আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে যশোর জেলায় নির্বাচনী প্রচার তুঙ্গে উঠলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে মানা হচ্ছে না নির্বাচন কমিশনের নির্ধারিত আচরণবিধি। জেলার বিভিন্ন নির্বাচনী এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, প্রার্থীরা নিয়ম লঙ্ঘন করে পোস্টার লাগানোসহ প্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন। এতে সাধারণ ভোটারদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।
সবচেয়ে বেশি আচরণবিধি লঙ্ঘন হয়েছে পোস্টার লাগানোর ক্ষেত্রে। নির্বাচনী বিধিমালা অনুযায়ী, প্রার্থীর পোস্টার অবশ্যই সাদা-কালো হতে হবে এবং তা কেবল দড়িতে ঝুলিয়ে প্রদর্শন করার নিয়ম রয়েছে। তবে যশোরের বিভিন্ন মোড় ও পাড়া-মহল্লায় চলন্ত ইজিবাইক ও রিকশার গায়ে রঙিন পোস্টার লাগিয়ে প্রচার চালাতে দেখা গেছে।
নিয়ম অনুযায়ী কোনো সচল যানবাহনে পোস্টার লাগানো কিংবা যান্ত্রিক যানবাহনে চড়ে মিছিল-শোভাযাত্রা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ হলেও অনেকে তা মানছেন না।
এ ছাড়া ঘরবাড়ি, অফিস, আদালত, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় উপাসনালয়, গাছ এবং বিদ্যুৎ ও টেলিফোনের খুঁটিতে পোস্টার লাগানোর ওপর স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা থাকলেও অধিকাংশ প্রার্থী তা উপেক্ষা করছেন। শহরের বিভিন্ন এলাকায় রঙিন ব্যানার ও ফেস্টুনের উপস্থিতিও চোখে পড়েছে।
যশোর-৩ আসনে প্রচারণায় এগিয়ে বিএনপি ও জামায়াত
যশোর-৩ (সদর) আসনে ছয়টি রাজনৈতিক দলের প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এর মধ্যে প্রচারণায় সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছেন বিএনপি মনোনীত ধানের শীষের প্রার্থী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত এবং জামায়াতে ইসলামী মনোনীত দাঁড়িপাল্লার প্রার্থী আব্দুল কাদের।
অন্য প্রার্থীরা সীমিত পরিসরে প্রচারণা চালালেও শহরজুড়ে ব্যানার, ফেস্টুন ও পোস্টারে ছেয়ে ফেলেছেন এই দুই দলের প্রার্থীরা। ফলে আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগও তাদের বিরুদ্ধেই বেশি উঠছে।
পৌর এলাকার অন্তত ছয়টি ওয়ার্ড ঘুরে দেখা গেছে, এখনো অধিকাংশ বাসা-বাড়ির দেয়ালে ধানের শীষ ও দাঁড়িপাল্লার রঙিন পোস্টার সাঁটানো রয়েছে। শহরের অধিকাংশ ইজিবাইক ও রিকশার গায়েও এসব পোস্টার দেখা গেছে।
তফসিল ঘোষণার পর জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তার পক্ষ থেকে পুরোনো পোস্টার, ব্যানার ও ফেস্টুন অপসারণের নির্দেশ দেওয়া হলেও এর কার্যকারিতা তেমন দেখা যায়নি।
রেলগেট, নিউ মার্কেট, মণিহার, দড়াটানা, মুজিব সড়ক ও রেলস্টেশন এলাকায় এখনো বিদ্যুতের খুঁটিতে ঝুলছে নির্বাচনী ব্যানার-ফেস্টুন।
বিধিমালা অনুযায়ী, প্রতিটি ইউনিয়ন বা ওয়ার্ডে একটি করে অথবা পুরো নির্বাচনী এলাকায় সর্বোচ্চ ২০টি বিলবোর্ড ব্যবহার করা যাবে। প্রতিটি বিলবোর্ডের সর্বোচ্চ মাপ নির্ধারণ করা হয়েছে ১৬ ফুট বাই ৯ ফুট। তবে বাস্তবে এই সংখ্যা শহর এলাকায় দ্বিগুণেরও বেশি দেখা গেছে। যদিও ছোট ফেস্টুন ব্যবহারের বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো নির্দেশনা দেয়নি নির্বাচন কমিশন।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় উপাসনালয়ে প্রচার নিষিদ্ধ
নির্বাচনী বিধিমালার ধারা ১২ অনুযায়ী, কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা ধর্মীয় উপাসনালয়ের ভেতরে কিংবা সীমানা প্রাচীরে নির্বাচনী সভা, সমাবেশ বা প্রচার- প্রচারণা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এসব প্রতিষ্ঠানে পোস্টার লাগানো বা দেওয়াল লিখন করা যাবে না। একই সঙ্গে নির্বাচনী প্রচারণায় শিক্ষার্থী ব্যবহার কিংবা শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হয়–এমন কোনো কর্মকাণ্ডও নিষিদ্ধ।
ব্যক্তিগত আক্রমণ ও কটূক্তি দণ্ডনীয় অপরাধ
ধারা ১১ অনুযায়ী, কোনো প্রার্থী বা তার সমর্থক অন্য প্রার্থীর ব্যক্তিগত জীবন, পারিবারিক বিষয়, ধর্ম, জাতি বা লিঙ্গ নিয়ে কটূক্তি করতে পারবেন না। সভা বা প্রচারণায় উসকানিমূলক বক্তব্য দিয়ে অস্থিরতা বা সংঘাত সৃষ্টি করাও আচরণবিধির গুরুতর লঙ্ঘন। যশোরে একাধিক প্রার্থীর বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
আচরণবিধি লঙ্ঘনে জরিমানা
এখন পর্যন্ত নির্বাচনী প্রচারে আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে যশোর-৩, ৫ ও ৬ আসনের প্রার্থী ও তাদের প্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালত মোট ২ লাখ ৯৫ হাজার টাকা জরিমানা করেছেন।
যশোর-৫ (মণিরামপুর): প্রচারণার প্রথম দিনেই যানজট সৃষ্টি ও বিধি ভঙ্গের অভিযোগে স্বতন্ত্র প্রার্থী শহীদ ইকবাল হোসেন এবং জামায়াতে ইসলামী সমর্থিত প্রার্থী গাজী এনামুল হককে মোট ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।
২২ জানুয়ারি সন্ধ্যায় মণিরামপুর উপজেলায় অতিরিক্ত লোকসমাগম ও শোভাযাত্রার মাধ্যমে তীব্র যানজট সৃষ্টি করায় এই শাস্তি দেওয়া হয়। অভিযান পরিচালনা করেন উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মাহির দায়ান আমিন ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আশীষ কুমার দাস।
যশোর-৬ (কেশবপুর): গত শুক্রবার রাতে গাছ ও বৈদ্যুতিক খুঁটিতে পোস্টার লাগানোর দায়ে বিএনপি প্রার্থী আবুল হোসেনের প্রধান নির্বাচনী প্রতিনিধি ও উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আবদুর রাজ্জাককে ২৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। জেলা সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সোহাইব হাসান আকন্দ এই আদালত পরিচালনা করেন।
যশোর-৩ (সদর): বৃহস্পতিবার বিকালে যশোর শহরের পুরাতন কসবা এলাকায় দেওয়ালে পোস্টার সাঁটানো এবং চলন্ত ইজিবাইকে প্রচারণা চালানোর অভিযোগে বিএনপি প্রার্থী অনিন্দ্য ইসলাম অমিতকে ২০ হাজার টাকা এবং জামায়াত প্রার্থী আব্দুল কাদেরকে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।
সরকারি এমএম কলেজের হোস্টেলের দেয়ালে পোস্টার ও ইজিবাইকের পেছনে পোস্টার থাকার কারণে এই জরিমানা আরোপ করা হয়। যৌথবাহিনীর উপস্থিতিতে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট শামীম হোসাইন এই আদালত পরিচালনা করেন।
কঠোর নজরদারির ঘোষণা প্রশাসনের
জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আশেক হাসান টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, আচরণবিধি অনুযায়ী কোনো প্রার্থী বা তার কর্মী-সমর্থক নিয়ম ভঙ্গ করলে সর্বোচ্চ ছয় মাসের কারাদণ্ড অথবা দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান রয়েছে। প্লাস্টিক লেমিনেটেড পোস্টার ব্যবহার এবং দুপুর ২টার আগে ও রাত ৮টার পরে মাইক ব্যবহারের ওপরও নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।
এ ছাড়া, নির্বাচনী আচরণবিধি বাস্তবায়নে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠানে জেলাজুড়ে কঠোর নজরদারি অব্যাহত থাকবে।


