কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে জমতে থাকা বিশাল পরিমাণ বর্জ্য এখন স্থানীয় পরিবেশের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। সামান্য বৃষ্টি হলেই এসব বর্জ্য ক্যাম্পের সীমানা ছাড়িয়ে ছড়িয়ে পড়ছে আশপাশের কৃষি জমি, খাল ও জলাশয়ে। প্লাস্টিক, পলিথিন এবং পচা বর্জ্যের এই দূষণ জনস্বাস্থ্যের ওপর সৃষ্টি করছে বড় ধরনের ঝুঁকি।
আসন্ন বর্ষা মৌসুমে এই পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিতে পারে বলে স্থানীয় বাসিন্দারা আশঙ্কা প্রকাশ করছেন।
ক্যাম্পগুলোতে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ বর্জ্য উৎপাদিত হলেও তার সঠিক ব্যবস্থাপনা বা অপসারণের প্রক্রিয়া অত্যন্ত অপ্রতুল। স্থানীয় কৃষক ও বাসিন্দারা বলছেন, সেখানে বর্জ্য সংরক্ষণের সঠিক ব্যবস্থা নেই। ফলে বৃষ্টির পানিতে এসব বর্জ্য ভেসে গিয়ে নিচু এলাকার কৃষি জমিতে পড়ছে। এতে মাটির উর্বরতা নষ্ট হচ্ছে এবং ফসল উৎপাদন ব্যাপকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
ক্যাম্পের বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বেশ কিছু আন্তর্জাতিক সংস্থা ও এনজিও কর্মীরা কাজ করছেন। তবে তাদের কাজের কার্যকারিতা ও সমন্বয় নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাদের মতে, মাঠ পর্যায়ে সঠিক তদারকির অভাবেই লোকালয়ে বর্জ্য ছড়িয়ে পড়ছে।
স্থানীয় কৃষক কামাল উদ্দিন বলেন, এখন তাদের জমিতে ফসলের চেয়ে প্লাস্টিক আর বর্জ্য বেশি দেখা যায়। বৃষ্টি হলেই ক্যাম্প থেকে ময়লা পানি ও বর্জ্য তাদের ক্ষেতে নেমে আসে। এতে চাষাবাদ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ছে। তিনি এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান দাবি করেন।
পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেন, এ বর্জ্য দীর্ঘমেয়াদে বাস্তুসংস্থান ও মানুষের স্বাস্থ্যের ক্ষতি করবে। পচনশীল বর্জ্য ও দূষিত পানি খাল বা পুকুরে মিশলে পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব বাড়তে পারে।
তারা মনে করেন, অবিলম্বে একটি টেকসই ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি চালু এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
অ্যাডভোকেট জসিম আজাদ বলেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বর্জ্য এখন স্থানীয় পরিবেশ ও মানুষের জীবনের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। সামান্য বৃষ্টিতেই বর্জ্যগুলো ফসলি জমি ও বসতবাড়িতে ছড়িয়ে পড়ছে। এটি কেবল পরিবেশ দূষণ নয়, বরং জনস্বাস্থ্যের জন্য চরম ঝুঁকি। এখনই জরুরি ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে বলে তিনি সতর্ক করেন।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও এই সংকট নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। রাজাপালং ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য ইঞ্জিনিয়ার হেলাল উদ্দিন বলেন, ক্যাম্পের বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘদিনের সমন্বয়হীনতা রয়েছে। বিভিন্ন সংস্থা কাজ করলেও স্থানীয়রা তার কোনো সুফল পাচ্ছে না। উল্টো বৃষ্টির সময় ময়লা ভেসে গিয়ে কৃষকদের ব্যাপক ক্ষতি করছে। বিষয়টি নিয়ে কর্তৃপক্ষের বিশেষ নজর দেওয়া প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।
পালংখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এম গফুর উদ্দিন চৌধুরী বলেন, ক্যাম্পের আশপাশের মানুষ এখন পরিবেশগত চাপের মুখে। আবাদি জমি ও নিচু এলাকায় ক্রমাগত বর্জ্য জমছে। তিনি সরকার ও দায়িত্বশীল সংস্থাগুলোর কাছে একটি স্থায়ী ও কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা গড়ে তোলার দাবি জানান।
পরিবেশের এই বিপর্যয় এখন নাফ নদী পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। স্থানীয়রা জানান, পালংখালী, থাইংখালী, থাইংখালী কাস্টমস, বালুখালী ও ঘুমধুমসহ বিভিন্ন খালের মাধ্যমে ক্যাম্পের বর্জ্য নাফ নদীতে গিয়ে মিশছে। ক্রমাগত বর্জ্য পড়ার ফলে নদীর নাব্যতা কমে যাচ্ছে এবং স্বাভাবিক পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এভাবে চলতে থাকলে নদী ভরাট হয়ে ভবিষ্যতে জলাবদ্ধতা আরও প্রকট হবে।
প্লাস্টিক ও দূষিত বর্জ্য নাফ নদীর জলজ পরিবেশকেও ধ্বংস করছে। এর ফলে মাছের প্রজনন ক্ষেত্র ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাচ্ছে দেশীয় প্রজাতির মাছের সংখ্যা। স্থানীয় জেলেরা জানান, নদীতে এখন আগের মতো মাছ পাওয়া যায় না। এতে তাদের জীবিকায় টান পড়ছে।
জেলে রশিদ আহমেদ বলেন, নাফ নদী কেবল একটি সীমান্ত নদী নয়। এটি এই অঞ্চলের জীববৈচিত্র্য ও মৎস্য সম্পদের প্রধান উৎস। রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে যদি অবিলম্বে পরিবেশবান্ধব বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা না হয়, তবে এই অঞ্চলে ভবিষ্যতে বড় ধরনের পরিবেশগত বিপর্যয় দেখা দেবে।
স্থানীয় একজন পরিবেশবিদ জানান, ক্যাম্পের প্লাস্টিক ও বর্জ্য কৃষি জমিতে ছড়িয়ে পড়ায় দীর্ঘমেয়াদে মাটির উর্বরতা শক্তি নষ্ট হতে পারে। বিঘ্নিত হতে পারে পরিবেশের ভারসাম্য।
তিনি আরও বলেন, স্থানীয় মানুষ ইতিমধ্যেই নানা রকম সমস্যায় ভুগছেন। সংশ্লিষ্ট সব সংস্থা একযোগে দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে বর্ষাকালে পরিস্থিতি চরম আকার ধারণ করবে।


