শুষ্ক মৌসুম এলেই বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনে আগুনের ঝুঁকি তৈরি হয়। কেননা গত কয়েক বছরে বারবার অগ্নিকাণ্ডের মুখে পড়েছে এই বন, হুমকির মুখে পড়ছে জীব বৈচিত্র্য।
এবার তাই সুন্দরবন রক্ষায় কঠোর অবস্থান নিয়েছে বাংলাদেশ বন বিভাগ। প্রথমবারের মতো নির্দিষ্ট কয়েকটি প্রবেশপথে বিড়ি–সিগারেট ও কোনো ধরনের দাহ্য পদার্থ নিয়ে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে।
বন বিভাগ বলছে, শুষ্ক মৌসুমে একটি অসতর্ক মুহূর্তই বড় বিপর্যয় ডেকে আনে। তাই আগে ভাগেই সতর্কতা নেওয়া হচ্ছে। বাগেরহাটের শরণখোলা, মোরেলগঞ্জ ও মোংলা উপজেলার বনসংলগ্ন সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের জিউধরা, চিলা, জয়মুনি, কপিলমুনি ও কটকার প্রবেশপথ দিয়ে জেলে, বাওয়ালী ও স্থানীয় কেউ বিড়ি–সিগারেট কিংবা দাহ্য বস্তু নিয়ে ঢুকতে পারবেন না।
চাদঁপাই রেঞ্জের জিউধরা স্টেশনের বনরক্ষী মাজহারুল সরদার বলেন, আগুন লাগার বেশিরভাগ ঘটনার পেছনে মানুষের অসচেতনতা বা দুর্বৃত্তের হাত থাকে। আমরা টহল জোরদার করেছি। নিষেধাজ্ঞা অমান্য করলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
জেলার শরণখোলা উপজেলার রাজাপুরগ্রামের বাসিন্দা আবু তোয়েব বলেন, ‘সুন্দরবন আমাদের জীবন-জীবিকা।যেখান থেকে আয় না করলে সংসার চলে না। সেখানে এক শ্রেণির মানুষ ক্ষুদ্র স্বার্থের জন্য বৃহত্তম স্বার্থ নষ্ট করছে।বারবার আগুনে বন পুড়তে দেখে আমাদের কষ্ট হয়। বন বিভাগের এই উদ্যোগকে আমরা সমর্থন করি।’
গত দুই দশকে অগ্নিকাণ্ডে বড় ধরনের ক্ষতি হওয়ায় এবার প্রতিরোধে জোর দিচ্ছেন বলে জানালেন সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. রেজাউল করিম চৌধুরী।

তিনি বলেন, ‘বনসংলগ্ন এলাকায় প্রতিদিন মাইকিং ও লিফলেট বিতরণ করা হচ্ছে। স্থানীয়দের সহযোগিতা ছাড়া বন রক্ষা সম্ভব নয়। আমরা সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় আছি।’
বন বিভাগের তদন্তে আগের অগ্নিকাণ্ডগুলোর ঘটনায় একশ্রেণির স্থানীয় দুর্বৃত্ত চক্রের সংশ্লিষ্টতার তথ্য উঠে এসেছে বলেও জানান এই বন কর্মকর্তা।
তিনি বলেন, এবার যাতে এমন কোনো ঘটনা না ঘটে, সেজন্য টহল বাড়ানো হয়েছে এবং প্রবেশপথগুলোতে নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।
বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৩ বছরে ২৭ বার অগ্নিকাণ্ডে শতাধিক একর বনভূমি পুড়ে গেছে সুন্দরবন পূর্ব বিভাগে।
বিশ্বের অন্যান্য ম্যানগ্রোভ বনের তুলনায় সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য অনেক সমৃদ্ধ। এই বনে সুন্দরীসহ রয়েছে ৩৩৪ প্রজাতির গাছপালা, ১৬৫ প্রজাতির শৈবাল ও ১৩ প্রজাতির অর্কিড। বাঘ, হরিণ, কুমির, কিং কোবরা, বিলুপ্তপ্রায় ইরাবতিসহ ছয় প্রজাতির ডলফিন,৩৭৫ প্রজাতির বন্যপ্রাণী ও ২১০ প্রজাতির মৎস্যসম্পদ।
তবে একসময় এ বনে বাস করত ৪০০ প্রজাতির পাখি, যা কমতে কমতে এখন ২৭০ প্রজাতিতে দাঁড়িয়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাড়ছে সাগর-নদীর পানির উচ্চতা ও লবণাক্ততা। কমে যাচ্ছে সুন্দরবনের কম লবণসহিষ্ণু সুন্দরীসহ অন্যান্য গাছ, কমছে বন্যপ্রাণীর বিচরণ ক্ষেত্রও। একশ্রেণির জেলেসুন্দরবনের নদী-খালে বিষ দিয়ে মাছ আহরণ করায় হুমকির মুখে পড়েছে সুন্দরবনের মৎস্যভাণ্ডার। একইভাবে হত্যা করা হচ্ছে বাঘ, হরিণ, শূকরসহ অন্যান্য প্রাণী।
সুন্দরবনের টিকে থাকার ওপর দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের বেঁচে থাকা, অর্থনৈতিক অগ্রগতি, সমৃদ্ধি অনেকাংশেই নির্ভরশীল। সুন্দরবন প্রকৃতিগতভাবেই সৃষ্টি এবং প্রকৃতিই এর রক্ষক।


