যুক্তিসংগত সময়ে হবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে যে জাতীয় সংসদ গঠিত হবে সেখানেই সংবিধানের প্রয়োজনীয় সংস্কার করা হবে।
প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের পাঠ করা বহুল আলোচিত ‘জুলাই ঘোষণাপত্র’ থেকে এমন প্রতিশ্রুতিই এল।
মঙ্গলবার বিকাল সাড়ে ৫টার দিকে জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় নির্মিত মঞ্চ থেকে এই ঘোষণাপত্র পাঠ করেন প্রধান উপদেষ্টা। এ সময় গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টির মধ্যেই তার পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা। যাদের মধ্যে ছিলেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না, এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের নায়েবে আমির মুফতি ফয়জুল করিমসহ অন্যরা।
বৃষ্টির মধ্যে ঘোষণাপত্র পড়তে শুরু করার আগে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘আজ দেশের নেতৃবৃন্দকে সঙ্গে নিয়ে জাতির গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করতে আমরা এসেছি। আল্লাহ তার জন্য আমাদের ওপর রহমত বর্ষণ করছেন।’
এরপর লিখিত ঘোষণাপত্র পড়ে শোনান মুহাম্মদ ইউনূস। যেখানে তুলে ধরেন মোট ২৮টি অনুচ্ছেদ। এই ঘোষণাপত্রের শুরুর অংশটুকু অনেকটাই বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের আদলে লেখা।

শুরুতে বিগত সরকারের আমলের নানা দুর্নীতি, অনিয়ম, স্বেচ্ছাচারিতার প্রসঙ্গ আসে। এরপর আসে ভবিষ্যতের কথা।
ঘোষণাপত্রে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘বাংলাদেশের জনগণ যুক্তিসংগত সময়ে আয়োজিতব্য অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ একটি নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত জাতীয় সংসদে প্রতিশ্রুত প্রয়োজনীয় সাংবিধানিক সংস্কারের মাধ্যমে দেশের মানুষের প্রত্যাশা, বিশেষত তরুণ প্রজন্মের আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী আইনের শাসন ও মানবাধিকার, দুর্নীতি, শোষণমুক্ত, বৈষম্যহীন ও মূল্যবোধসম্পন্ন সমাজ এবং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার অভিপ্রায় ব্যক্ত করছে।’
বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে প্রত্যাশা করা হয়েছিল, এই ঘোষণাপত্রে নির্বাচনের সুস্পষ্ট সময় প্রকাশ করা হবে।
সকালেই নোয়াখালীতে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও সাবেক বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ জয়নুল আবদিন ফারুক প্রধান উপদেষ্টার উদ্দেশে বলেন, ‘আপনাকে আমরা পছন্দ করি। কিন্তু কারও কথায় নির্বাচন নিয়ে টালবাহানা করবেন না। বিনয়ের সঙ্গে অনুরোধ করব, আজকেই নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করুন।‘
কিন্তু সে ঘোষণা আসেনি। বরং বলা হয়েছে, যুক্তিসংগত সময়ে আয়োজন করা হবে আগামী নির্বাচন।
একইভাবে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দেওয়া ছাত্রনেতাদের সমম্বয়ে গড়ে ওঠা দল এনসিপির দাবি ছিল সংবিধান সংশোধন এবং তা অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেই।

রোববার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে আয়োজিত ইশতেহার ঘোষণার অনুষ্ঠানেও এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেছেন, নতুন সংবিধানের কথা। বাংলাদেশের সংবিধানকে ‘মুজিববাদী’ আখ্যা দিয়ে, শুরু থেকেই তারা এটি পরিবর্তনের দাবি জানিয়ে আসছিলেন।
তবে জুলাই ঘোষণাপত্র অনুযায়ী, জনগণের নির্বাচিত জাতীয় সংসদেই সংবিধানের প্রয়োজনীয় সংস্কার করার কথা বলা হয়েছে।
সেখানে এটাও বলা হয়েছে যে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে সাংবিধানিক স্বীকৃতিও দেওয়া হবে।
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘বাংলাদেশের জনগণ এই অভিপ্রায় ব্যক্ত করছে যে, ছাত্র-গণঅভ্যুত্থান ২০২৪-এর উপযুক্ত রাষ্ট্রীয় ও সাংবিধানিক স্বীকৃতি প্রদান করা হবে এবং পরবর্তী নির্বাচনে নির্বাচিত সরকারের সংস্কারকৃত সংবিধানের তফসিলে এ ঘোষণাপত্র সন্নিবেশিত থাকবে।’
পাশাপাশি ঘোষণাপত্রে জুলাই গনঅভ্যুত্থানের সকল শহীদদের জাতীয় বীর হিসেবে ঘোষণা করে শহীদদের পরিবার, আহত যোদ্ধা এবং আন্দোলনকারী ছাত্রজনতাকে প্রয়োজনীয় সকল আইনি সুরক্ষা দেওয়ার অভিপ্রায়ও ব্যক্ত করা হয়েছে।
ঘোষণাপত্র পাঠ শেষে হলে মঞ্চে উপস্থিত অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাদের সঙ্গে হাত মেলান ও কোলাকুলি করেন প্রধান উপদেষ্টা।
পূর্ণাঙ্গ ঘোষণাপত্রটি দেখুন এখানে: জুলাই ঘোষণাপত্র


