যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিভিন্ন দেশের ওপর আরোপিত শুল্ক বাতিল করে দেওয়ায় ঢাকায় অন্তর্বর্তী সরকারের সিদ্ধান্ত নিয়ে সমালোচনা তীব্র হয়েছে। ক্ষমতা হস্তান্তরের মাত্র কয়েক দিন আগে তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি (আরটিএ) স্বাক্ষর করেছিল।
কোর্ট রায় দিয়েছে, ১৯৭৭ সালের ইন্টারন্যাশনাল ইমার্জেন্সি ইকোনমিক পাওয়ারস অ্যাক্টের (আইইইপিএ) আওতায় আরোপিত শুল্ক অবৈধ। ফলে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় একক রপ্তানি বাজারে ট্রাম্প-পূর্ব শুল্ক কাঠামো পুনর্বহাল হয়েছে।
পরবর্তীতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ঘোষণা করেন, তিনি সব বাণিজ্য অংশীদারের ওপর অতিরিক্ত ১৫ শতাংশ হারে শুল্ক আরোপ করবেন, যা সংশ্লিষ্ট মার্কিন আইনের অধীনে সর্বোচ্চ ১৫০ দিন পর্যন্ত বহাল রাখতে পারবেন।
শুল্ক বাতিল হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের যে প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা তৈরি হয়েছিল, তা আবার ট্রাম্প-পূর্ব অবস্থায় ফিরে গেছে।
অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা বলেছেন, জাতীয় নির্বাচনের মাত্র এক সপ্তাহ আগে, ৯ ফেব্রুয়ারি আরটিএ স্বাক্ষর করে অন্তর্বর্তী সরকার তাড়াহুড়ো করেছে।
পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান এম মাসরুর রিয়াজ বলেন, ‘জাতীয় নির্বাচনের মাত্র তিন দিন আগে আরটিএ স্বাক্ষর করা ছিল সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয় ও রহস্যজনক।’ তার মতে, আলোচনা ও খসড়া প্রণয়ন শেষ হয়ে গিয়েছিল; বিষয়টি নির্বাচিত সরকারের জন্য রেখে দেওয়া যেত, বিশেষ করে যখন সুপ্রিম কোর্টের রায় অপেক্ষমাণ ছিল। ‘এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টের রায়ও এসে যেত,’ তিনি যোগ করেন।
আরটিএ অনুযায়ী, তৈরি পোশাকের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ১৯ শতাংশ পারস্পরিক শুল্কসীমা এবং মার্কিন কাঁচামাল দিয়ে তৈরি পোশাকের ক্ষেত্রে শূন্য পারস্পরিক শুল্ক নিশ্চিত করে। বিনিময়ে, ঢাকা যুক্তরাষ্ট্র থেকে ১৪টি বোয়িং উড়োজাহাজ কেনা এবং বছরে প্রায় ৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের জ্বালানি ও কৃষিপণ্য আমদানিতে সম্মত হয়, যাতে ওয়াশিংটনের সঙ্গে প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলারের বার্ষিক বাণিজ্য উদ্বৃত্ত কমানো যায়।
চুক্তিতে আরও বলা হয়েছে, বাংলাদেশকে কিছু মার্কিন রপ্তানি-আমদানি, প্রযুক্তি ও ভূরাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞার সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে হবে—যা দেশের দীর্ঘদিনের পররাষ্ট্রনীতি ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়’নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ক্রয়ের প্রতিশ্রুতিও একটি সংবেদনশীল বিষয় হিসেবে উঠে এসেছে। বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের সরঞ্জাম কেনা এবং নির্দিষ্ট কিছু পণ্য অন্য দেশ—যেমন চীন, রাশিয়া, ফ্রান্স বা তুরস্ক—থেকে সংগ্রহ না করার বিষয়ে সম্মত হয়েছে, যা তুলনামূলক সস্তা বিকল্পের সুযোগ সীমিত করতে পারে।
ওয়াশিংটনে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির বলেন, আরটিএর কয়েকটি ধারা ঢাকার ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতিকে জটিল করে তুলতে পারে, যা তিনি উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য বলে মনে করেন। তার মতে, ‘যেহেতু পারস্পরিক শুল্ক এখন আর নেই, বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনা করে আরটিএ পুনর্বিন্যাস করা উচিত।’
অন্তর্বর্তী সরকারের দুই উপদেষ্টা জানিয়েছেন, নির্বাচনের আগে চুক্তি সম্পন্ন করতে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে তাদের ওপর প্রচণ্ড চাপ ছিল, যদিও তারা নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক।
