রাখাইন রাজ্যের এক সময়ের শান্ত সবুজ ধানক্ষেত ছিল বুথিডংয়ের রোহিঙ্গা মুসলিম জনগোষ্ঠীর বেঁচে থাকার প্রধান অবলম্বন। কিন্তু আজ তা একটি বিস্তীর্ণ কবরস্থান, যার নিচে চাপা পড়ে আছে এক নৃশংস গণহত্যার চিহ্ন। অভিযোগ উঠেছে, ২০২৪ সালের ২ মে আরাকান আর্মি (এএ) হাইয়্যার সিরি নামের গ্রামে পরিকল্পিতভাবে শত শত নিরস্ত্র বেসামরিক মানুষকে গুলি করে হত্যা করে।
১৯ মে এক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ), যেখানে ওঠে এসেছে হাইয়্যার সিরি গণহত্যার লোমহর্ষক বিবরণ।।
যুদ্ধক্ষেত্রের ভয়াবহতা পেরিয়ে বেঁচে যাওয়া মানুষেরা এখন কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আশ্রয় নিয়েছেন। সেখানে দাঁড়িয়ে তারা একে একে শুনিয়েছেন সেই নির্মমতার গল্প। প্রত্যক্ষদর্শীদের জবানবন্দি, ফরেনসিক বিশ্লেষণ এবং স্যাটেলাইটের ছবি—সব প্রমাণই ইঙ্গিত করে যে, এটি ছিল একটি সুপরিকল্পিত সহিংসতা, যা মারাত্মক যুদ্ধাপরাধের শামিল।
কয়েক মাস ধরে এই গণহত্যার স্থানটি ছিল পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন। মিয়ানমারের সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে আরাকান আর্মির অভিযানের সময় যে নৃশংসতা চলেছিল, এই স্থানটি ছিল তার এক নীরব সাক্ষী। ওমর আহমদের মতো কিছু গ্রামবাসী যখন নিজেদের জীবন বাজি রেখে হাইয়্যার সিরির সেই নির্জন ধ্বংসস্তূপে গোপনে ফিরে যান, তখন এই নির্মমতার প্রকৃত রূপ প্রকাশ পায়।

ওমর আহমদ জানান, চারদিকে কেবল কঙ্কাল আর খুলির স্তূপ পড়ে ছিল। ভেতরের মাংস অনেক আগেই পচে গেছে, কিন্তু মরদেহের গায়ে লেগে থাকা ছেঁড়া কাপড়গুলো তাদের পরিচয়ের সাক্ষ্য দিচ্ছে।
বেঁচে যাওয়া মানুষেরা সেখান থেকে যে ছবিগুলো নিয়ে এসেছিলেন, ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা সেগুলো পরীক্ষা করেছেন। তারা নিশ্চিত করেন, ভুক্তভোগীদের খুলিতে গুলির আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। বিজ্ঞানীদের এই বিশ্লেষণ প্রত্যক্ষদর্শীদের দেওয়া গণহত্যার বিবরণের সত্যতা প্রমাণ করে।
মৃত্যুকূপে বন্দি একটি জনগোষ্ঠী:
হাইয়্যার সিরি গ্রামটি বর্মী ভাষায় ‘হতান শাউক কান’ নামে পরিচিত। এর ভৌগোলিক অবস্থানের কারণেই গ্রামটিকে এই চরম ট্র্যাজেডি ভোগ করতে হয়েছে। বুথিডং-রাথেডং সড়কের পাশে অবস্থিত এই গ্রামটির উত্তর দিকে ছিল মিয়ানমার সেনাবাহিনীর ১৫তম মিলিটারি অপারেশনস কমান্ড (এমওসি-১৫) এবং দক্ষিণ-পূর্ব দিকে ছিল ৫৫১তম লাইট ইনফ্যান্ট্রি ব্যাটালিয়ন (এলআইবি-৫৫১)।
দুই পাশে সেনাবাহিনীর দুটি বড় ঘাঁটি থাকায় ঐতিহাসিকভাবে গ্রামবাসী এক ধরনের নিরাপত্তা বোধ করতেন। কারণ ২০১৭ সালের জাতিগত নিধনযজ্ঞের সময়, যখন লাখ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছিল, তখন এই গ্রামটি রক্ষা পেয়েছিল। ফলে ২০২৪ সালের এপ্রিল মাসের মধ্যে হাইয়্যার সিরি গ্রামটি একটি নিরাপদ আশ্রয়ে পরিণত হয়। জান্তা বাহিনী এবং রাখাইনের সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মির মধ্যে তীব্র লড়াই শুরু হলে বাস্তুচ্যুত শত শত মানুষ এখানে এসে আশ্রয় নেন।
তবে এই নিরাপদ আশ্রয়টি দ্রুতই একটি মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়। এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে তীব্র সেনা সংকটে পড়া মিয়ানমার সেনাবাহিনী এই গ্রামে জোরপূর্বক সেনা নিয়োগের অভিযান শুরু করে। বো জি কিয়াও মো ত নামে এক সেনা ক্যাপ্টেন আরাকান আর্মির বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য গ্রামবাসীর কাছে ‘স্বেচ্ছাসেবী’ দাবি করেন। তিনি হুমকি দেন, গ্রামবাসী রাজি না হলে পুরো গ্রাম পুড়িয়ে ছারখার করে দেওয়া হবে। বাধ্য হয়ে গ্রামের মুরুব্বিরা এক ডজন যুবককে সেনাবাহিনীর হাতে তুলে দেন।
পরবর্তীতে এই ঘটনাটিকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে আরাকান আর্মি। তারা পুরো গ্রামটিকে জান্তা বাহিনীর সহযোগী হিসেবে আখ্যা দেয়। গ্রামবাসী এক চরম উভয়সংকটে পড়েন। সেনাবাহিনী তাদের সুরক্ষার আশ্বাস দিয়ে ঘরে থাকার এবং বাঙ্কার খনন করার নির্দেশ দেয়। অন্যদিকে, আরাকান আর্মি তাদের ঘরবাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়ার জন্য হুমকি দিতে থাকে। তারা জানায়, অন্যথায় যুদ্ধের গোলাগুলির মধ্যে পড়ে তাদের মরতে হবে।

২ মে ভোরে আরাকান আর্মি যখন সেনাবাহিনীর এমওসি-১৫ ক্যাম্পটি দখল করে নেয়, তখন পিছু হটে আসা জান্তা সৈন্যরা দলে দলে গ্রামে ঢুকে পড়ে। এতে গ্রামবাসীদের মধ্যে তাৎক্ষণিক আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। নিজেদের ঘরবাড়ি যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হতে দেখে সকাল ৭টার দিকে গ্রামবাসীদের একটি বিশাল দল বুথিডং শহরের দিকে রওনা হয়। বেসামরিক নাগরিক বোঝাতে তাদের অনেকের হাতে সাদা পতাকা ছিল। তারা ভেবেছিলেন প্রধান সড়ক দিয়ে একসঙ্গে হাঁটলে সবাই তাদের সাধারণ নাগরিক হিসেবে চিনতে পারবে এবং আক্রমণ করবে না। কিন্তু বাস্তবে তারা সরাসরি একটি মারাত্মক অ্যাম্বুশ বা ওত পেতে থাকা হামলার মুখে পড়েন।
পরিকল্পিত গণহত্যার সেই সকাল:
হত্যাকাণ্ডের প্রথম ঘটনাটি ঘটে ‘তৈনল্লা মুরা’ নামে একটি ছোট পাহাড়ে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, আরাকান আর্মির একজন কমান্ডার ওয়াকিটকিতে কথা বলার পর একটি রিভলভার দিয়ে প্রথম গুলি চালান। এটি ছিল তার যোদ্ধাদের জন্য একটি সংকেত। সংকেত পাওয়া মাত্রই চারপাশ থেকে যোদ্ধারা পুরুষ, নারী ও শিশুদের ওপর নির্বিচারে গুলি বর্ষণ শুরু করে। চারদিকে চরম বিশৃঙ্খলা ও চিৎকার শুরু হয়। মানুষের ভিড়ের ওপর বৃষ্টির মতো গুলি এসে পড়তে থাকে।
কবির আহমেদ নামের এক ব্যক্তি তার পরিবার নিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি চোখের সামনে নিজের পুরো পরিবারকে হারানোর যন্ত্রণাদায়ক বর্ণনা দেন। তার ছেলেকে পরপর চারটি গুলি করা হয়। এরপর তার স্ত্রী ও দুই ছোট মেয়েকে মাত্র পাঁচ ফুট দূর থেকে সরাসরি বুকে গুলি করা হয়। মৃত্যুর শেষ মুহূর্তে তার স্ত্রী কবিরের হাতে কিছু টাকা গুঁজে দিয়ে ফিসফিস করে তাকে পালিয়ে যাওয়ার অনুরোধ করেছিলেন।
