বাংলাদেশে কয়েক দশক ধরে ক্রিকেট আর রাজনীতির অবস্থান খুব কাছাকাছি। এক সময়ের এই সাধারণ মেলামেশা এখন একটি স্থায়ী রূপ নিয়েছে। এটি কেবল কে খেলা পরিচালনা করবে তা নির্ধারণ করছে না, বরং খেলার ধরনকেও প্রভাবিত করছে। এর নেতিবাচক ফলাফল এখন আর অস্পষ্ট নেই। স্থবির হয়ে পড়া টুর্নামেন্ট, হতাশ খেলোয়াড় এবং টিকে থাকার লড়াইয়ে ধুঁকতে থাকা ঘরোয়া ক্রিকেটের মাঝেই এই চিত্র ফুটে উঠেছে।
সর্বশেষ ঘটনাপ্রবাহেও সেই একই ছাপ দেখা গেছে। সাবেক জাতীয় অধিনায়ক আমিনুল ইসলাম বুলবুলের নেতৃত্বাধীন বোর্ডকে গত ৭ এপ্রিল ভেঙে দিয়েছে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রভাবে নির্বাচনে জয়ী হওয়া এবং ক্ষমতা অপব্যবহারের অভিযোগ তদন্ত শেষে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তার বদলে সাবেক অধিনায়ক তামিম ইকবালের অধীনে ১১ সদস্যের একটি অ্যাডহক কমিটি গঠন করা হয়েছে।
তবে এই নতুন কমিটি পরিবর্তনের কোনো বিশেষ আশা দেখাতে পারছে না। বরং এটি আগের বোর্ডের সমস্যাগুলোকেই যেন আবারও সামনে নিয়ে আসছে। এই কমিটির বেশিরভাগ সদস্যের সাথে ক্ষমতাসীন দল বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতা ও মন্ত্রীদের সরাসরি যোগাযোগ রয়েছে। এমনকি তাদের অনেকেরই ক্রিকেট প্রশাসনে কাজের কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা নেই। এর মাধ্যমে এই বার্তাই পাওয়া যাচ্ছে যে, পেশাদার যোগ্যতার চেয়ে রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতাকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
নতুন এই কমিটির গঠন নিয়ে চারদিকে সমালোচনা চলছে। বিশেষ করে ক্রিকেট পরিচালনার অভিজ্ঞতার চেয়ে রাজনৈতিক পরিচয় বড় এমন ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এদের মধ্যে প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিদের সন্তান, আত্মীয় ও ঘনিষ্ঠ সহযোগীরাও রয়েছেন। বাংলাদেশের ক্রিকেট প্রশাসনে এমন নিয়োগ আগে দেখা গেলেও একটি কমিটিতেই এত বেশি রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা সবাইকে অবাক করেছে।
সবচেয়ে বড় বিষয় হলো নতুন কমিটির গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে সংশয় থাকলেও ক্রিকেট অঙ্গন থেকে তেমন কোনো জোরালো প্রতিবাদ আসেনি। এই নীরবতা থেকে বোঝা যায়, ক্রিকেটের ওপর রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণকে সবাই স্বাভাবিক হিসেবে মেনে নিয়েছে। অথবা আগের বুলবুল কমিটির চরম ব্যর্থতার কারণেই হয়তো সবাই চুপ আছে। তবে এই নীরব মেনে নেওয়া তৈরি করছে বড় ঝুঁকি। কারণ যোগ্যতার বদলে যখন আনুগত্যকে প্রাধান্য দেওয়া হয় তখন ক্রিকেটের কাঠামোগত সমস্যা সমাধানের পথ বন্ধ হয়ে যায়।
এই রাজনীতিকরণের ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে খেলোয়াড় এবং ঘরোয়া টুর্নামেন্ট। বুলবুলের বোর্ডের সময় আবাহনী ও মোহামেডানের মতো বড় ক্লাবগুলো সব টুর্নামেন্ট বর্জন করেছিল। ক্লাবগুলো বুলবুল প্রশাসনের বৈধতা মেনে নেয়নি। এর ফলাফল ছিল ভয়াবহ। দেশের প্রধান প্রতিযোগিতা ঢাকা প্রিমিয়ার লিগ মাসের পর মাস পিছিয়ে যায়। প্রথম বিভাগ ক্রিকেট লিগে দলের সংখ্যা ২০ থেকে কমিয়ে ১২ করা হয়। দ্বিতীয় বিভাগ লিগ সম্পূর্ণ বাতিল করা হয়েছে এবং তৃতীয় বিভাগের বাছাই পর্ব এখনো শুরুই হতে পারেনি।
ঢাকার ক্লাব ক্রিকেটের ওপর প্রায় এক হাজার ক্রিকেটারের জীবিকা নির্ভর করে। এই অচলাবস্থা তাদের জীবনে বড় বিপর্যয় নিয়ে এসেছে। এই টুর্নামেন্টগুলো কেবল খেলার মাঠ নয় বরং অনেক ক্রিকেটারের আয়ের একমাত্র উৎস। জাতীয় দলের খেলোয়াড় শামীম হোসেন তার হতাশা প্রকাশ করে বলেন, একটি ক্রিকেট খেলুড়ে দেশে প্রিমিয়ার লিগ না হওয়া লজ্জাজনক এবং ক্ষতিকর।
দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর আগামী ৬ মে থেকে ডিপিএল শুরুর ঘোষণা এলেও দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা ক্রিকেটের অপূরণীয় ক্ষতি করে ফেলেছে।
ক্ষতির এই প্রভাব কেবল জীবিকার মাঝেই সীমাবদ্ধ নয়। ঘরোয়া ক্রিকেট হলো বাংলাদেশের খেলোয়াড় তৈরির মূল ভিত্তি। এখান থেকেই নতুন খেলোয়াড়রা নিজেদের প্রমাণ করে উচ্চতর পর্যায়ে যাওয়ার সুযোগ পান। এই ব্যবস্থা ভেঙে পড়লে দেশের ক্রিকেটের ভবিষৎ পাইপলাইন দুর্বল হয়ে যায়। খেলোয়াড়রা ম্যাচ খেলার সুযোগ হারান এবং নির্বাচকদের পক্ষেও নতুন প্রতিভা খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। তৃণমূল পর্যায়ের এই অবনতি শেষ পর্যন্ত জাতীয় দলের ওপর প্রভাব ফেলে। কারণ একটি শক্তিশালী ঘরোয়া কাঠামো ছাড়া আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সাফল্য ধরে রাখা সম্ভব নয়।
বিসিবির রাজনীতিকরণ আসলে নতুন কোনো বিষয় নয়। বিসিবি সভাপতির পদটি দীর্ঘদিন ধরেই প্রশাসনিক দক্ষতার চেয়ে প্রভাবশালীদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। নাজমুল হাসান পাপন প্রায় ১২ বছর বোর্ড চালিয়েছেন। তিনিও রাজনৈতিক ক্ষমতার মাধ্যমেই এই নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছিলেন। একজন সংসদ সদস্য হওয়ায় তার প্রভাব ছিল অনেক গভীর। তার সময়ে ভোট জালিয়াতি, আম্পায়ারিংয়ে পক্ষপাতিত্ব এবং নির্দিষ্ট কিছু ক্লাবকে সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে বারবার। শাহরিয়ার নাফিস ও সাকিব আল হাসানের মতো খেলোয়াড়দের ঘিরে তৈরি হওয়া পরিস্থিতিগুলো তখন ঘরোয়া ক্রিকেটের বৈষম্যকেই ফুটিয়ে তুলেছিল। তবে সেই সময়েও ঘরোয়া খেলাধুলা অন্তত অনিয়মিত হয়ে পড়েনি।
এর মাঝে কিছু ব্যতিক্রম উদাহরণও আছে। ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত সাবের হোসেন চৌধুরী বিসিবি পরিচালনা করেছিলেন। তাকে এমন একজন ব্যক্তি হিসেবে দেখা হয় যিনি রাজনীতিকে ব্যবহার করে ক্রিকেটকে নিয়ন্ত্রণ নয় বরং শক্তিশালী করেছিলেন। তার আমলেই বাংলাদেশ টেস্ট মর্যাদা পায় এবং অবকাঠামোগত উন্নয়ন হয়। তার সময়টি প্রমাণ করে যে, রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা সবসময় খারাপ নয় যদি সেখানে পেশাদারিত্বের প্রতি সম্মান থাকে। সমস্যা তখনই হয় যখন উন্নয়নের চেয়ে নিয়ন্ত্রণ করাটাই বড় উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়ায়।
অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, ক্রিকেটে রাজনীতির প্রভাব এড়ানো অসম্ভব। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সাব্বির আহমেদ বলেন, বিসিবি এখন একটি বড় রাজনৈতিক অর্থনীতির অংশ যেখানে অনেক আর্থিক লেনদেন ও ক্ষমতা জড়িত। এমন পরিবেশে রাজনৈতিক শক্তিগুলো নিজেদের প্রভাব বিস্তার করতে চাইবেই।
কঠোর কোনো নীতিমালা না থাকায় এই প্রবণতা বেড়েই চলেছে। তবে বর্তমান পরিস্থিতি প্রমাণ করছে অনিয়ন্ত্রিত রাজনৈতিক প্রভাব টুর্নামেন্ট নষ্ট করে এবং পুরো কাঠামোকে দুর্বল করে দেয়।
অ্যাডহক কমিটিকে ৯০ দিনের মধ্যে নতুন নির্বাচন আয়োজনের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে তামিম ইকবালসহ কমিটির বেশ কয়েকজন সদস্য এই নির্বাচনে অংশ নেবেন। তবে এই পরিবর্তনের মাধ্যমে প্রকৃত কোনো সংস্কার হবে কি না তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। যদি রাজনৈতিক প্রভাব খাটানোর সংস্কৃতি না বদলায় তবে কেবল মানুষ বদলাবে কিন্তু পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হবে না।
একজন সাবেক বোর্ড পরিচালক আক্ষেপ করে বলেন, ক্রিকেট এখন প্রতিভা তৈরির চেয়ে ক্ষমতা প্রদর্শনের মঞ্চ হয়ে উঠেছে। এই রাজনৈতিক শৃঙ্খল থেকে মুক্ত হতে না পারলে দেশের ক্রিকেটকে ভবিষ্যতে আরও বড় মূল্য দিতে হবে।


