যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো নতুন হুমকির ‘বিধ্বংসী’ জবাব দেওয়া হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরান। দেশটির সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান মেজর জেনারেল আলী আবদোল্লাহি শুক্রবার এক বার্তায় বলেন, ‘ইরানকে কোণঠাসা করা হলে ইসলামি প্রজাতন্ত্রটি ব্যাপক ও চূড়ান্ত প্রতিক্রিয়া দেখাবে।’
ইরানের নেতৃত্বকে ক্ষমতাচ্যুত করার লক্ষ্য নিয়ে গত বুধবার ইতিহাসের সবচেয়ে কঠোর আর্থিক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা আরোপ ও আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতার হুমকি দেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি সতর্ক করে বলেন, ইরানকে ‘যেকোনো ধরনের সহায়তা’ দেওয়া দেশের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্টও জানিয়েছেন, তেহরানের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত নতুন নিষেধাজ্ঞার বিস্তারিত তিনি সোমবার প্রকাশ করবেন। তিনি বলেন, ‘আমরা এই (ইরানের) শাসনব্যবস্থাকে ধসিয়ে দেব।’
এসব মার্কিন হুমকির জবাবে এবার হুঁশিয়ারি দিলেন ইরানি সেনাপ্রধান।
ইরানি বার্তা সংস্থা ইরনার বরাতে রয়টার্সের খবরে বলা হয়, আবদোল্লাহি বলেন, ‘স্থল, সমুদ্র, আকাশ, আকাশ প্রতিরক্ষা ও সাইবার পরিসরে পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী কঠোর, শাস্তিমূলক ও বিধ্বংসী প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে শত্রুর নতুন হুমকির জবাব দেবে।’
ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে চলা আলোচনায় দেশটির প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ বলেছেন, ‘ওয়াশিংটন সম্ভবত এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে যে সরাসরি সামরিক সংঘাতে তারা জয়ী হতে পারবে না। কাজেই অন্যায্য নিষেধাজ্ঞা মোকাবিলায় আমাদের পরিকল্পনা করতে হবে, যাতে আমরা সেগুলো কাটিয়ে উঠতে পারি।’
অবশ্য বৃহস্পতিবার রাতে ইরাকে অবস্থানকালে ইরানি ও ইরাকি ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলার সময় তেহরানের অর্থনীতির ওপর তৈরি হওয়া চাপের কথাও স্বীকার করেন গালিবাফ।
সরকারি বার্তা সংস্থা ইরনার বরাতে গালিবাফ বলেন, ‘আমাদের যত সামরিক শক্তিই থাকুক না কেন, মানুষ যদি ক্ষুধার্ত থাকে এবং আমাদের আর্থিক লেনদেন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও জাতীয় উৎপাদন না থাকে, তাহলে আমরা টিকে থাকতে পারব না।’
বিশ্লেষকদের মতে, গত প্রায় ছয় মাসের যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ইরানের অর্থনীতি এবং সামরিক সক্ষমতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে তেহরান এখনো এমন পরিমাণ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা ধরে রেখেছে, যার মাধ্যমে হরমুজ প্রণালিতে তেলবাহী জাহাজ চলাচলে বাধা সৃষ্টি এবং আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের ওপর হামলা চালানো সম্ভব।
অন্যদিকে যুদ্ধের শুরুতে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ভেঙে দেওয়া এবং দেশটির ধর্মীয় শাসকদের উৎখাতে ইরানিদের জন্য অনুকূল পরিস্থিতি সৃষ্টি করাসহ ট্রাম্প যেসব লক্ষ্য ঘোষণা করেছিলেন, সেগুলোরও এখনো বাস্তবায়ন হয়নি।
কেবল তাই নয়, যুদ্ধের মেয়াদ ছয় মাসের কাছাকাছি হয়ে এলেও এখনো কোনো পক্ষ নিশ্চিত বিজয় অর্জন করেনি। ওয়াশিংটন ও তেহরান দুই পক্ষই নিজেদের যুদ্ধে জয়ী বলে দাবি করছে এবং পরস্পরবিরোধী ও আক্রমণাত্মক বক্তব্য তুলে ধরছে।
বিশ্বজুড়ে অজনপ্রিয় এই যুদ্ধের কারণে জ্বালানির দাম বেড়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তার ওপরও। চলতি সপ্তাহে রয়টার্স ও ইপসোসের এক জনমত জরিপে দেখা গেছে, তার বর্তমান মেয়াদের জনপ্রিয়তা সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে গেছে।
ইরানের বাণিজ্য অংশীদারদের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার হুমকি দেওয়ার পর শুক্রবার আন্তর্জাতিক ও যুক্তরাষ্ট্রের অপরিশোধিত তেলের ভবিষ্যৎ সরবরাহমূল্য বেড়েছে। এতে আগামী কয়েক সপ্তাহে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ আরও সংকুচিত হতে পারে বলে শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর প্রায় ৫০ বছর ধরে ইরান প্রায় অব্যাহত অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার মধ্যে রয়েছে। তবে বর্তমানে দেশটির মানুষ উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দুর্বল হয়ে পড়া মুদ্রা, জ্বালানি সংকট এবং ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামোর কারণে ভোগান্তিতে রয়েছেন।
আরও কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হলে এর প্রভাব আন্তর্জাতিক পরিসরেও ছড়িয়ে পড়তে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
কেপলারের ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, ইরানের জাহাজে করে রপ্তানি করা তেলের ৮০ শতাংশের বেশি কিনে থাকে চীন। কাজেই যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা তাদের ওপরও কার্যকরের সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে বেইজিংয়ের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র আরও অর্থনৈতিক চাপ বাড়ালে পাল্টা প্রতিক্রিয়ার ঝুঁকি রয়েছে। ওয়াশিংটনে চীনা দূতাবাস বলেছে, ‘নিষেধাজ্ঞা ও চাপ সমস্যা সমাধানে সহায়তা করে না।’ বরং তারা আলোচনার মাধ্যমে কূটনৈতিক সমাধানের আহ্বান জানিয়েছে।


