হেমন্তকাল মানেই কৃষকের মুখে হাসি আর মাঠের পর মাঠ জুড়ে শুধু পাকা ধান কাটা আর মাড়াইয়ের ব্যস্ততা। এই ধান শুধু কৃষকের জন্যই আশীর্বাদ নয় বরং এক মৌসুমে ভালো ফলন ঘুরিয়ে দিতে পারে দেশের অর্থনীতির চাকা।
হেমন্তের এই সময়টাতে প্রাণ ফিরে পান রাজবাড়ী জেলার কৃষকেরা। কৃষি বিভাগের হিসেব বলছে, চলতি মৌসুমে রাজবাড়ীতে প্রায় ৭৭৬ কোটি টাকার আমান ধানের বাণিজ্য হবে।
রাজবাড়ী জেলার পাঁচটি উপজেলায় এ বছর আমন ধানের বাম্পার ফলন হয়েছে। জেলা জুড়ে রোপা ও বোনা আমন আবাদ হয়েছে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে। ২০২৫-২৬ অর্থ বছরে রাজবাড়ী জেলায় ৫২ হাজার ৪৪৫ হেক্টর জমিতে আমন ধানের আবাদ হয়েছে।
চলতি বছর আবহাওয়া অনূকূলে থাকায় প্রতি হেক্টর জমিতে প্রায় পাঁচ মেট্রিক টন ধানের উৎপাদন হয়েছে। প্রতি মণ ধান বাজারে ১২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তবে কৃষকদের দাবি ধানের দাম বাড়লে উৎপাদন খরচ বাদে কিছুটা লাভের মুখ দেখবেন তারা।
কৃষি বিভাগ জানায়, রাজবাড়ীতে এ বছর ৫২ হাজার ৪৪৫ হেক্টর জমিতে আমন ধানের আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে রাজবাড়ী সদরে ১৪ হাজার ৮৫০ হেক্টর, গোয়ালন্দে দুই হাজার ৫৮৫ হেক্টর, বালিয়াকান্দিতে ১৩ হাজার, কালুখালীতে আট হাজার ৫০০ হেক্টর ও পাংশা উপজেলায় ১৩ হাজার ৫১০ হেক্টর জমিতে প্রায় দেড় লাখ কৃষক আমন ধানের আবাদ করেছেন। এতে দুই লাখ ৫৮ হাজার ৮৫৫ মেট্রিক টন ধান উৎপাদন হবে। যা থেকে এক লাখ ৭২ হাজার ৫৭০ মেট্রিক টন চাল উৎপাদের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে।
কালুখালী উপজেলার কৃষক হাবিব খান বলেন, ‘এ বছর আমি সাত পাকি ( এক পাকি অর্থ ২৬ শতাংশ) আমন ধান চাষ করেছি। আল্লাহর রহমতে ফলন ভালো হয়েছে। আট শতাংশে পাঁচ মণের মত ফলন পাচ্ছি। শ্রাবণ মাসে চারা লাগিয়েছিলাম। ১২০ দিন লাগে ফলন পেতে। পাকিতে তিন হাজারের মত খরচ হয়। স্থানীয় হাটে প্রতি মণ ধান এক হাজার ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।’
আরেক কৃষক হাসেন মন্ডল বলেন, ‘আমি পাঁচ পাকি জমিতে ধানের আবাদ করেছি। ফসলি জমিতে কীটনাশক, সার, সেচের পানি, শ্রমিকের মজুরি, মজুদ, সংরক্ষণ ও বাজারজাতের ক্রমবর্ধমান খরচের পর ধানের ন্যায্যমূল্য পেলে কৃষকরা লাভবান হবে।’
কৃষক আসমত আলী জানান, গতবারের চেয়ে এবারে প্রতি বিঘায় তিন থেকে চার মন ধান বেশি। উৎপাদিত ফসলে বিঘা প্রতি সার, ঔষধ, শ্রমিকসহ খরচ হয়েছে তিন হাজার টাকা। ফসলি মাঠে পোকা মাকড়ের আক্রমণও এবারে কম হয়েছে।
কৃষক আইয়ুব আলী বলেন, ‘আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এ বছর রাজবাড়ী জেলার বিভিন্ন মাঠে ধানের ফলন ভালো হয়েছে। আমি ১০ পাকি জমিতে ধান চাষ করেছি। ব্যাপক ফলন হয়েছে। তবে এখন প্রতি মণ ১২০০ টাকা দাম পাচ্ছি। কমপক্ষে ১৫০০ টাকা দাম হওয়া উচিত।’
রাজবাড়ী সদর উপজেলা কৃষি অফিসার কৃষিবিদ মো. জনি খান বলেন, ‘সরকার চলতি মৌসুমে কৃষকদের মধ্যে প্রণোদনার উচ্চ ফলনশীল জাতের বীজ বিতরণ করেছে। মাঠ পর্যায়ে কৃষকদের নিয়মিত পরামর্শ, আধুনিক পদ্ধতিতে ধান চাষে প্রশক্ষিণসহ প্রযুক্তি ব্যবহারে উৎসাহ, রোগবালাই নিয়ন্ত্রণে সচেতনতা এবং বীজ ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আনার ফলে এবার বাম্পার ফলন সম্ভব হয়েছে। প্রকৃতি সহায়ক থাকায় কৃষকরা কাঙ্ক্ষিত ফসল ঘরে তুলতে পারছেন। বড় কোনো দুর্যোগ না এলে সব ধানই নিরাপদে ঘরে উঠবে।’
রাজবাড়ী জেলায় চলতি মৌসুমে প্রায় দেড় লাখ কৃষক বৃরি ধান ৭৫, ৮৭, বিনা ১৭সহ উচ্চফলনশীল ও উপসি জাতের আমনের আবাদ করেছেন। যা থেকে উৎপাদন হয়েছে দুই লাখ ৫৮ হাজার ৮৫৫ মেট্রিক টন ধান।


