প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস সরকারের অধীনে প্যারোল সুবিধা পাওয়া প্রথম ব্যক্তি হলেন জসিমউদ্দিন রাহমানি, যিনি জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসবাদের কয়েকটি মামলায় দণ্ডিত এক আসামি। বোনের নামাজে জানাজায় অংশ নিতে তাকে প্যারোলে মুক্তি দেয়া হয়।
২০২৪ সালের ১৪ আগস্ট সকাল ১০:৩০টায় বরগুনায় তার বোনের মৃত্যুর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই রাহমানির প্যারোল অনুমোদিত হয়। বোনের মৃত্যুর পরপরই নরসিংদীর পলাশ এলাকার নজরুল ইসলাম নামের এক ব্যক্তি রাহমানির প্যারোলের জন্য আবেদন করেন। দ্রুততার সাথে আবেদনটি মঞ্জুর হয়।
২০১৩ সালে ব্লগারদের হত্যা করতে নিজ অনুসারীদের উসকানি দেওয়ার অভিযোগে অভিযুক্ত রাহমানিকে পরের দিন সাড়ে তিন ঘণ্টার জন্য মুক্তি দেওয়া হয় এবং তাকে হেলিকপ্টারে বরগুনায় যাওয়ার অনুমতি দেয়া হয়।
তৎকালীন গাজীপুর জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আবুল ফতে মোহাম্মদ শাফিকুল ইসলামের জারি করা প্যারোল আদেশে রাহমানিকে নিরাপত্তা দেয়ার জন্য পুলিশকে নির্দেশ দেয়া হয়। আদেশে রাজনৈতিক বক্তব্য দেয়া বা রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশগ্রহণসহ কয়েকটি শর্ত আরোপ করা হয়েছিল। যদিও রাহমানি এসব বিধিনিষেধের তোয়াক্কা করেননি।
বরগুনায় পৌঁছে তিনি জানাজায় অংশ নেন এবং প্রায় আধা ঘণ্টা বক্তব্য দেন। তাকে জঙ্গি সংগঠন আন্সারুল্লাহ বাংলা টীম-এর আধ্যাত্মিক গুরু এবং একজন শীর্ষ জঙ্গি নেতা বানানোর জন্য তিনি শেখ হাসিনা সরকারের তীব্র সমালোচনা করেন। এছাড়াও রাহমানি নির্ধারিত সময়ের পরে কারাগারে ফিরে যায়। প্যারোলের এইসব শর্ত ভঙ্গের জন্য তাকে কোনো আইনগত পরিণতির মুখোমুখি হননি। এরপর ২৬ আগস্ট তিনি কারাগার থেকে জামিনে মুক্তি পান এবং অবাধে চলাফেরা করছেন।
মানবিক কারণে প্যারোল দেয়া একটি নিয়মিত আইনগত সুবিধা বলে মনে হতে পারে। কিন্তু চরমপন্থী মতাদর্শ সমর্থন ও প্রচারকারী রাহমানির মতো একজনের জন্য এই সুবিধা পাওয়া ছিল আশ্চর্যজনকভাবে সহজ। এই সুবিধা অন্য অনেক বন্দির জন্য প্রযোজ্য না।
বাংলাদেশ ছাত্রলীগ নেতা জুয়েল হাসান সাদ্দামের ক্ষেত্রে প্যারোল দেওয়া হয়নি। তিনি স্ত্রী ও একমাত্র সন্তানকে মর্মান্তিকভাবে হারালেও প্যারোল থেকে বঞ্চিত হন। তার স্বজনরা যশোরের পরিবর্তে বাগেরহাটে আবেদন করেছিলেন। মুলত এই ওজুহাতে তার প্যারলে মুক্তি নাকচ করে দেয়া হয়। ফলে তিনি জেল গেট থেকেই তার স্ত্রী ও পুত্রকে চিরবিদায় জানান।
যশোর ও বাগেরহাট উভয়ই একই দেশের অংশ এবং একই আইন কাঠামোর অধীনে পরিচালিত। মানবিক কারণে প্যারোল দেওয়ার কথা থাকলেও সাদ্দামের ক্ষেত্রে সেই নীতি উপেক্ষা করা হয়। বাগেরহাটের জেলা ম্যাজিস্ট্রেট চাইলে আবেদনটি যশোরে পাঠাতে পারতেন বা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা নিতে পারতেন।
যদি রাহমানির জন্য কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই প্যারোল আদেশ জারি করা সম্ভব হয় এবং গাজীপুর থেকে বরগুনা পর্যন্ত ২৮১ কিলোমিটার পথ হেলিকপ্টারে যাতায়াতের সুযোগ দেওয়া যায়, তবে সাদ্দামকে অন্তত পুলিশের গাড়িতে ৯৫ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে স্ত্রী ও সন্তানের শেষ বিদায় জানানোর সুযোগ দেওয়া যেত।
কিন্তু রাজনৈতিক পক্ষপাত এবং রাজনৈতিকভাবে অনুগত কর্মকর্তাদের একটি ন্যাকারজনক নজির সৃষ্টি করেছে। একই আইন ভিন্ন নাগরিকের ক্ষেত্রে ভিন্নভাবে প্রয়োগ করা হয়েছে। যদিও সংবিধানে আইনের চোখে সবাই সমতার চোখে দেয়ার প্রতিশ্রুতি রয়েছে।
আইনের প্রয়োগ ও বিচারের বেলায় রাজনৈতিক বিবেচনা ও পক্ষপাতমূলক এই প্রবণতা প্যারোলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। জামিনের ক্ষেত্রে এটা অনেক বেশি উদ্বেগজনক।
জামিন গ্রেপ্তার ব্যক্তির একটি আইনগত অধিকার হলেও আদালত বিভিন্ন বিষয় বিবেচনা করে তা প্রদান করে। রাহমানির জন্য জামিন পাওয়া ছিল সহজ। এছাড়াও তারমত শত শত আটক ব্যক্তি যেমন, রাজনীতিবিদ, দুর্ধর্ষ অপরাধী ও জঙ্গিসহ, জামিনে কারাগার থেকে বেরিয়ে আসেন। অথচ সাদ্দাম বা আরও অনেকের ক্ষেত্রে একই আইনগত উদারতা দেখানো হয়নি। জামিনের আইনগত অধিকার তাদের জন্য ছিল না।
সাদ্দাম জামিনে মুক্তি পাননি। এমনকি আদালত যখন তাকে জামিন দিলেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাকে কারাগারের ফটক থেকে তুলে নিয়ে অন্য আরেকটি মামলায় আবার কারাগারে পাঠায়। সাদ্দাম প্রথম গ্রেপ্তার হওয়ার সময় তার স্ত্রী অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন। স্বামীকে কারাগার থেকে মুক্ত করতে না পারার মানসিক আঘাত সহ্য করতে না পেরে তিনি এক বছরের শিশুপুত্রকে হত্যার পর আত্মহত্যা করেন।
প্যারোল থেকে বঞ্চিত সাদ্দাম তাদের কারাগারের ফটক থেকেই চিরবিদায় জানান। তার প্রতি বিচার ব্যবস্থা ও প্রশাসনের অমানবিক আচরণ দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করে। এমন পরিস্থিতির সোমবার সাদ্দামকে ছয় মাসের জন্য জামিন দেওয়া হয়, যা আদালতের নিরপেক্ষতা এবং বিচারক ও ম্যাজিস্ট্রেটদের বিবেক নিয়ে মানুষের মধ্যে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করেছে। প্রস্ন উঠেছে তবে কি স্ত্রী ও সন্তানকে মর্মান্তিকভাবে হারানোর পর সমালোচনার মুখে তাকে জামিন দেয়া হলো?
আইন বা বিচারের এমন দ্বিচারিতা নতুন না এদেশে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে মিথ্যা অভিযোগে আটক সাংবাদিক ও অনেক ব্যক্তি পক্ষপাতমূলক বিচারের স্বীকার হয়ে জেলে আছেন। একাধিকবার আবেদন করা সত্ত্বেও তাদেরকে জামিন দেয়া হচ্ছে না।
রাহমানির হেলিকপ্টার যাত্রা এবং সাদ্দামের বঞ্চনা একটি সত্য উন্মোচন করে, তা হচ্ছে বাংলাদেশে সুবিচার নিশ্চিত নাই, বরং এটা দরকষাকষির বিষয়। এক শ্রেণীর আদর্শিক বা রাজনৈতিক পুঁজি ধারণকারীদের জন্য আইন দ্রুত চলে, কিন্তু অন্যদের জন্য আইন স্থির হয়ে থাকে। এখানে আইনের চেয়ে আনুগত্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ এবং মানবিকতার চেয়ে ক্ষমতা বেশি প্রাধান্য পায়।


