চার বছর আগে কাতারে পর্তুগাল ভক্তরা আশা করেছিলেন, অবশেষে এই অধ্যায়ের অবসান ঘটেছে। কিন্তু তা হয়নি। ২০২৬ বিশ্বকাপে এসেও একই ক্লান্তিকর বিতর্ক গ্রাস করছে এমন এক স্কোয়াডকে, যারা পুরো টুর্নামেন্ট জেতার মতো প্রতিভার অধিকারী। আর এর সবটুকুই ঘটছে কেবল একজন মানুষের কারণে, যিনি কোনোভাবে মেনে নিতে পারছেন না যে তার সময় ফুরিয়ে এসেছে।
ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোর বিপক্ষে ১-১ গোলে ড্র হওয়া ম্যাচে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর পারফরম্যান্স ছিল একেবারেই নিষ্প্রাণ। পুরো ম্যাচে মাত্র ২৯ বার বল স্পর্শ করা এবং তিনটি শটের একটিও গোলপোস্টে রাখতে না পারা কোনোভাবেই বিশ্বকাপের শুরুর একাদশে থাকা খেলোয়াড়ের পারফরম্যান্স হতে পারে না। এটি ছিল মূলত ৪১ বছর বয়সী একজন খেলোয়াড়ের কেবল নামের ওপর ভর করে টিকে থাকার প্রদর্শনী, যার খেসারত দিতে হচ্ছে সতীর্থদের।
রহস্য এটা নয় যে মানুষ কেন রোনালদোকে নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। রহস্য হলো, কোচ রবার্তো মার্তিনেজ কেন চোখের সামনে থাকা এই রূঢ় সত্যকে বারবার এড়িয়ে যাচ্ছেন।
কাতারে যখন ফার্নান্দো সান্তোস নকআউট পর্বের ম্যাচগুলো থেকে রোনালদোকে বাদ দিয়েছিলেন, তা ছিল একাধারে চমকপ্রদ ও যুক্তিযুক্ত। সেই সিদ্ধান্তের পেছনে সুনির্দিষ্ট কারণ ছিল। ৩৭ বছর বয়সী রোনালদোকে তখন গতির সাথে মানিয়ে নিতে বেশ বেগ পেতে হচ্ছিল এবং সান্তোসের সেই সাহসিকতা দেখানোর জোর ছিল। কিন্তু মার্তিনেজ এখন পর্যন্ত সেই সাহস দেখাতে পারেননি।
এর পরিবর্তে, স্প্যানিশ এই কোচ প্রতিটি সংবাদ সম্মেলনে পরিসংখ্যানের ঢাল নিয়ে হাজির হন, যেন কেবল সংখ্যা দিয়ে চোখের সামনে থাকা পারফরম্যান্সের ঘাটতি ঢেকে দেওয়া সম্ভব। গত ফেব্রুয়ারিতে মার্তিনেজ বলেছিলেন, ‘জাতীয় দলের হয়ে শেষ ৩০ ম্যাচে ২৫ গোল করা একজন খেলোয়াড় দলে থাকাটা একটা আশীর্বাদ। তিনি রোনালদোর নেশনস লিগের গোল, আল নাসরের হয়ে ঘরোয়া মৌসুমে ৩০ গোলের রেকর্ড কিংবা সর্বোচ্চ গোলদাতার খতিয়ান টেনে আনেন।
কিন্তু তিনি যা আড়াল করতে চান তা হলো, এই গোলগুলো এসেছে সৌদি প্রো লিগ থেকে, যা ইউরোপের শীর্ষ ফুটবল মানের চেয়ে বেশ কয়েক ধাপ নিচে। আর সবচেয়ে বড় সত্য হলো, ২০২১ সালের জুনের পর থেকে কোনো বড় আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে ওপেন প্লে থেকে কোনো গোল করতে পারেননি রোনালদো।
কঙ্গোর বিপক্ষে ম্যাচে যখন পর্তুগালের একটি গোলের তীব্র প্রয়োজন ছিল, তখন রোনালদো সুবিধাজনক অবস্থানে থাকা ব্রুনো ফার্নান্দেসকে পাস না দিয়ে নিজেই শট নেওয়ার চেষ্টা করেন। গোল করার কলাকৌশল জানা থিয়েরি অঁরি এই প্রসঙ্গে অকপটে বলেন, ‘দলের গোল করা প্রয়োজন, আপনার নিজের গোল করা নয়।’ এটি কেবল একটি মুহূর্তেরই নয়, বরং একটি দলগত খেলায় মানসিকতার বিচ্যুতিরই এক বড় প্রমাণ।
ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে রোনালদোর সাবেক সতীর্থ পল স্কোলস তো আরও কঠোর সমালোচনা করে বলেছেন, ‘আমার মনে হয় ৪১ বছর বয়সী একজন খেলোয়াড়ের মাঠের কেবল একটি পজিশনেই খেলা উচিত, আর সেটি হলো গোলরক্ষক।’
