রূপবান: ঢালিউড ইন্ডাস্ট্রির প্রথম সুপারহিট

রূপবান: ঢালিউড ইন্ডাস্ট্রির প্রথম সুপারহিট
Advertisement
Advertisement

এই তো সেদিনের কথা। আবহমান বাংলায় সন্ধ্যা নামলেই শুরু হত পুঁথিপাঠ, যাত্রা, পালাগান, কবির লড়াই, গাজন, কীর্তন। কয়েক শতাব্দী ধরে বাঙালির বিনোদনের প্রধান উপাদান ছিল এগুলো। ষাটের দশকে যখন আনুষ্ঠানিকভাবে ঢালিউড ইন্ডাস্ট্রির যাত্রা শুরু হয় তখন দেশব্যাপী জনপ্রিয় হয় ‘রূপবান’ পালা। দেশের বড় বড় যাত্রা দল এ পালাটি সারাদেশে ছড়িয়ে দেয়।

তবে ১৯৬২ সালের দিকে পালাটি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর মোনায়েম খাঁ নিষিদ্ধ করেন। কিন্তু পরবর্তীতে আদালতের হস্তক্ষেপে নিষেধাজ্ঞা উঠে যায়।

তুমুল জনপ্রিয় যাত্রাপালাটি তখন সেলুলয়েডের পর্দায় তুলে আনার সিদ্ধান্ত নেন সরদার আলী ভুঁইয়া।

এ বিষয়ে চলচ্চিত্র গবেষক ও পরিচালক মীর শামসুল আলম বাবু টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘ওই সময় সরদার আলী ভুঁইয়া ও ফজলে হক মঞ্চ থেকে পালাটি অডিওতে রেকর্ড করে আনেন। এর সংলাপ লেখেন সরদার আলী ভুঁইয়া। সিনেমাটি কিন্তু প্রথমে ইবনে মিজান, আজিজ মেহর শুরু করেছিলেন। এরপর খান আতাউর রহমান শুরু করতে চেয়েছিলেন। এদের কেউই তখন আর সিনেমাটি করতে পারেনি।’

তিনি জানান, সালাউদ্দিন পরবর্তীতে সিনেমাটি প্রযোজনা করার সিদ্ধান্ত নেন। সিনেমাটি তখন ফখরুল আলম তিনদিন শুটিং করেন পরিচালক হিসেবে। কিন্তু উনি তখন জীবনঘনিষ্ঠ গল্পের সিনেমা বানাতেন। এ সিনেমার গল্প পছন্দ না হওয়ায় তিনি কাজ ছেড়ে দেন। শেষ পর্যন্ত সালাউদ্দিনের পরিচালনায় সিনেমাটি নির্মিত হয়।

১৯৬৫ সালের ৫ নভেম্বর মুক্তি পাওয়া ‘রূপবান’-কে বলা হয় বাংলাদেশের সিনে ইন্ডাস্ট্রির প্রথম সুপারহিট। চলচ্চিত্র গবেষক অনুপম হায়াৎ টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘এ সিনেমাটি ছিলো সোনার ডিম পাড়া হাঁস। এ একটি সিনেমার কারণে দেশে সিনেমা হলের সংখ্যা রাতারাতি অনেক বেড়ে গিয়েছিল।’

চলচ্চিত্র বিষয়ক লেখক দেওয়ান মাহবুবুল আলম তার এক লেখায় এভাবে বলেছেন, ‘বাংলাদেশী চলচ্চিত্র ব্যবসায়ীরা অধিক মুনাফার আশায় সারা পাকিস্তানের বাজার ধরার আশায় ঢাকাতেই নাচে-গানে ভরপুর উর্দু সিনেমা বানানোর উদ্যোগ নেন। ঢাকাতে উর্দু ভাষায় সিনেমা নির্মানে এগিয়ে আসেন এহতেশাম, মুস্তাফিজ, ফজলে দোসানী, আনিস দোসানী প্রমুখ। এরই ধারাবহিকতায় তৈরি হয় ঢাকাইয়া উর্দু সিনেমা–চান্দা, তালাশ, মালা, সংগম, তানহা, বাহানা, চকোরী ইত্যাদি। উর্দু সিনেমার দোর্দণ্ড প্রতাপে বাংলা সিনেমা পতিত হয় এক চরম সংকটে। ১৯৬৩ থেকে ১৯৬৫ সালের মধ্যে ঢাকাতে ১৪টি বাংলা সিনেমার বিপরীতে তৈরি হয় ১৮টি উর্দু সিনেমা।’

‘রূপবান’ উর্দু সিনেমার এ বাজারে ধস নামায়। অনুপম হায়াৎ বলেন, ‘ওই সময়ে আমাদের দেশে উর্দু ও হিন্দি সিনেমার ব্যাপক দাপট। “রূপবান” তখন দর্শকরা যে বাংলা সিনেমা পছন্দ করে তা প্রমাণ করে।’

