তড়িঘড়ি করে ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্স দেওয়ার উদ্যোগকে ‘হঠকারিতা ও অগণতান্ত্রিক’ আখ্যা দিয়ে এর কড়া প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক অফিসার্স ওয়েলফেয়ার কাউন্সিল।
সোমবার সকালে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটির নেতারা বলেন, নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের প্রক্রিয়ায় থাকাকালে এ ধরনের নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রশাসনিক শিষ্টাচারের চরম লঙ্ঘন।
সংগঠনটি ইঙ্গিত করে বলে, বিকাশকে ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্স দেওয়ার উদ্যোগ গভর্নরের ‘স্বার্থের সংঘাত’-এর বিষয় তৈরি করতে পারে।
এর আগের দিন গভর্নর আহসান এইচ মনসুরকে দেওয়া এক চিঠিতে সংগঠনের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্স অনুমোদনসংক্রান্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পর্ষদ সভা স্থগিতের আহ্বান জানান। তবে কাউন্সিলের দাবি আমলে না নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক জরুরি পর্ষদ সভা আয়োজন করে। যদিও ওই সভায় কোনো ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্স অনুমোদন দেওয়া হয়নি।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, লাইসেন্স বিষয়ে পর্ষদকে অবহিত করা হয়েছে এবং প্রস্তাবিত তালিকায় ‘বিকাশ ডিজিটাল ব্যাংক’ দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে। সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ ব্যাংক অফিসার্স ওয়েলফেয়ার কাউন্সিল সভাপতি এ কে এম মাসুম বিল্লাহ ও সাধারণ সম্পাদক গোলাম মোস্তফা শ্রাবনসহ শীর্ষ নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলেন, ব্যাংক কোম্পানি আইন ও বিদ্যমান বিধান অনুযায়ী মালিকানা কাঠামো ও শেয়ার ধারণের বিষয় যথাযথভাবে পর্যালোচনা করা জরুরি। রাজনৈতিক অন্তর্বর্তী সময়ে বড় ধরনের নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত।
গভর্নরকে দেওয়া চিঠিতে বলা হয়, নির্বাচন-পরবর্তী রাষ্ট্রক্ষমতা পরিবর্তনের সন্ধিক্ষণে ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্স দেওয়ার উদ্দেশ্যে বোর্ড সভার আয়োজন নৈতিক ও প্রশাসনিক শিষ্টাচারের পরিপন্থী এবং তা ব্যাংক খাতে ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
চিঠিতে আরও উল্লেখ করা হয়, নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের প্রক্রিয়ায় থাকাকালে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতো সংবেদনশীল প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘমেয়াদি ও বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নেওয়া অনুচিত। নতুন সরকারের নিজস্ব অর্থনৈতিক পরিকল্পনা ও সংস্কার এজেন্ডা থাকতে পারে। এ অবস্থায় তড়িঘড়ি করে লাইসেন্স দেওয়ার সিদ্ধান্ত হঠকারিতা হিসেবে বিবেচিত হবে।
সংগঠনটির দাবি, প্রস্তাবিত লাইসেন্স যে গোষ্ঠীকে দেওয়ার উদ্যোগ চলছে, গভর্নর অতীতে সেই গোষ্ঠীর একটি ব্যাংকের চেয়ারম্যান ছিলেন। বিদ্যমান ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১ ও আন্তর্জাতিক করপোরেট গভর্ন্যান্স নীতিমালা অনুযায়ী, এ ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় তার অংশগ্রহণ ‘স্বার্থের সংঘাত’ তৈরি করতে পারে।
প্রসঙ্গত, গভর্নর আহসান এইচ মনসুর আগে ব্র্যাক ব্যাংকের চেয়ারম্যান ছিলেন। মোবাইল আর্থিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান বিকাশের মালিকানায় ব্যাংকটির অংশীদারিত্ব রয়েছে। প্রস্তাবিত বিকাশ ডিজিটাল ব্যাংকে ব্র্যাক ব্যাংক ও বিকাশ উভয়েই বিনিয়োগ করছে।
চিঠিতে আরও বলা হয়, বর্তমানে অনেক ব্যাংক তারল্য সংকট ও খেলাপি ঋণের চাপে রয়েছে। এ অবস্থায় নতুন লাইসেন্স দেওয়া ব্যাংকিং খাতের ঝুঁকি আরও বাড়াতে পারে।
নিয়মনীতি ও আইন সংশোধনের মাধ্যমে বিশেষ কোনো গোষ্ঠীর ঋণ বা অনিয়মকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা হলে তা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসনকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে বলেও সংগঠনটি উল্লেখ করে।
এসব প্রেক্ষিতে তিনটি প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক অফিসার্স ওয়েলফেয়ার কাউন্সিল। প্রস্তাবগুলো হলো-পর্ষদ সভা ও ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্স প্রদানের প্রক্রিয়া স্থগিত রাখা, নীতিমালার আলোকে নিরপেক্ষ মূল্যায়নের মাধ্যমে লাইসেন্স প্রদানের যৌক্তিকতা যাচাই করা এবং ব্যক্তিগত সংশ্লিষ্টতা রয়েছে এমন কোনো গোষ্ঠী বা প্রতিষ্ঠানের ফাইল অনুমোদন না করা।
দাবি মানা না হলে কঠোর কর্মসূচি দেওয়ারও ঘোষণা দিয়েছে সংগঠনটি।