তৈনল্লা মুরার প্রাথমিক আক্রমণ থেকে যারা বেঁচে যান, তারা গ্রামে বা আশেপাশের ধানক্ষেতে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু তারা জানতেন না যে আরাকান আর্মি ততক্ষণে ‘বড় পাড়া’ ও ‘ফাতাইল্লা পাড়া’ গ্রাম দুটিকে চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলেছে। ফাতাইল্লা পাড়ার একটি মসজিদের কাছে যোদ্ধারা পালিয়ে যাওয়া মানুষদের ধরে এনে লাইনে দাঁড় করায়। এরপর তাদের হাঁটু গেঁড়ে বসতে বা মাথা নিচু করতে বাধ্য করে একে একে গুলি করে হত্যা করে।
রাশিদা খাতুন নামের এক নারী চারবার গুলিবিদ্ধ হয়েও অলৌকিকভাবে বেঁচে যান। তিনি একটি লাশের স্তূপের মধ্যে প্রায় ৩০ মিনিট মৃত সেজে পড়েছিলেন। তিনি দেখছিলেন কীভাবে আরাকান আর্মির এক যোদ্ধা বন্দুকের নল দিয়ে গুঁতো মেরে দেখছিল কেউ বেঁচে আছে কি না। এমনকি সেই যোদ্ধা রাশিদার মাথায়ও আঘাত করেছিল। পরে রাশিদা একটি বাঙ্কারের কাছে তার সন্তানদের মরদেহ খুঁজে পান। কেবল হাড়ের সঙ্গে লেগে থাকা কাপড় দেখে তিনি নিজের সন্তানদের শনাক্ত করতে পেরেছিলেন।
যদিও আরাকান আর্মি এই গণহত্যার কথা আনুষ্ঠানিকভাবে অস্বীকার করেছে। তাদের দাবি, তারা কেবল সেনা সদস্য এবং সশস্ত্র যোদ্ধাদের হত্যা করেছে। তবে হিউম্যান রাইটস ওয়াচের সংগ্রহ করা প্রমাণ বলছে সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা।
স্যাটেলাইটের ছবিতে দেখা গেছে, গ্রামটি দখলের পর হাইয়্যার সিরির প্রায় পুরো অংশ পুড়িয়ে ছাই করে দেওয়া হয়েছে। এমনকি আরাকান আর্মি পুরো নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পরও সেখানে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। ধারণা করা হচ্ছে, এই গণহত্যায় কমপক্ষে ১৭০ জন নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে অন্তত ৯০ জন শিশু। তবে রোহিঙ্গা অধিকারকর্মীদের আশঙ্কা, নিহতের প্রকৃত সংখ্যা ৫০০ ছাড়িয়ে যেতে পারে।
জোরজুলুম ও সত্য গোপনের কৌশল:
রক্তবন্যার পর বেঁচে যাওয়া মানুষদের ওপর শুরু হয় এক সুপরিকল্পিত দমনপীড়ন, যার উদ্দেশ্য ছিল সত্যকে পুরোপুরি মুছে ফেলা। পালিয়ে যাওয়ার সময় অনেককে আরাকান আর্মির যোদ্ধারা আটকে দেয়, তাদের মূল্যবান জিনিসপত্র কেড়ে নেয় এবং নিজেদের জিম্মায় নিয়ে নেয়। পরবর্তীতে আরাকান আর্মি ‘নাসর পাড়া’ নামক স্থানে একটি অস্থায়ী ক্যাম্প তৈরি করে। সেখানে বর্তমানে প্রায় ৭০০ জন বেঁচে যাওয়া মানুষকে সার্বক্ষণিক সশস্ত্র নজরদারিতে বন্দি রাখা হয়েছে। বন্দিরা এই ক্যাম্পটিকে একটি ‘মৃত্যুফাঁদ’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। সেখানে তাদের দিয়ে জোরপূর্বক বিনা মজুরিতে লুট করে আনা গবাদিপশুর যত্ন নেওয়াসহ বিভিন্ন কাজ করানো হয়। তাদেরকে পর্যাপ্ত খাবার, পানি বা চিকিৎসা সেবাও দেওয়া হয় না।