আরও পড়ুন

মীর শামসুল আলম বাবুর মতে, এ সিনেমার কারণে উর্দু সিনেমা একদমই বন্ধ হয়ে গিয়েছিল— এ কথা যারা বলেন, তারা ভুল বলেন। কারণ তথ্য-উপাত্ত বলে উর্দু সিনেমা নির্মাণ আগের চেয়ে বেড়েছিল। কিন্তু যেটা হয়েছিল বাংলা সিনেমাও অনেক বেড়েছিল।’

বাবু জানান, সিনেমাটির তখনকার সময়ে ১৭টি প্রিন্ট করা হয়েছিল। যেখানে সাধারণ একটি সিনেমার প্রিন্ট হত ৪-৫টি। একই সঙ্গে বাংলা ও উর্দু দুই ভাষাতে সিনেমাটি নির্মিত হয়েছিল। উর্দু ভার্সনটি মুক্তি পায় ৫ আগস্ট ১৯৬৬ সালে।

ঐতিহ্য থেকে ২০০৬ সালে প্রকাশিত খন্দকার মাহমুদুল হাসানের ‘চলচ্চিত্র’ বইয়ে প্রখ্যাত পরিচালক সি বি জামানের সাক্ষাৎকার থেকে জানা যায়, ‘রূপবান’ ওই সময়ে ১ থেকে দেড় লাখ টাকায় নির্মিত হয়েছিল।

তবে বাবু বাজেটের অংক নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। অনুপম হায়াৎ বাজেটের অংক বলতে না পারলেও জানান, ‘রূপবান’ ওই সময়ে বাজেটের ১৪ গুণ ব্যবসা করেছিল।

কেন এত ব্যবসা?

ঢাকা, সিলেট, সাভার ও মধুপুরে চিত্রায়িত ‘রূপবান’ সিনেমা সমালোচকদের কাছে বাহবা না পেলেও ব্যাপক দর্শকনন্দিত হয়েছিল। কুষ্টিয়ার মেয়ে তন্দ্রা মজুমদার এই সিনেমার মাধ্যমে সুজাতা নামে আত্মপ্রকাশ করে ‘রূপবান’ নাম ভূমিকায় অভিনয় করেন। রূপবানে অভিনয় করে তিনি রাতারাতি খ্যাতির শীর্ষে উঠে যান এবং রূপবান কন্যা হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।

সত্য সাহা’র সংঙ্গীতে আব্দুল আলীম ও নীনা হামিদের দরদী কন্ঠে গাওয়া ‘রূপবান’ সিনেমার গান মানুষের মুখে মুখে ফিরতে থাকে। ফলে ‘রূপবান’ হয়ে ওঠে বাংলা সিনেমার ইতিহাসে প্রথম ‘সুপার হিট’ সিনেমা। উর্দু সিনেমার দাপটকে থমকে দেওয়া ‘রূপবান’ এর দর্শকপ্রিয়তায় উদ্বুদ্ধ হয়ে অনেক পরিচালকই লোককাহিনি নির্ভর সিনেমা তৈরি শুরু করেন। একে একে নির্মিত হয় ‘মধুমালা’, ‘গুনাই বিবি’, ‘মহুয়া’, ‘কাঞ্চনমালা’, ‘সাত ভাই চম্পা’, ‘বেহুলা’, ‘আলোমতি’, ‘অরুন বরুন কিরন মালা’, ‘রাখাল বন্ধু’ ইত্যাদি।

‘রূপবান’ এত ব্যবসা করার কারণ হিসেবে বাবু বলেন, ‘তখন পর্যন্ত যতগুলো বাংলা সিনেমা মুক্তি পেয়েছিলো সেগুলোর গল্প এত সহজ-সরল ছিল না। জহির রায়হানের “কখনও আসে নি” কি এখনও সাধারণ মানুষ বুঝবে? কিন্তু ‘রূপবান’-এর গল্প ছিল গ্রামীণ মানুষের মতই সহজ-সরল। তার উপর এটি ছিল জনপ্রিয় যাত্রাপালা।’

তার মতে সিনেমাটি ব্যবসা করার পেছনে আরও দুটি কারণ কাজ করেছে। সেটি হলো, লোক সংস্কৃতির প্রতি সাধারণ মানুষের টান।

তিনি বলেন, ‘এই ভালোবাসা আমাদের জিনগত। দ্বিতীয়ত, এ সিনেমা প্রচুর নারী দর্শক দেখেছেন। নারী দর্শকরা এখন হয়ত একা সিনেমা দেখতে যেতে পারেন, ওই সময়ে তা ছিল না। একজন নারী দর্শক সিনেমা হলে যাওয়া মানে তার সঙ্গে আরও অনেকে যাওয়া।’

বাবু বলেন, ‘এ সিনেমাটি দেশের বিভিন্ন মাঠে ময়দানে অস্থায়ী সিনেমা হল করে প্রদর্শিত হয়েছিল। সেখান থেকেও আয়ের বিরাট একটা অংশ এসেছিল।’

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad