যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান সংঘাতের জেরে হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচলে অবরোধ দিলেও এখন পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ দিয়ে তেলবাহী ট্যাংকারসহ প্রায় ৯০টি জাহাজ পার হয়েছে। তথ্য বলছে, এই পথ দিয়েই ব্যারেল ব্যারেল তেল রপ্তানি করেছে ইরান।
সামুদ্রিক ও বাণিজ্য তথ্যভিত্তিক প্ল্যাটফর্মগুলোর তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধ পরিস্থিতিতেও লাখ লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানি করছে ইরান।
লয়েডস লিস্ট ইন্টেলিজেন্স জানিয়েছে, প্রণালীর মধ্য দিয়ে যাওয়া অনেক জাহাজ পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা ও নজরদারি এড়িয়ে চলেছে। তবে এসব জাহাজের অনেকগুলোর সঙ্গে ইরানের যোগসূত্র থাকতে পারে। সাম্প্রতিক সময়ে ভারত ও পাকিস্তানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কিছু জাহাজও আলোচনার মাধ্যমে নিরাপদে এই নৌপথ পার করেছে।
যুদ্ধ শুরুর পর তেলের দাম বেড়ে প্রতি ব্যারেল ১০০ ডলারের ওপরে উঠেছে। হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একটি আন্তর্জাতিক নৌজোট গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এতে করে হরমুজ প্রণালী আর কোনো দেশের জন্য হুমকি হয়ে থাকবে না বলে দাবি করেন তিনি।
বিশ্বের মোট অপরিশোধিত তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ সরবরাহ হয় এই প্রণালী দিয়ে। তবে মার্চের শুরুতে যুদ্ধ শুরুর পর অধিকাংশ জাহাজের চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এছাড়া এখন পর্যন্ত অন্তত ২০টি জাহাজ হামলার শিকার হয়েছে।
তথ্য বিশ্লেষণ সংস্থা কেপলার জানিয়েছে, মার্চ মাসের শুরু থেকে ইরান ১ কোটি ৬০ লাখ ব্যারেলের বেশি তেল রপ্তানি করতে সক্ষম হয়েছে। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে ঝুঁকি থাকায় চীনই ইরানি তেলের সবচেয়ে বড় ক্রেতা। কেপলারের বিশ্লেষক আনা সুবাসিচ বলেন, ইরানের তেল রপ্তানিতে এখনো ‘অবিচল সক্ষমতা’ দেখা যাচ্ছে।
রেডাল নামের পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা কুন কাও বলেছেন, ইরান হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ ব্যবহার করে নিজের তেল রপ্তানির পথ সচল রাখার পাশাপাশি মুনাফাও করছে।
চলতি মাসের ১ থেকে ১৫ তারিখের মধ্যে অন্তত ৮৯টি জাহাজ হরমুজ প্রণালী পার হয়েছে, যার মধ্যে ১৬টি ছিল তেলবাহী ট্যাংকার। যুদ্ধের আগে প্রতিদিন ১০০ থেকে ১৩৫টি জাহাজ চলাচল করত, এখন সেই সংখ্যা অনেক কমে গেছে। ধারণা করা হচ্ছে, এসব জাহাজের এক-পঞ্চমাংশের বেশি ইরান সংশ্লিষ্ট এবং বাকিগুলোর মধ্যে চীন ও গ্রিস সংশ্লিষ্ট জাহাজ রয়েছে।
পাকিস্তান বন্দর কর্তৃপক্ষের এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, পাকিস্তানের পতাকাবাহী তেলবাহী জাহাজ ‘করাচি’ সম্প্রতি এই প্রণালী পাড়ি দিয়েছে। সরাসরি রুট উল্লেখ না করলেও জাহাজটি নিরাপদে পাকিস্তানে পৌঁছাবে বলে নিশ্চিত করেছেন তিনি।
ভারতের শিপিং করপোরেশনের মালিকানাধীন এলপিজি বহনকারী ‘শিবালিক’ ও ‘নন্দা দেবী’ নামের দুটি জাহাজও চলতি মাসের মাঝামাঝি সময়ে এই পথ অতিক্রম করেছে। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. জয়শঙ্কর জানিয়েছেন, ইরানের সঙ্গে আলোচনার ফলে এসব জাহাজ চলাচল করতে পেরেছে।
ইরাকের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থার খবরে বলা হয়েছে, হরমুজ প্রণালী দিয়ে ইরাকের তেলবাহী ট্যাংকার চলাচলের অনুমতি পেতে ইরান সরকারের সঙ্গে আলোচনা করছে দেশটি।
আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক (নৌপরিবহন) সংবাদ ও তথ্য সেবা প্রতিষ্ঠান লয়েডস লিস্টের প্রধান সম্পাদক রিচার্ড মীড জানিয়েছেন, কিছু জাহাজ কূটনৈতিক সহায়তার মাধ্যমে প্রণালী অতিক্রম করছে। তার মতে, ইরান সম্ভবত নিজ উপকূলের কাছাকাছি একটি ‘নিরাপদ করিডর’ তৈরি করেছে, যেখানে কিছু জাহাজ ইরানের উপকূল ঘেঁষে চলাচল করছে।
কিছু জাহাজ নিজেদের চীন-সংযুক্ত বা চীনা নাবিক বহনকারী হিসেবে পরিচয় দিচ্ছে, যাতে হামলার ঝুঁকি কমানো যায়। বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের সঙ্গে চীনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের সুযোগ নেওয়ার জন্য এই কৌশল নেওয়া হচ্ছে।
যুদ্ধ শুরুর পর থেকে তেলের দাম ৪০ শতাংশের বেশি বেড়ে গেছে। এ সময় যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও তাদের মিত্রদের উদ্দেশে কোনো তেল যেতে দেওয়া হবে না বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরান।
তবে তেলের বাজার স্থিতিশীল রাখতে ইরানি তেলবাহী জাহাজকে প্রণালী অতিক্রম করতে দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট বলেছেন, ‘বিশ্বে তেল সরবরাহ বজায় রাখতে ইরানের জাহাজগুলোকে বের হতে দেওয়া হয়েছে।’
যুক্তরাষ্ট্র ইরানের উপকূলের কাছে খার্গ দ্বীপে সামরিক স্থাপনায় হামলা চালালেও দেশটির তেল অবকাঠামো আপাতত অক্ষত রয়েছে বলে জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প।
বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালী পুরোপুরি বন্ধ নয়; বরং নির্দিষ্ট কিছু জাহাজ চলাচল করতে দিচ্ছে ইরান। কুন কাও বলেন, এটি ‘সম্পূর্ণ বন্ধ’ নয়, বরং নির্দিষ্ট কিছু জাহাজের জন্য সীমিতভাবে চালু রাখা হয়েছে।
ডাচ ব্যাংক আইএনজির বিশ্লেষকদের মতে, যদি ইরানের লক্ষ্য তেলের দাম বাড়িয়ে চাপ সৃষ্টি করা হয়, তাহলে তারা প্রণালী দিয়ে খুব সীমিত সংখ্যক ট্যাংকার চলাচলের অনুমতি দেবে।