বিশেষজ্ঞ ও ব্যবসায়ী মহলের সঙ্গে পরামর্শ ছাড়াই চুক্তি স্বাক্ষরের সমালোচনা করে রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্ট-এর চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুর রাজ্জাক বলেন, আরটিএর কয়েকটি ধারা বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) নিয়মের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে।
সাবেক বাণিজ্য উপদেষ্টা এস কে বশির উদ্দিন বলেন, রপ্তানিকারকদের অনুরোধেই অন্তর্বর্তী সরকার প্রধান রপ্তানি পণ্যের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান রক্ষায় এই পদক্ষেপ নেয়। তার মতে, ‘আরটিএতে প্রবেশ ও প্রত্যাহারের ধারা রয়েছে। নির্বাচিত সরকার চাইলে বাস্তবায়ন থেকে বিরত থাকতে পারে।’
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের বিশিষ্ট ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশের সঙ্গে চুক্তি করে পরে তা থেকে বেরিয়ে আসা সহজ হবে না। তার মতে, অন্তর্বর্তী সরকার যদি শেষ মুহূর্তে তাড়াহুড়ো করে চুক্তি না করত, তবে এখন তা রক্ষা বা অনুসরণের চাপ তৈরি হতো না।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প শুক্রবার আশা প্রকাশ করেন, দেশগুলো দ্বিপাক্ষিক পাস্পরিক শুল্ক চুক্তি সম্মান করবে এবং প্রয়োজনে তিনি দেশভিত্তিক বা পণ্যভিত্তিক শুল্ক আরোপের অন্য আইনি উপায়ও ব্যবহার করতে পারেন।
চুক্তি অনুযায়ী, উভয় সরকার প্রক্রিয়া সম্পন্নের নোটিশ দেওয়ার ৬০ দিন পর এটি কার্যকর হবে। তবে যে কোনো পক্ষ ছয় মাসের নোটিশ দিয়ে চুক্তি থেকে সরে দাঁড়াতে পারবে।
রায়ের প্রভাব নিয়ে স্পষ্টতা পেতে ঢাকা ওয়াশিংটনের কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছে, ফলে আরটিএর ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়ছে।
বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান বলেন, আদালতের রায়ে বাস্তবায়ন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে এবং এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। তিনি জানান, প্রাথমিকভাবে তাদের জানানো হয়েছে যে একটি অতিরিক্ত সমতল হারে শুল্ক আরোপ করা হতে পারে। ‘বিষয়টি স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। সোমবার, তাদের প্রথম কর্মদিবসে আমরা আরও পরিষ্কার ধারণা পাব,’ তিনি বলেন।
পারস্পরিক শুল্ক অবৈধ ঘোষিত হওয়ায় আরটিএর সব ধারা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যায় না, বলেন রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির। একই সুরে স্প্যারো গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শোভন ইসলাম বলেন, যেসব ধারা সরাসরি পারস্পরিক শুল্কের সঙ্গে সম্পর্কিত, সেগুলো অকার্যকর বিবেচিত হতে পারে; তবে অন্যান্য ধারা বহাল থাকবে।
একজন পোশাক রপ্তানিকারক হিসেবে তিনি বলেন, ১৫ শতাংশ নতুন শুল্ক ১৫০ দিনের জন্য বহাল রাখার পর যদি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প স্থায়ী শুল্ক আরোপ করতে চান, তবে তাকে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে নতুন বিল উত্থাপন করতে হবে।
এ ধরনের আইন পাস করা জটিল ও সময়সাপেক্ষ প্রক্রিয়া হওয়ায় এবং বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় তা কঠিন বলেই মনে করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ গার্মেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, শুল্ক বাতিলের পর প্রশাসন ২০ ফেব্রুয়ারি থেকে দুই ধাপের কৌশল নেয়, একটি স্বল্পমেয়াদি ও একটি দীর্ঘমেয়াদি ।
স্বল্পমেয়াদে ১৫ শতাংশ অস্থায়ী শুল্ক একটি অন্তর্বর্তী সমাধান হিসেবে কাজ করবে। দীর্ঘমেয়াদে ট্রাম্প প্রশাসন তথাকথিত ‘অন্যায্য বাণিজ্য’চর্চার বিরুদ্ধে সেকশন ৩০১ তদন্তের ব্যবহার বাড়িয়ে আরও লক্ষ্যভিত্তিক ও স্থায়ী শুল্ক কাঠামো গড়ে তুলতে চায়।
এই পদক্ষেপগুলো ২০২৬ সালের দ্বিতীয়ার্ধে ধাপে ধাপে কার্যকর হতে পারে। পাশাপাশি সেফগার্ড শুল্ক, অ্যান্টি-ডাম্পিং ও কাউন্টারভেইলিং শুল্ক এবং জাতীয় নিরাপত্তা-ভিত্তিক শুল্কসহ অন্যান্য আইনি বাণিজ্য উপায়ও প্রয়োগের সুযোগ থাকবে, তিনি যোগ করেন।


