ভেনেজুয়েলার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে রাশিয়ার পতাকাবাহী তেলের ট্যাংকার জব্দ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। স্থানীয় সময় বুধবার সকালে আটলান্টিক মহাসাগর থেকে ‘মারিনেরা’ নামের ওই ট্যাংকার জব্দ করা হয়।
এর আগে একই দিন পানামার পতাকাবাহী ‘এম সোফিয়া’ নামের আরও একটি তেলের ট্যাংকার জব্দ করে ওয়াশিংটন।
রয়টার্সের খবরে বলা হয়, এটি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আগ্রাসী পররাষ্ট্রনীতির অংশ, যার লক্ষ্য আমেরিকা মহাদেশে অপরিশোধিত তেলের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করা এবং ভেনেজুয়েলার সমাজতান্ত্রিক সরকারকে যুক্তরাষ্ট্রের অনুগত করতে বাধ্য করা।
আটলান্টিক মহাসাগরজুড়ে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে ওই তেলবাহী জাহাজগুলোকে ধাওয়া করছিল মার্কিন কোস্টগার্ড। তাদের দাবি, গত ডিসেম্বরে ওই জাহাজে তল্লাশি চালাতে গেলে মার্কিন কোস্ট গার্ডকে বাধা দেয় জাহাজ কর্তৃপক্ষ। পরে তারা রাশিয়ার পতাকা ধারণ করে।
মারিনেরাকে আটকের ক্ষেত্রে বিশেষ সামরিক বাহিনীর সহায়তায় কোস্ট গার্ড ‘আইনগতভাবে জব্দের পরোয়ানা’ জারি করে।
মার্কিন কর্মকর্তারা জানান, ঘটনাস্থলের কাছে ওই জাহাজকে নিরাপত্তা দিতে একটি রুশ সাবমেরিন মোতায়েন করা হয়। সেই সঙ্গে কাছাকাছি অন্য জাহাজ থাকায় এই অভিযান পরিচালনায় রাশিয়ার সঙ্গে আরও উত্তেজনা সৃষ্টির ঝুঁকি তৈরি করে। ইউক্রেন যুদ্ধকে কেন্দ্র করে এরইমধ্যে রাশিয়ার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র কূটনৈতিক বিরোধে জড়িয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ফক্স নিউজকে বলেন, ‘ওটা আসলে ভুয়া রুশ তেলবাহী জাহাজ ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা এড়াতে তারা নিজেদের রাশিয়ান জাহাজ হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করেছিল।’
এর আগে বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের কোস্ট গার্ড দক্ষিণ আমেরিকার উত্তর-পূর্ব উপকূলের কাছে পানামা-পতাকাবাহী ‘এম সোফিয়া’ নামের আরেকটি ভেনেজুয়েলার তেলবাহী ট্যাংকার আটক করে।
ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি পিডিভিএসএ-এর তথ্যানুযায়ী, ট্যাংকারটি সম্পূর্ণ অপরিশোধিত তেলে ভরা ছিল। তবে মারিনেরা খালি ছিল।
যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, মারিনেরা ও এম সোফিয়া দুই জাহাজই ভেনেজুয়েলা ও ইরান থেকে তেল পরিবহনে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া ‘শ্যাডো ফ্লিটের’ অংশ (তেলবাহী নৌবহর)।
হোয়াইট হাউসের ডেপুটি চিফ অব স্টাফ স্টিফেন মিলার বলেন, ‘আমেরিকার আইন ও জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ তেল পরিবহনই একমাত্র অনুমোদিত হবে। ভেনেজুয়েলার জ্বালানি খাতেও বৈধ ও অনুমোদিত পথে বিপুল অর্থনৈতিক সম্ভাবনা রয়েছে।’
মার্কিন অ্যাটর্নি জেনারেল পাম বন্ডি বলেন, ‘মারিনেরার নাবিকরা “আতঙ্কিত হয়ে আটক এড়ানোর চেষ্টা করেছে” এবং কোস্ট গার্ডের নির্দেশ মানেনি। ফলে তাদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি অভিযোগ আনা হবে।’
গত শনিবার কারাকাসে নাটকীয় সামরিক অভিযানে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে স্ত্রীসহ আটক করে মার্কিন সেনারা। মাদক চক্রের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ এনে তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি আইনে বিচার সম্পন্ন করতে মাদুরোকে নিউইয়র্কে নেওয়া হয়।
এরপর থেকে ভেনেজুয়েলার সমুদ্রসীমা হয়ে যাতায়াতকারী এবং যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার আওতাভুক্ত দেশের জাহাজগুলোর ওপর আরও কঠোর নজরদারি শুরু করেছে ট্রাম্প প্রশাসন।
হোয়াইট হাউস জানায়, ট্রাম্প ২০১৯ সালে তার প্রথম মেয়াদে ভেনেজুয়েলার তেলে যে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিলেন, মার্কিন শর্ত মেনে নেওয়া হলে তার কিছু অংশ প্রত্যাহারের পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেন, নিষেধাজ্ঞার কারণে ভেনেজুয়েলায় আটকে থাকা সর্বোচ্চ ৫০ মিলিয়ন ব্যারেল অপরিশোধিত তেল যুক্তরাষ্ট্র নিজ উদ্যোগে পরিশোধন ও বিক্রি করবে। এটিকে বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেলের মজুত থাকা দেশের ধসে পড়া জ্বলানিখাত পুনরুদ্ধারের প্রথম ধাপ হিসেবে অভিহিত করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট রদ্রিগেজ বলেন, ‘ভেনেজুয়েলা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে জ্বালানি সহযোগিতায় উন্মুক্ত। এ বিষয়ে চুক্তি হয়েছে।’
রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী চীন ভেনেজুয়েলার অপরিশোধিত তেলের সবচেয়ে বড় ক্রেতা। ট্রাম্প প্রশাসন চীনের জন্য নির্ধারিত তেলের সরবরাহ বন্ধে ভেনেজুয়েলাকে চুক্তির চাপ দিচ্ছে এবং প্রায় দুই বিলিয়ন ডলারের অপরিশোধিত তেলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রবেশাধিকার চাইছে।
এ বিষয়ে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাও নিং বলেন, ‘ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের প্রকাশ্য বলপ্রয়োগ এবং “আমেরিকা ফার্স্ট” নীতি চাপিয়ে দেওয়া স্পষ্ট হয়রানির উদাহরণ।’


