারা বিভ্রান্ত হয়েছে। রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধির এক ষড়যন্ত্রে ফেঁসে গেছে তারা। কেন্দ্র সরকার লাদাখবাসীর কল্যাণ ও ক্ষমতায়নের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ’, বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়।
সরকারি সূত্রের দাবি, লাদাখের পরিস্থিতি এখনও নিয়ন্ত্রণের বাইরে যায়নি; বরং আরও সহিংসতা ছড়ানোর পরিকল্পনা চলছে। সংকীর্ণ রাজনৈতিক স্বার্থ ও সোনম ওয়াংচুকের ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষার কারণে লাদাখের জনগণ ‘প্রাণহানির’ মতো বিশাল মূল্য দিচ্ছে।
গত ১৫ দিন ধরে পাহাড় ও বরফে আচ্ছাদিত কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল লাদাখকে পূর্ণ রাজ্যের মর্যাদার দাবিতে অনশন শুরু করে আন্দোলনকারীরা। লাদাখ অ্যাপেক্স বডি (এলএবি) ও কারগিল ডেমোক্র্যাটিক অ্যালায়েন্স (কেডিএ) চার বছর ধরে এই দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে আসছে। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় লেহ শহর অচল করে দেওয়ার ডাক দিলে বিক্ষুব্ধদের আন্দোলনে উত্তেজনা বাড়তে থাকে।

তাদের কর্মসূচিতে বুধবার পুলিশ বাধা দিলে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে সংঘর্ষ হয়। তাদের একাংশ লাদাখ হিল কাউন্সিল অ্যাসেম্বলির হলঘরে আগুন ধরিয়ে দেয় বলে দাবি করেন লেহ’র ডেপুটি কমিশনার। প্রশাসন জানায়, ভিড়ের মধ্যে পুলিশকে লক্ষ্য করে ছোড়া পাথরের আঘাতে অন্তত ৫০ জন নিরাপত্তাকর্মী আহত হন।
এসময় বিক্ষিপ্ত আন্দোলনকারীদের শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়ে সোনম ওয়াংচুক তার ১৫ দিনের অনশন ভেঙে দেন। তিনি সামাজিক মাধ্যমে বলেন, ‘আমরা অবিলম্বে অনশন ভাঙছি… যদি আমাদের তরুণদের প্রাণ যায় তবে অনশনের উদ্দেশ্য পূরণ হয় না। এখন শান্ত মাথায় আলোচনার সময়। আমরা আন্দোলন অহিংস রাখব এবং সরকারকেও বলতে চাই শান্তির বার্তা শুনন… কারণ শান্তির বার্তা উপেক্ষা করা হলে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়।’
‘আমি লাদাখের তরুণদের অনুরোধ করছি- সহিংসতা থামান। এতে আমাদের আন্দোলনের ক্ষতি হচ্ছে এবং পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকে যাচ্ছে। আমরা লাদাখ ও দেশের অস্থিরতা চাই না’, যোগ করেন ওয়াংচুক।
তিনি আরও বলেন, ‘আজ লাদাখ ও আমার জন্য সবচেয়ে দুঃখের দিন, কারণ আমরা গত পাঁচ বছর শান্তিপূর্ণ পথ বেছে নিয়েছি… আমরা পাঁচবার অনশন করেছি, লেহ থেকে দিল্লি হেঁটে গিয়েছি, কিন্তু এখন আমরা দেখছি সহিংসতা ও অগ্নিসংযোগের কারণে শান্তির বার্তা ব্যর্থ হচ্ছে’। এসময় তিনি প্রশাসনকেও টিয়ারগ্যাস ছোড়া বন্ধ রেখে সংঘর্ষ থামানোর আহ্বান জানান।

এদিকে কেন্দ্রীয় সরকার জানিয়েছে, ইতোমধ্যে অক্টোবরের ৬ তারিখে অ্যাপেক্স বডি লেহ (এবিএল) ও কারগিল ডেমোক্র্যাটিক অ্যালায়েন্স (কেডিএ) সংসদে উত্থাপনের বিষয় নিয়ে আলোচনার জন্য একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটির বৈঠক হয়। সেখানে এবিএল প্রস্তাবিত নতুন সদস্যদেরও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। বৈঠকটি ২৫–২৬ সেপ্টেম্বর এগিয়ে আনার কথা ভাবা হচ্ছিল।
তাদের ভাষায়, ‘আলোচনার ব্যাপারে কেন্দ্র সরকার সবসময়ই প্রস্তুত ছিল। ২৫ জুলাইও এ সংক্রান্ত বৈঠক হয়েছে, তবে তাতে কমিটির পক্ষ থেকে ইতিবাচক সাড়া মেলেনি।’
সরকারি সূত্র প্রশ্ন তোলে, ‘যখন পরবর্তী আলোচনার তারিখ নির্ধারিত, তখন শান্তিপূর্ণ এলাকায় সহিংসতার উসকানি কেন দেওয়া হলো?’ তাদের অভিযোগ, ওয়াংচুক বহু আগেই লাদাখে আরব বসন্তের মতো আন্দোলনের ইঙ্গিত দিয়েছেন।
দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দাবি, উচ্চপর্যায়ের কমিটির মাধ্যমে আলোচনায় লাদাখের জনগণ বরং বেশিই লাভবান হয়েছেন। লাদাখের ‘তফসিলি উপজাতির’ জন্য সংরক্ষিত কোটা ৪৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৮৪ শতাংশ করা হয়েছে। নারীদের জন্যও এক-তৃতীয়াংশ কোটা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। সেইসঙ্গে স্থানীয় ভোটি ও পুরগি ভাষাকে সরকারি ভাষা ঘোষণা করা হয়েছে। এছাড়া ১৮শ টি পদে নিয়োগ প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে।