আন্তর্জাতিক মহলের ক্রমবর্ধমান সমালোচনা ও তদন্ত এড়াতে আরাকান আর্মি এক অভিনব কৌশল নিয়েছে। তারা গণমাধ্যমকে দেখানোর জন্য সাজানো সফরের আয়োজন করছে। বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিরা অভিযোগ করেন, তাদের আগে থেকেই শিখিয়ে দেওয়া হয়েছিল কী বলতে হবে। আরাকান আর্মির পক্ষে মিথ্যা সাক্ষ্য না দিলে তাদের মেরে ফেলার হুমকিও দেওয়া হয়। এমন একটি ঘটনায়, গণহত্যার হাত থেকে বেঁচে যাওয়া এক গ্রাম প্রশাসককে ক্যামেরার সামনে আসতে বাধ্য করা হয়। তাকে একটি লিখিত স্ক্রিপ্ট মুখস্থ বলতে বলা হয়, যেখানে লেখা ছিল যে আরাকান আর্মি আসলে গ্রামবাসীদের সাহায্য করেছে।
আরাকান আর্মির রাজনৈতিক শাখা ‘ইউনাইটেড লিগ অব আরাকান’ (ইউএলএ) এই মিথ্যা প্রচারণাকে আরও জোরদার করছে। তারা ক্রমাগত দাবি করে আসছে, তাদের বাহিনী জেনেভা কনভেনশন বা আন্তর্জাতিক যুদ্ধ নীতি কঠোরভাবে মেনে চলেছে।
তবে হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্রতিবেদনে আইনি বিশ্লেষণটি অত্যন্ত স্পষ্ট ও কঠোর। বেসামরিক নাগরিকদের লক্ষ্যবস্তু করা, বন্দি ব্যক্তিদের হত্যা করা এবং মানুষকে জোরপূর্বক অমানবিক পরিস্থিতিতে স্থানান্তর করা আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন। মিয়ানমার সামরিক জান্তা এবং আরাকান আর্মি—উভয় পক্ষের বিরুদ্ধেই বেসামরিক নাগরিকদের রক্ষা করতে ব্যর্থতার অভিযোগ আনা হয়েছে। জান্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে গ্রামটিকে মানবঢাল হিসেবে ব্যবহার করার এবং আরাকান আর্মির বিরুদ্ধে ঠান্ডা মাথায় মানুষ হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে।
মিয়ানমারের এই সামগ্রিক সংকট নিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) এবং আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার আদালত (আইসিজে) তাদের তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে। এরই মধ্যে হাইয়্যার সিরির এই নির্মমতা বিশ্বকে মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, রোহিঙ্গারা এখনও কতটা বিপদের মধ্যে রয়েছে।
যারা কোনোমতে বাংলাদেশে পালিয়ে এসে নিরাপত্তা পেয়েছেন, তাদের কাছে ন্যায়ের লড়াইটা অত্যন্ত কঠিন। কারণ এখানে তাদের ঘিঞ্জি শিবিরের নির্মম বাস্তবতা আর জোরপূর্বক নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর আশঙ্কার মধ্যে দিন কাটাতে হচ্ছে—এমন এক দেশে, যেখানে এখনও তাদের শিকার করা হয়।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে অপরাধীদের জবাবদিহিতার আওতায় আনার দাবি জরুরি আবেদন জানিয়ে প্রতিবেদন শেষ করেছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ। এতে রোহিঙ্গাদের ‘নিরাপদ, টেকসই ও মর্যাদাপূর্ণ’ প্রত্যাবর্তনকে কোনো কূটনৈতিক আনুষ্ঠানিকতা না বানিয়ে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।