তবুও মার্তিনেজ তার অবস্থানে অনড়। কঙ্গোর বিপক্ষে ম্যাচে কার্যকারিতা হারানোর পরও রোনালদোকে দীর্ঘক্ষণ মাঠে রাখার সিদ্ধান্তকে একগুঁয়েমির সঙ্গে ডিফেন্ড করে তিনি বলেন, ‘যে ম্যাচে আপনার গোলের প্রয়োজন, সেখানে বিশ্ব ফুটবলের সেরা গোলদাতাকে মাঠ থেকে তুলে নেওয়ার কোনো মানে হয় না।’ মার্তিনেজের এই কথাটি হয়তো যুক্তিযুক্ত হতো যদি রোনালদো সত্যিই গোল করতে পারতেন কিংবা প্রতিপক্ষের জন্য কোনো হুমকি তৈরি করতে পারতেন।
মার্তিনেজের এমন অবিচল অবস্থান দেখে কিছু পর্তুগিজ সমর্থক এতটাই বিভ্রান্ত যে, পর্দার আড়ালের উদ্দেশ্য নিয়ে গুঞ্জন শুরু হয়েছে। বিশেষ করে, টুর্নামেন্ট শেষে আল নাসরের কোচের দায়িত্ব নেওয়ার গুঞ্জনের মুখে রোনালদোর সঙ্গে নিজের সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতেই তিনি এমনটা করছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। এটি হয়তো কেবলই অনুমান, তবে সিদ্ধান্ত যখন ফুটবলীয় যুক্তি হার মানায়, তখন মানুষ অন্য কারণ খুঁজতে বাধ্য হয়।
তবে এর জন্য যে পর্তুগালকে বড় মূল্য দিতে হচ্ছে তা অনস্বীকার্য। এবারের বিশ্বকাপে পর্তুগালের মিডফিল্ড বা মধ্যমাঠকে অন্যতম সেরা বিবেচনা করা হচ্ছে এবং তারা শিরোপার অন্যতম দাবিদার। কিন্তু দলের এই সম্ভাবনাকে ধীরে ধীরে শ্বাসরোধ করে মারছে মাঠের বাইরের এই সার্কাস, যা সামলাতে খেলোয়াড়দের প্রতিনিয়ত তৈরি থাকতে হচ্ছে।
ফুলব্যাক দিওগো দালোত স্বীকার করেছেন, ‘যখন আপনার এমন একটি স্কোয়াড থাকে, বিশেষ করে ক্রিস্টিয়ানোর মতো একজন খেলোয়াড় থাকে, তখন আমাদের স্বাভাবিকের চেয়ে কিছুটা বেশি প্রস্তুত থাকতে হয়। বিশ্বকাপের আগেই এই বিষয়ে আমাদের নিজেদের মধ্যে আলোচনা হয়েছিল যাতে আমরা যেকোনো পরিস্থিতির জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকতে পারি এবং গ্রুপ হিসেবে আমাদের সংহতি প্রকাশ করতে পারি।’
বিশ্বকাপের প্রস্তুতির মধ্যে রোনালদোর চারপাশের এই আবহ কীভাবে সামলানো যাবে তা নিয়ে আলাদা সেশন করতে হওয়াটাই বলে দেয়, দলকে কতটা মানসিক শক্তি ও সময় মাঠের বাইরের বিষয়ে অপচয় করতে হচ্ছে।
রোনালদোর বারবার দলে সুযোগ পাওয়া নিয়ে প্রশ্ন করা হলে মার্তিনেজ মাঝেমধ্যে নিজের ক্ষোভ লুকাতে পারেন না। ২০২৪ ইউরোর আগে তিনি এক সাংবাদিকের দিকেই উল্টো প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছিলেন, ‘আপনি কি জানেন গত মৌসুমে ক্রিস্টিয়ানো আল নাসরের হয়ে কত মিনিট খেলেছে?’ সাংবাদিক যখন জানান, তিনি প্রতিটি ম্যাচে শুরুর একাদশে ছিল। তখন মার্তিনেজ মৃদু হেসে বলেছিলেন, ‘আপনি আপনার প্রশ্নের উত্তর পেয়ে গেছেন।’
কিন্তু মাঠে কাটানো মিনিট আর মাঠের প্রভাব দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। আর বিশ্বকাপের মতো টুর্নামেন্টে যেখানে সামান্য ভুলেও বিদায়ঘণ্টা বেজে যেতে পারে, সেখানে কেবল অতীতের জাদুর আশায় কোনো একজন কিংবদন্তিকে এভাবে বয়ে বেড়ানো পর্তুগালের জন্য আত্মঘাতী হতে পারে।
আগামী মঙ্গলবার হিউস্টনে উজবেকিস্তানের মুখোমুখি হবে পর্তুগাল, যেখানে বড় টুর্নামেন্টে টানা ১০ ম্যাচ গোলহীন থাকার খতিয়ান নিয়ে মাঠে নামবেন রোনালদো। পারফরম্যান্সের উন্নতি না হলে এই বিতর্ক থামার নয়। দালোত ঠিকই বলেছেন যে সমস্যা যত দ্রুত সামনে আসে তত দ্রুত তা মিটিয়ে ফেলা ভালো, তবে সেটি কেবল তখনই সম্ভব যদি মার্তিনেজ সেই সাহস দেখাতে পারেন যা সান্তোস কাতারে দেখিয়েছিলেন।


